দেশ টেলিভিশন লিমিটেড, কর্ণফুলী মিডিয়া পয়েন্ট, ৪২, শহীদ সাংবাদিক সেলিনা পারভীন সড়ক, মালিবাগ, ঢাকা-১২১৭, বাংলাদেশ।
টেলিফোন: +৮৮ (০২) ৮৩৩২৯৫৮, ৮৩৩২৯২২ ফ্যাক্স: +৮৮ (০২) ৮৩৩২৯৮১ মেইল: [email protected]

দীর্ঘদিন রাজনীতির প্রান্তে থাকা জামায়াতে ইসলামীর আমির শফিকুর রহমান এখন ঢাকাজুড়ে পোস্টার ও বিলবোর্ডে দৃশ্যমান, যেখানে ভোটারদের আহ্বান জানানো হচ্ছে আসন্ন জাতীয় নির্বাচনে প্রথম ইসলামপন্থী নেতৃত্বাধীন সরকার গঠনে তাকে সমর্থন দিতে। বৃহস্পতিবার অনুষ্ঠিত হতে যাওয়া নির্বাচনে ৬৭ বছর বয়সী এই চিকিৎসক ও দলীয় প্রধান এখন প্রধানমন্ত্রীর পদে শক্ত প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে বিবেচিত হচ্ছেন।
দীর্ঘ সময় ইসলামপন্থী মহলের বাইরে তেমন পরিচিত না থাকা শফিকুর রহমান ২০২৪ সালে শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর দ্রুত রাজনৈতিক অঙ্গনে উঠে আসেন। বিএনপির নেতৃত্বাধীন জোটের বিরুদ্ধে জামায়াতের নেতৃত্বাধীন জোট এবার কঠিন লড়াই দিতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
বাংলাদেশে ১২ ফেব্রুয়ারি ভোট হচ্ছে ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানের পর প্রথম জাতীয় নির্বাচন, যেখানে তরুণদের নেতৃত্বে হওয়া সেই আন্দোলনে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ক্ষমতা হারান।
দেশের প্রায় ১৭ কোটি ৫০ লাখ মানুষের প্রায় ৯১ শতাংশ মুসলমান। ইসলাম রাষ্ট্রধর্ম হলেও সংবিধানে ধর্মনিরপেক্ষতার স্বীকৃতি রয়েছে এবং জনগণের বড় অংশ সুন্নি মুসলমান।
জনমত জরিপগুলো ইঙ্গিত দিচ্ছে, একসময় নিষিদ্ধ থাকা জামায়াত এবারের নির্বাচনে তাদের সর্বোচ্চ সাফল্যের পথে রয়েছে, যা মধ্যপন্থী ও সংখ্যালঘুদের মধ্যে উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে। শেখ হাসিনার শাসনামলে ইসলামপন্থী দলগুলোর বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হয়, জামায়াতের শীর্ষ নেতাদের কারাবন্দি করা হয়, ১৯৭১ সালের যুদ্ধাপরাধে কয়েকজনকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয় এবং দলটি নিষিদ্ধ হয়ে যায়। শফিকুর রহমানকে ২০২২ সালে নিষিদ্ধ ঘোষিত একটি জঙ্গি সংগঠনের সদস্যদের সহায়তার অভিযোগে গ্রেপ্তার করে ১৫ মাস কারাগারে রাখা হয়েছিল।
তবে ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থান জামায়াত ও শফিকুর রহমানের রাজনৈতিক ভাগ্য বদলে দেয়। শেখ হাসিনা ভারতে পালিয়ে যাওয়ার পর নোবেলজয়ী মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকার দলটির ওপর বিধিনিষেধ শিথিল করে এবং ২০২৫ সালে আদালত জামায়াতের ওপর নিষেধাজ্ঞা তুলে নেয়। এরপর দীর্ঘদিন গোপনে কার্যক্রম চালানো দলটি প্রকাশ্যে তৎপর হয়ে ওঠে এবং ত্রাণ ও সামাজিক কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে মাঠে নামে।
ডিসেম্বরে রয়টার্সকে শফিকুর রহমান বলেন, ‘আমরা বারবার কথা বলতে চেয়েছি, কিন্তু দমন করা হয়েছে। আন্দোলনের পর আবার সামনে আসার সুযোগ পেয়েছি।’
১৯৫৮ সালে মৌলভীবাজারে জন্ম নেওয়া শফিকুর রহমান রাজনীতি শুরু করেন বামপন্থী ছাত্র সংগঠনে, পরে ইসলামী ছাত্রশিবিরে যোগ দেন। ১৯৮৪ সালে জামায়াতে যোগ দিয়ে ১৯৯৬, ২০০১ ও ২০১৮ সালের নির্বাচনে প্রার্থী হলেও জয়ী হতে পারেননি। ২০২০ সালে তিনি দলের আমির হন।
তার স্ত্রী আমিনা বেগমও চিকিৎসক এবং ২০১৮ সালে সংসদ সদস্য ছিলেন। তাদের দুই কন্যা ও এক পুত্রও চিকিৎসা পেশায় যুক্ত। সিলেট অঞ্চলে পারিবারিক মালিকানাধীন একটি হাসপাতালের প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যানও তিনি।
শেখ হাসিনার শাসনামলে অনেকেই ঢাকায় তার পুরো নাম জানতেন না, যা তার প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী বিএনপি নেতা তারেক রহমানের ক্ষেত্রে ভিন্ন। জামায়াত শফিকুর রহমানকে সহজ-সরল ও শৃঙ্খলাপরায়ণ নেতা হিসেবে তুলে ধরে।
বিশ্লেষকদের মতে, গণঅভ্যুত্থানের পর রাজনৈতিক শূন্যতার সুযোগ নিয়েছেন শফিকুর রহমান। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক শফি এমডি মোস্তফা বলেন, আন্দোলনের পরের মাসগুলোতে দেশে দৃশ্যমান কোনো নেতা ছিল না, তখন শফিকুর রহমান দেশজুড়ে সফর করে গণমাধ্যমে আলোচনায় আসেন এবং অল্প সময়ের মধ্যেই সামনে চলে আসেন।
নির্বাচনী প্রচারে তার বক্তব্য কিছু ভোটারের কাছে সাড়া ফেলেছে, যেখানে জামায়াতকে ইসলামি মূল্যবোধভিত্তিক পরিচ্ছন্ন ও নৈতিক বিকল্প হিসেবে উপস্থাপন করা হচ্ছে। ডিসেম্বর মাসে তরুণদের জাতীয় নাগরিক পার্টির সঙ্গে জোট করে দলটি তরুণ ও তুলনামূলক কম রক্ষণশীল ভোটারদের কাছেও পৌঁছাতে চায়।
গেম অব থ্রোনস থেকে অনুপ্রাণিত পোস্টারেও শফিকুর রহমানের ছবি দেখা যাচ্ছে, যেখানে লেখা আছে ‘দাদু আসছেন’।
তবে নারীদের বিষয়ে তার বক্তব্য বিতর্ক সৃষ্টি করেছে। জামায়াত কোনো নারী প্রার্থী দেয়নি। তিনি বলেছেন, নারীদের দিনে পাঁচ ঘণ্টার বেশি কাজ না করে পরিবারকে অগ্রাধিকার দেওয়া উচিত এবং সামাজিক মাধ্যমে এক পোস্টে আধুনিকতার নামে নারীদের ঘরের বাইরে ঠেলে দেওয়াকে ‘এক ধরনের পতিতাবৃত্তি’ বলে উল্লেখ করেছিলেন, যা বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে প্রতিবাদের জন্ম দেয়। পরে দলটি জানায়, তার সামাজিক মাধ্যমের অ্যাকাউন্ট হ্যাক হয়েছিল।
শফিকুর রহমান বলেন, ‘আমরা মধ্যপন্থী, নমনীয় ও যুক্তিসঙ্গত। তবে আমাদের নীতি ইসলামি ও কোরআনি মূল্যবোধের ওপর প্রতিষ্ঠিত, যা শুধু মুসলমান নয়, সমগ্র মানবজাতির জন্য।’
সূত্র: রয়টার্স
এমএস/