দেশ টেলিভিশন লিমিটেড, কর্ণফুলী মিডিয়া পয়েন্ট, ৪২, শহীদ সাংবাদিক সেলিনা পারভীন সড়ক, মালিবাগ, ঢাকা-১২১৭, বাংলাদেশ।
টেলিফোন: +৮৮ (০২) ৮৩৩২৯৫৮, ৮৩৩২৯২২ ফ্যাক্স: +৮৮ (০২) ৮৩৩২৯৮১ মেইল: [email protected]

জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি, সরকারি সেবার মান এবং প্রেসিডেন্ট এমানুয়েল মাখোঁর সরকারের বিরুদ্ধে ক্ষোভ থেকে ফ্রান্সজুড়ে নতুন করে বিক্ষোভের আশঙ্কা করা হচ্ছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে শনিবার দেশজুড়ে ৭০ হাজার পুলিশ সদস্য মোতায়েন করেছে সরকার।
হ্যালোইনের দিনে এই বিক্ষোভের আয়োজন করা হয়েছে। এর দুই সপ্তাহ আগে দেশটির বিভিন্ন শহরে দাঙ্গা ও লুটপাটের ঘটনা নিরাপত্তা বাহিনীকে অপ্রস্তুত করে দিয়েছিল। এতে বিভিন্ন দোকান, সরকারি ভবন ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এবার একই ধরনের ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঠেকাতে কঠোর অবস্থানের কথা জানিয়েছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী লরাঁ নুনেজ।
সপ্তাহের শুরুতে এক সংবাদ সম্মেলনে নিরাপত্তা প্রস্তুতির বিস্তারিত তুলে ধরে নুনেজ বলেন, ‘যেকোনো ধরনের বিশৃঙ্খলা মোকাবিলায় অত্যন্ত কঠোর ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে সবাই প্রস্তুত রয়েছে।’ শনিবারের পরিস্থিতিকে তিনি ‘অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ’ বলেও উল্লেখ করেন।
শনিবার ফ্রান্সের সর্বোচ্চ প্রশাসনিক আদালত প্যারিসের রিপাবলিক ও বাস্তিল চত্বরের মধ্যবর্তী এলাকায় বিক্ষোভ মিছিল নিষিদ্ধের সিদ্ধান্ত বহাল রেখেছেন। শ্রমিক সংগঠনগুলোর করা চ্যালেঞ্জ খারিজ করে আদালত এ সিদ্ধান্ত দেন। ফলে বিক্ষোভকারীদের শহরের পূর্ব প্রান্তের বুলেভার্ডগুলোতে সমাবেশ করতে হবে। এতে প্যারিসের কেন্দ্রীয় এলাকার প্রধান কেনাকাটার স্থানগুলো এড়িয়ে চলা সম্ভব হবে।
কর্তৃপক্ষের আশঙ্কা, দাঙ্গাকারীরা হ্যালোইনের মুখোশ ব্যবহার করে নিজেদের পরিচয় আড়াল করতে পারে। নুনেজ বলেন, জনশৃঙ্খলা বিঘ্নিত হওয়ার আশঙ্কা থাকলে মুখ ঢেকে রাখার ওপর নিষেধাজ্ঞা দেওয়ার ক্ষমতা পুলিশের রয়েছে। দেশটির স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, শনিবার ফ্রান্সজুড়ে প্রায় ১৫০টি সমাবেশের পরিকল্পনা করা হয়েছে।
এদিকে, যুক্তরাষ্ট্রের দূতাবাস ভ্রমণকারীদের বিক্ষোভ ও বড় সমাবেশের নির্ধারিত এলাকাগুলো এড়িয়ে চলার পরামর্শ দিয়েছে।
গত সেপ্টেম্বরের শেষ দিকে মাখোঁর সংখ্যালঘু সরকার ২০২৭ সালের বাজেট নিয়ে আলোচনা শুরু করলে বিক্ষোভ জোরালো হতে থাকে। দেশটির সরকারি ঋণ মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) প্রায় ১২০ শতাংশে পৌঁছানোর পাশাপাশি ঋণ নেওয়ার ব্যয়ও বাড়ছে। এ পরিস্থিতিতে ব্যয় কমানোর চাপের মুখে রয়েছে সরকার। ফলে নীতিগত সিদ্ধান্ত নেওয়ার সুযোগও সীমিত হয়ে পড়ছে।
দেশটির অনেক স্কুলের জরাজীর্ণ অবস্থা, শ্রেণিকক্ষে অতিরিক্ত শিক্ষার্থী এবং বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি ব্যবস্থার কথিত বৈষম্য নিয়ে ক্ষুব্ধ শিক্ষার্থীদের সঙ্গে যোগ দিয়েছেন শ্রমিক সংগঠনগুলো। জীবনযাত্রার ব্যয় কমানোর দাবিতে আবারও সক্রিয় হয়ে উঠেছে ‘ইয়েলো ভেস্ট’ আন্দোলন।
ইউরোপজুড়ে ছড়িয়ে পড়ছে বিক্ষোভ
ফ্রান্সের বিক্ষোভের প্রভাব ইউরোপের অন্যান্য দেশেও পড়েছে। শনিবার জার্মানির ৩০টির বেশি শহরে তরুণদের নেতৃত্বে বিক্ষোভের পরিকল্পনা রয়েছে।
শিক্ষাব্যবস্থার সংস্কার এবং জ্বালানির ব্যয় কমানোর প্রতিশ্রুতি দিলেও সরকারের এসব উদ্যোগে অসন্তোষ কমেনি। প্যারিসের উপশহর নোজঁ-সুর-মার্নের ১৫ বছর বয়সী শিক্ষার্থী অ্যারন বেরথিয়ে দ্য গ্রঁদ্রি টানা তৃতীয় সপ্তাহান্তের মতো বিক্ষোভে অংশ নেওয়ার পরিকল্পনা করেছেন।
তিনি বলেন, ‘ছোটবেলায় আমাকে বলা হয়েছিল, তরুণেরাই ভবিষ্যৎ। কিন্তু ফ্রান্সের ভবিষ্যৎ হিসেবে আমরা যদি প্রয়োজনীয় সুযোগ-সুবিধা না পাই, তাহলে দেশটি শেষ পর্যন্ত ধসে পড়বে।’
এই অস্থিরতা ফ্রান্সের কট্টর ডানপন্থী নেত্রী মেরিন লে পেনকে রাজনৈতিকভাবে সুবিধা এনে দিয়েছে। আগামী এপ্রিলে অনুষ্ঠেয় প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের আগে জনমত জরিপগুলোতে তিনি এগিয়ে রয়েছেন। অন্যদিকে, মাখোঁর সম্ভাব্য মধ্যপন্থী উত্তরসূরিরা বিভক্ত অবস্থায় রয়েছেন।
বিক্ষোভ ও অস্থিরতার কারণে এমনিতেই চাপে থাকা ফ্রান্সের অর্থনীতিতে নতুন ধাক্কা লেগেছে। শুক্রবার প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের তৃতীয় প্রান্তিকেই দেশটির অর্থনীতি সংকুচিত হয়েছে।
চেম্বার অব কমার্সের হিসাবে, বিক্ষোভ ও সহিংসতায় খুচরা ব্যবসায়ীদের ক্ষতির পরিমাণ ১০০ কোটি ইউরো ছাড়িয়েছে। বিমা সুবিধার বাইরে থাকা ক্ষয়ক্ষতি ও হারানো আয় হিসাব করলে মোট ক্ষতির পরিমাণ এর দ্বিগুণ হতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
প্যারিসের প্রধান বাণিজ্যিক সড়কগুলোতে বড়দিনের আলোকসজ্জা জ্বললেও অনেক দোকানের জানালা তক্তা দিয়ে বন্ধ করে রাখা হয়েছে। আগের দফার সহিংসতায় হার্মিস, লুই ভুইতোঁ ও বারবেরির মতো বিলাসবহুল ব্র্যান্ডের দোকানও হামলার শিকার হয়েছিল।
এদিকে, সহিংসতায় জড়িত ব্যক্তিদের ক্ষতিপূরণ দিতে বাধ্য করার একটি বিতর্কিত আইন প্রণয়নের উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। প্রস্তাবিত আইন অনুযায়ী, কোনো ব্যক্তি এককভাবে বা যে গোষ্ঠীর অংশ হিসেবে সহিংসতায় জড়িত বলে বিবেচিত হবেন, সেই গোষ্ঠীর মাধ্যমে সৃষ্ট ক্ষতির জন্য তাঁকে সর্বোচ্চ ১০ হাজার ইউরো পর্যন্ত দিতে হতে পারে। তবে মানবাধিকার সংগঠন ও কয়েকজন আইনজীবীর আশঙ্কা, এ আইন শান্তিপূর্ণভাবে প্রতিবাদ জানানোর অধিকার ক্ষুণ্ন করতে পারে।
সূত্র: রয়টার্স
এমএস/