দেশ টেলিভিশন লিমিটেড, কর্ণফুলী মিডিয়া পয়েন্ট, ৪২, শহীদ সাংবাদিক সেলিনা পারভীন সড়ক, মালিবাগ, ঢাকা-১২১৭, বাংলাদেশ।
টেলিফোন: +৮৮ (০২) ৮৩৩২৯৫৮, ৮৩৩২৯২২ ফ্যাক্স: +৮৮ (০২) ৮৩৩২৯৮১ মেইল: [email protected]

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) মানবজাতির জন্য ‘বিপর্যয়কর বা অস্তিত্বের জন্য হুমকিস্বরূপ ঝুঁকি’ তৈরি করতে পারে বলে সতর্ক করেছে এআই প্রতিষ্ঠান অ্যানথ্রপিক। যুক্তরাষ্ট্রের শেয়ারবাজারে বড় পরিসরে তালিকাভুক্তির পরিকল্পনার বিস্তারিত প্রকাশের আগে এ সতর্কতা দিয়েছে প্রতিষ্ঠানটি।
প্রাথমিক মূল্যায়নে অ্যানথ্রপিকের বাজারমূল্য স্পেসএক্সকেও ছাড়িয়ে যেতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। গত গ্রীষ্মে প্রাথমিকভাবে প্রায় ১ লাখ ৮০ হাজার কোটি ডলার মূল্যায়নে তালিকাভুক্তির মাধ্যমে স্পেসএক্স শেয়ারবাজারের ইতিহাসে সবচেয়ে বড় তালিকাভুক্তির রেকর্ড গড়েছিল।
তবে অ্যানথ্রপিক এখনো কতটি শেয়ার ছাড়বে, শেয়ারের সম্ভাব্য দাম কত হবে কিংবা কবে তালিকাভুক্ত হবে—এসব তথ্য প্রকাশ করেনি।
ক্লড চ্যাটবটের নির্মাতা প্রতিষ্ঠানটি জানিয়েছে, চলতি বছরের প্রথম ছয় মাসে তাদের আয় হয়েছে ১৬৩০ কোটি ডলার। একই সময়ে লোকসান হয়েছে ৮০৭০ কোটি ডলারের বেশি।
‘এএনটি’ প্রতীকে নাসডাকে তালিকাভুক্ত হওয়ার পরিকল্পনা করেছে অ্যানথ্রপিক। প্রতিষ্ঠানটি শেয়ারবাজারে গেলে এটিই হবে সম্পূর্ণ এআইকেন্দ্রিক প্রথম কোনো কোম্পানি, যা এ প্রযুক্তির ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা ও বিনিয়োগকারীদের আগ্রহ যাচাইয়ের গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষায় পরিণত হবে।
তালিকাভুক্তির আগে জমা দেওয়া নথিতে অ্যানথ্রপিক বলেছে, এআই ব্যবস্থা মানবজাতির জন্য বড় ধরনের ঝুঁকি তৈরি করতে পারে বলে নীতিনির্ধারক, নিয়ন্ত্রক সংস্থা, গবেষক এবং প্রতিষ্ঠানটির অভ্যন্তরীণ ব্যক্তিদের মধ্যে উদ্বেগ রয়েছে।
প্রতিষ্ঠানটির ভাষ্য, উন্নত এআই ব্যবস্থা যথাযথ সুরক্ষা, তদারকি ও নিরাপত্তাব্যবস্থা ছাড়া তৈরি, ব্যবহার বা পরিচালনা করা হলে তা মানবজাতির জন্য বিপর্যয়কর কিংবা অস্তিত্বের জন্য হুমকিস্বরূপ ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। বিশেষ করে এসব ব্যবস্থার অপব্যবহার, অনুলিপি তৈরি, অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার কিংবা অতিমাত্রায় স্বয়ংক্রিয়ভাবে কাজ করার সুযোগ থাকলে ঝুঁকি বাড়তে পারে।
প্রধান নির্বাহী দারিও আমোদেই, তাঁর বোন ড্যানিয়েলা আমোদেই এবং আরও পাঁচজন মিলে পাঁচ বছর আগে অ্যানথ্রপিক প্রতিষ্ঠা করেন। গত জুনে প্রতিষ্ঠানটি শেয়ারবাজারে যাওয়ার পরিকল্পনার কথা জানায়। এর প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী ওপেনএআইও দ্রুত একই ধরনের পরিকল্পনা প্রকাশ করে। প্রতিষ্ঠানটির পরিকল্পনা সম্পর্কে অবগত এক ব্যক্তির বরাত দিয়ে জানা গেছে, ওপেনএআইয়ের তালিকাভুক্তি আগামী বছরের শুরুর দিকে হতে পারে।
এই ঘোষণাগুলোর পর এআই এজেন্টকে ঘিরে সাইবার নিরাপত্তাসহ প্রযুক্তিগত বিভিন্ন নিরাপত্তা লঙ্ঘনের ঘটনা সামনে এসেছে। এআই এজেন্ট হলো এমন বট, যেগুলো কিছুটা স্বয়ংক্রিয়ভাবে বিভিন্ন কাজ সম্পন্ন করতে পারে।
অ্যানথ্রপিক ও ওপেনএআইয়ের বর্তমান ও সাবেক কর্মীদের কেউ কেউ সতর্ক করেছেন, এআই প্রযুক্তির উন্নয়ন এমনভাবে এগোচ্ছে, যাতে ভবিষ্যতে এআইয়ের মাধ্যমে সৃষ্ট সম্ভাব্য ক্ষতি থেকে মানবজাতিকে সুরক্ষিত রাখার পর্যাপ্ত সক্ষমতা এখনো তৈরি হয়নি।
সোমবার অ্যানথ্রপিক যখন শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্তির পরিকল্পনা প্রকাশ করে, তখন এলভিস প্রিসলির সংগীতের স্বত্বাধিকারীরাও প্রতিষ্ঠানটির বিরুদ্ধে মামলা করেন। তাঁদের অভিযোগ, ক্লড চ্যাটবটকে প্রশিক্ষণ দিতে রক অ্যান্ড রোল সংগীতশিল্পী প্রিসলির শত শত গান ব্যবহার করেছে অ্যানথ্রপিক।
তালিকাভুক্তির নতুন নথিতে মানুষের কল্যাণে এআই তৈরির আগের অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করেছে অ্যানথ্রপিক। একই সঙ্গে বিনিয়োগকারীদের কাছে প্রযুক্তিটির ঝুঁকির বিষয়টিও তুলে ধরেছে প্রতিষ্ঠানটি।
আর্থিক নথিতে অ্যানথ্রপিক জানিয়েছে, বছরের প্রথম ছয় মাসে তাদের লোকসানের পরিমাণ আয়কে ছাড়িয়ে গেছে। তবে প্রতিষ্ঠানটির ভাষ্য, তারা প্রায়ই ভবিষ্যৎ প্রবৃদ্ধির জন্য বড় অঙ্কের বিনিয়োগ করবে, যা প্রথম দেখায় ‘দায়িত্বজ্ঞানহীনভাবে বড়’ বলে মনে হতে পারে।
প্রতিষ্ঠানটি বলেছে, ‘সাধারণভাবে আমরা সাহসী, তবে বাস্তবসম্মত সিদ্ধান্ত নেওয়ার চেষ্টা করব এবং সফল বিনিয়োগের নজির গড়ে আস্থা অর্জন করব।’
অ্যানথ্রপিকের মতে, সবচেয়ে উন্নত এআই মডেল তৈরির সক্ষমতার ওপর তাদের সাফল্য অনেকাংশে নির্ভরশীল। প্রতিষ্ঠানটি সতর্ক করে বলেছে, এ ক্ষেত্রে ব্যর্থতা তাদের ব্যবসায় নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।
প্রায় ৯০ পৃষ্ঠার নথিতে নিরাপদ ও প্রতিযোগিতামূলকভাবে এআই উন্নয়নের ক্ষেত্রে সম্ভাব্য ঝুঁকিগুলো বিস্তারিত তুলে ধরেছে প্রতিষ্ঠানটি।
অ্যানথ্রপিক জানিয়েছে, ক্লাউড কম্পিউটিংয়ের জন্য তারা অল্প কয়েকটি সেবাদাতা প্রতিষ্ঠানের ওপর নির্ভরশীল। পাশাপাশি বিপুল চাহিদার মুখে থাকা তাইওয়ানের চিপ নির্মাতাদের ওপর নির্ভরতা এবং যুক্তরাষ্ট্রে ডেটা সেন্টারের কেন্দ্রীভবনও তাদের জন্য ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।
এ ছাড়া এআই মডেলের কারণে ক্ষতি হলে নিয়ন্ত্রক সংস্থার পদক্ষেপের ঝুঁকির কথাও উল্লেখ করেছে প্রতিষ্ঠানটি। শিশু কিংবা আত্মহত্যার ঝুঁকিতে থাকা ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে এআইয়ের ব্যবহার নিয়ে উদ্বেগের পাশাপাশি এআই ব্যবস্থার নেওয়া পদক্ষেপের জন্য কোথায় এবং কীভাবে প্রতিষ্ঠানটিকে দায়ী করা হতে পারে, তা নিয়েও অনিশ্চয়তা রয়েছে।
তবে নথিতে এআই প্রযুক্তির সম্ভাব্য সুফলও তুলে ধরেছে অ্যানথ্রপিক। প্রতিষ্ঠানটির ধারণা, এ প্রযুক্তির মাধ্যমে ‘লক্ষাধিক ভার্চ্যুয়াল এজেন্ট’ তৈরি করা সম্ভব হবে, যা মানুষের কর্মকাণ্ডের প্রায় সব ক্ষেত্রেই বৈপ্লবিক পরিবর্তন আনতে পারে।
অ্যানথ্রপিক বলেছে, ‘আমরা বিশ্বাস করি, এআই মানব ইতিহাসের সবচেয়ে সুদূরপ্রসারী প্রভাব ফেলা প্রযুক্তিগুলোর একটি।’
প্রতিষ্ঠানটির মতে, এআই জীববিজ্ঞান ও চিকিৎসাবিজ্ঞানের অগ্রগতিও উল্লেখযোগ্যভাবে ত্বরান্বিত করতে পারে। এর ফলে ক্যানসার ও আলঝেইমারের মতো রোগের চিকিৎসা বা নিরাময়ের পথ খুঁজে পাওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হতে পারে।
এ ছাড়া উৎপাদনশীলতা বাড়িয়ে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির গতি দীর্ঘ সময়ের জন্য ত্বরান্বিত করতে পারে এআই।
বিনিয়োগ ব্যবস্থাপনা প্রতিষ্ঠান রেমন্ড জেমস ইনভেস্টমেন্টের প্রধান বাজার কৌশলবিদ ম্যাট অরটন বলেন, অ্যানথ্রপিকের আর্থিক হিসাবে দ্রুত প্রবৃদ্ধির পাশাপাশি বড় অঙ্কের লোকসানও দেখতে পাচ্ছেন বিনিয়োগকারীরা। তাই সোমবার প্রকাশিত নথিতে নতুন কিছু থাকায় বাজারের অবাক হওয়ার কথা নয়।
বিবিসিকে তিনি বলেন, ‘এই নথি থেকে বিস্তারিত তথ্য পাওয়া বাজারকে পরিস্থিতি বুঝতে সাহায্য করবে। কারণ, প্রতিষ্ঠানটির আয় কোথা থেকে আসছে এবং কীভাবে বাড়ছে, তা আমাদের জানা প্রয়োজন।’
অন্যদিকে, অ্যান্ডারসেন ক্যাপিটাল ম্যানেজমেন্টের প্রতিষ্ঠাতা পিটার অ্যান্ডারসেন রয়টার্সকে বলেন, অ্যানথ্রপিকের শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্তির পরিকল্পনা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার বিকাশে একটি ‘গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক’।
তিনি আরও বলেন, শেয়ারবাজারে প্রতিষ্ঠানটির অভিষেক কেমন হয়, তা এআই উন্নয়নে বিপুল অর্থ বিনিয়োগ অব্যাহত রাখার বিষয়ে বিনিয়োগকারীদের মনোভাবের একটি গুরুত্বপূর্ণ ইঙ্গিত দেবে।
সূত্র: রয়টার্স
এমএস/