দেশ টেলিভিশন লিমিটেড, কর্ণফুলী মিডিয়া পয়েন্ট, ৪২, শহীদ সাংবাদিক সেলিনা পারভীন সড়ক, মালিবাগ, ঢাকা-১২১৭, বাংলাদেশ।
টেলিফোন: +৮৮ (০২) ৮৩৩২৯৫৮, ৮৩৩২৯২২ ফ্যাক্স: +৮৮ (০২) ৮৩৩২৯৮১ মেইল: [email protected]

ইরান ২০২৫ সালের জানুয়ারি থেকে যুক্তরাষ্ট্রের নৌ অবরোধ ও পশ্চিমা দেশগুলোর নিষেধাজ্ঞা এড়িয়ে অন্তত ২০০ কোটি ডলারের সামরিক সরঞ্জাম, বিস্ফোরক এবং ভারী ট্রাক আমদানি করেছে। এ কাজে দেশটি পাঁচ হাজারের বেশি সংস্থার সমন্বয়ে গড়ে তুলেছে একটি গোপন নেটওয়ার্ক। বার্তা সংস্থা রয়টার্সের এক অনুসন্ধানে এসব তথ্য উঠে এসেছে।
অনুসন্ধানে দেখা গেছে, ইরানের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের নামের আদ্যক্ষর ‘এমওডি’ দিয়ে শুরু হওয়া এসব সংস্থা দেশটির সামরিক সরঞ্জাম সংগ্রহ ও নিষেধাজ্ঞা এড়ানোর ব্যবস্থার গুরুত্বপূর্ণ অংশ। ২০১৬ সাল থেকে বিভিন্ন পণ্য পরিবহনের নথি ও জাহাজ চলাচলের তথ্যে এসব সংস্থার আর্থিক লেনদেনের চিহ্ন পাওয়া গেছে। কয়েকটি সংস্থার সঙ্গে ইরানের ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনী এবং দেশটির প্রভাবশালী ব্যক্তিদের নিয়ন্ত্রণাধীন ‘বুনিয়াদ’ নামে পরিচিত ব্যবসায়ী গোষ্ঠীর যোগসূত্র রয়েছে।
চলমান যুদ্ধে ইরান কীভাবে হাজার হাজার ক্ষেপণাস্ত্র ও চালকবিহীন আকাশযান ব্যবহার করেও সেগুলোর মজুত পুনরায় পূরণ করছে, সেই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গিয়ে এই নেটওয়ার্কের সন্ধান পেয়েছে রয়টার্স।
অনুসন্ধান অনুযায়ী, ২০২৫ সালের জানুয়ারি থেকে ২০২৬ সালের জুন পর্যন্ত ১৮ মাসে ‘এমওডি ৩৪৬৪২৮’ নামের একটি সংস্থা বিপুল পরিমাণ রকেটের জ্বালানি, বিস্ফোরক, অস্ত্রের যন্ত্রাংশ এবং ভারী ট্রাক আমদানি করেছে। এসব উপকরণ ক্ষেপণাস্ত্র ও চালকবিহীন আকাশযান তৈরিতে গুরুত্বপূর্ণ। ভারী ট্রাকগুলো ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণের যান হিসেবেও ব্যবহার করা যেতে পারে। চলতি বছরের যুদ্ধের প্রথম চার মাসও এই সময়ের অন্তর্ভুক্ত।
স্থলপথ, সমুদ্রপথ ও আকাশপথে এসব সরঞ্জাম ইরানে এসেছে। আমদানি নথিতে এসব পণ্যের অনেকগুলোর উৎস হিসেবে চীন, রাশিয়া ও জার্মানির নাম উল্লেখ রয়েছে।
হাজারো ইরানি ব্যাংক ও সরকারি নথি, বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের নিবন্ধনসংক্রান্ত কাগজপত্র এবং আমদানি তথ্য বিশ্লেষণ করে এই অনুসন্ধান চালিয়েছে রয়টার্স।
অনুসন্ধানে আরও দেখা গেছে, গোপন সংস্থাগুলোর ঠিকানা ইরানের প্রতিরক্ষা ও সশস্ত্র বাহিনীর সরবরাহবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের একই তেহরান ঠিকানায় দেখানো হয়েছে। নথিতে অধিকাংশ সংস্থার প্রতিষ্ঠার তারিখ উল্লেখ করা হয়েছে ১৯৭৯ সালের ১১ ফেব্রুয়ারি। ওই দিন আয়াতুল্লাহ রুহুল্লাহ খোমেনি রাজতন্ত্র উৎখাতের পর ইরানের ক্ষমতায় আসেন। তবে নথি অনুযায়ী, সংস্থাগুলোর অধিকাংশই প্রকৃতপক্ষে ২০১৩ সালে প্রতিষ্ঠিত হয়। সে সময় নিষেধাজ্ঞার চাপে ইরানের অপরিশোধিত তেল রপ্তানি ও মুদ্রার মূল্য ব্যাপকভাবে কমে গিয়েছিল।
ইসরায়েলি ও মার্কিন ঝুঁকি বিশ্লেষণবিষয়ক পরামর্শক প্রতিষ্ঠান ‘২৪০ অ্যানালিটিকসের’ সহযোগিতায় রয়টার্স প্রথমবারের মতো এই সংস্থাগুলোকে শনাক্ত করেছে। এসব সংস্থা ইরানের সামরিক সরঞ্জাম সংগ্রহ ও নিষেধাজ্ঞা এড়ানোর ব্যবস্থার মেরুদণ্ড হিসেবে কাজ করছে। তারা বিভিন্ন মধ্যস্থতাকারী এবং বিদেশি নামসর্বস্ব প্রতিষ্ঠানের জাল ব্যবহার করে। এসব মধ্যস্থতাকারী অবৈধভাবে তেল বিক্রির অর্থ দিয়ে ইরানের জন্য পণ্য কেনে।
ইরানের ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ও চালকবিহীন আকাশযান কর্মসূচির সঙ্গে যুক্ত জ্যেষ্ঠ সামরিক কর্মকর্তারাও এই নেটওয়ার্ক ব্যবহার করেন বলে অনুসন্ধানে উঠে এসেছে। এসব সংস্থার ৯১টির নিবন্ধিত ফোন নম্বর ইরানের রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন ব্যাংক সেপাহের নথিতেও পাওয়া গেছে। ওই নথিতে ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনীর সদস্যদের ব্যাংক হিসাবের তথ্য রয়েছে। তাদের মধ্যে অন্তত দুজন সামরিক কমান্ডারের বিরুদ্ধে বেসামরিক বিক্ষোভকারীদের ওপর নির্যাতনের অভিযোগ এনেছে যুক্তরাষ্ট্র।
কয়েক দশক ধরে ইরানের সামরিক বাহিনী যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন নিষেধাজ্ঞার আওতায় থাকলেও রয়টার্সের অনুসন্ধানে পাওয়া নথিতে উল্লেখিত নম্বরযুক্ত কোনো সংস্থাকে পশ্চিমা সরকারগুলো নিষেধাজ্ঞার তালিকাভুক্ত করেছে, এমন প্রমাণ পাওয়া যায়নি।
যুক্তরাষ্ট্রের অর্থ মন্ত্রণালয়ের সাবেক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা মিয়াদ মালেকি বলেন, সংঘাত চলাকালে এবং এর বহু বছর আগে থেকেই এই নেটওয়ার্ক ইরানি শাসনব্যবস্থার সামরিক কার্যক্রম সচল রাখার গুরুত্বপূর্ণ অবলম্বন। তার ভাষায়, এটি ইরানের সামরিক বাণিজ্যের সম্পূর্ণ ব্যবস্থা।
ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র ও চালকবিহীন আকাশযান তৈরির জন্য প্রয়োজনীয় অনেক কাঁচামাল এই আমদানি নেটওয়ার্ক সরবরাহ করেছে। এসব অস্ত্র উপসাগরীয় অঞ্চলের জ্বালানি অবকাঠামোয় ইরানের ধারাবাহিক নির্ভুল হামলায় ব্যবহৃত হচ্ছে। এর মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক আক্রমণের মুখেও ইরান পাল্টা প্রতিরোধ গড়ে তুলতে পারছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
চলতি বছর রয়টার্সের অন্য কয়েকটি অনুসন্ধানেও উঠে এসেছে, অবৈধ আয় সংগ্রহ ও নিষেধাজ্ঞা এড়াতে ইরান ক্রিপ্টো মুদ্রার বিনিময়ব্যবস্থা এবং অবৈধ জুয়াবাণিজ্যের নেটওয়ার্ক ব্যবহার করেছে। পাশাপাশি হরমুজ প্রণালিতে ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনীর নিয়ন্ত্রণ আরও সুসংহত হয়েছে এবং যুদ্ধের ফলে দেশটিতে দমনপীড়নের নতুন পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে।
ইরানের ওপর নিষেধাজ্ঞা ও অস্ত্রসংক্রান্ত বিষয়ে অভিজ্ঞ চারজন বিশেষজ্ঞ রয়টার্সের অনুসন্ধানের তথ্য পর্যালোচনা করেছেন। তাদের মধ্যে মালেকিও ছিলেন। তারা নিশ্চিত করেছেন, শনাক্ত করা অনেক উপকরণ ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র ও চালকবিহীন আকাশযান কর্মসূচিতে ব্যবহার করা সম্ভব।
এ বিষয়ে মন্তব্য জানতে ইরানের বিভিন্ন সরকারি সংস্থা ও প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যোগাযোগ করেছিল রয়টার্স। তবে বিস্তারিত প্রশ্নের জবাব দেয়নি কোনো পক্ষ। তাদের মধ্যে জেনেভায় ইরানের জাতিসংঘ প্রতিনিধি দল ও দেশটির প্রেসিডেন্টের দপ্তরও রয়েছে।
রয়টার্সের অনুসন্ধানের বিষয়ে এক বিবৃতিতে যুক্তরাষ্ট্রের অর্থ মন্ত্রণালয়ের এক মুখপাত্র দাবি করেন, যুক্তরাষ্ট্র ইরানি শাসনব্যবস্থার অর্থনৈতিক জীবনরেখা বিচ্ছিন্ন করেছে। তিনি বলেন, শক্তিশালী নিষেধাজ্ঞা এড়িয়ে সামরিক ও অস্ত্র কর্মসূচির অর্থায়ন এবং বৈদেশিক মুদ্রা সংগ্রহের চেষ্টা ইরান চালিয়ে যেতে পারে। তবে যুক্তরাষ্ট্র সব সময় তাদের চেয়ে অনেক এগিয়ে রয়েছে।
আমদানি করা পণ্যের উৎস ও ব্যবহার যাচাই করতে রয়টার্স প্রায় ১৯ হাজার আমদানি নথির একটি অংশের সঙ্গে পণ্য পরিবহনের কাগজপত্র, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশিত ভিডিও এবং ইরানের রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন মিলিয়ে দেখেছে। তথ্য অনুযায়ী, আমদানি করা প্রায় সব পণ্যই শুল্কমুক্ত ছিল এবং সেগুলোকে নির্দিষ্টভাবে সামরিক সরঞ্জাম হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছিল।
তবে বিশেষজ্ঞরা উল্লেখ করেছেন, এসব উপকরণের অনেকগুলো, এমনকি বিস্ফোরকও, সামরিক ও বেসামরিক উভয় কাজে ব্যবহার করা সম্ভব। ফলে কিছু উপকরণের বেসামরিক ব্যবহারও থাকতে পারে।
এর আগে গত ২৩ সেপ্টেম্বর চীন থেকে ইরানে পাঠানো কিছু চালান নিয়ে প্রতিবেদন প্রকাশ করেছিল মার্কিন সংবাদমাধ্যম ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল।
/অ