দেশ টেলিভিশন লিমিটেড, কর্ণফুলী মিডিয়া পয়েন্ট, ৪২, শহীদ সাংবাদিক সেলিনা পারভীন সড়ক, মালিবাগ, ঢাকা-১২১৭, বাংলাদেশ।
টেলিফোন: +৮৮ (০২) ৮৩৩২৯৫৮, ৮৩৩২৯২২ ফ্যাক্স: +৮৮ (০২) ৮৩৩২৯৮১ মেইল: [email protected]

চলতি ২০২৬ সালের প্রথম আট মাসেই চীন রেকর্ড ১৫৮.৮ বিলিয়ন ডলার মূল্যের ১,০০০ টনেরও বেশি স্বর্ণ আমদানি করেছে, যা গত বছরের মোট আমদানির চেয়েও অনেক বেশি। একই সাথে চীনের কেন্দ্রীয় ব্যাংক ‘পিপলস ব্যাংক অব চায়না’ (PBOC) টানা ২৩ মাস ধরে স্বর্ণ কিনে তাদের রিজার্ভ বাড়িয়েই চলেছে।
বিশ্লেষকদের মতে, বিশ্ববাজার থেকে চীনের বিপুল পরিমাণ স্বর্ণ কেনার মূল নেপথ্য কারণ হলো মার্কিন ডলারের ওপর নির্ভরতা কমানো (De-dollarization), বৈশ্বিক ভূ-রাজনৈতিক ঝুঁকি থেকে নিজেদের সম্পদ রক্ষা করা এবং অভ্যন্তরীণ অর্থনৈতিক মন্দার বিরুদ্ধে একটি নিরাপদ আর্থিক ঢাল তৈরি করা।
অন্যদিকে, দেশের অর্থনীতি নিয়ে অনিশ্চয়তার মধ্যে নিজেদের সঞ্চয়ের মূল্য ধরে রাখতে স্বর্ণ কিনছেন চীনের সাধারণ বিনিয়োগকারীরাও।
চীনের কেন্দ্রীয় ব্যাংক পিপলস ব্যাংক অব চায়না (পিবিওসি) জানিয়েছে, গত সেপ্টেম্বরেও তারা স্বর্ণ কিনেছে। এর মধ্য দিয়ে টানা ২৩ মাস ধরে স্বর্ণের মজুত বাড়ানোর ধারা অব্যাহত রেখেছে প্রতিষ্ঠানটি। একই মাসে প্রায় তিন বছরের মধ্যে সবচেয়ে বেশি স্বর্ণ কিনেছে চীনের কেন্দ্রীয় ব্যাংক।
বিশ্লেষকদের মতে, এই ধারাবাহিক ক্রয় থেকে বোঝা যায়, এটি সাময়িক কোনও পদক্ষেপ নয়; বরং দীর্ঘমেয়াদি আর্থিক ঝুঁকি ব্যবস্থাপনার অংশ।
চীনের উদ্বেগের অন্যতম কারণ যুক্তরাষ্ট্রের ক্রমবর্ধমান সরকারি ঋণ এবং পশ্চিমা দেশগুলোর অন্য দেশের সম্পদ জব্দ করার নজির। বিশেষ করে ২০২২ সালে ইউক্রেনে রাশিয়ার আগ্রাসনের পর পশ্চিমা দেশগুলো রুশ কেন্দ্রীয় ব্যাংকের বিদেশে থাকা প্রায় ৩০ হাজার কোটি ডলারের সম্পদ আটকে দেয়। এই ঘটনা বিদেশে রাখা আর্থিক সম্পদের নিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে। উদীয়মান অর্থনীতির দেশ এবং বৈশ্বিক দক্ষিণের দেশগুলোর জন্য বিষয়টি বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ।
দেশের অভ্যন্তরে মজুত রাখা স্বর্ণের ক্ষেত্রে অন্য কোনও সরকারের সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভর করতে হয় না। ফলে নিষেধাজ্ঞা বা সম্পদ জব্দের ঝুঁকি মোকাবিলায় স্বর্ণ তুলনামূলকভাবে নিরাপদ বিকল্প হতে পারে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকেরা। তবে কেন্দ্রীয় ব্যাংক ও সাধারণ মানুষের স্বর্ণ কেনার উদ্দেশ্য এক নয়। বেইজিং তার বৈদেশিক সম্পদের ঝুঁকি কমাতে চাইছে। অন্যদিকে, চীনের ব্যক্তিগত বিনিয়োগকারীরা শেয়ারবাজার ও আবাসন খাতের অনিশ্চয়তার মধ্যে সঞ্চয়ের নিরাপদ বিকল্প খুঁজছেন।
বিশ্ব স্বর্ণ কাউন্সিলের (ডব্লিউজিসি) তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের সেপ্টেম্বরে চীনের কেন্দ্রীয় ব্যাংক প্রায় ২৩ টন স্বর্ণ কিনেছে। এতে দেশটির ঘোষিত স্বর্ণের মজুত বেড়ে দাঁড়িয়েছে প্রায় ২ হাজার ৪১০ টনে। ২০২৩ সালের অক্টোবরের পর এক মাসে এটিই ছিল চীনের সবচেয়ে বেশি স্বর্ণ কেনার ঘটনা। সেপ্টেম্বরের শেষে চীনের মোট সরকারি রিজার্ভের ৮ দশমিক ৫ শতাংশ ছিল স্বর্ণ। ২০২৪ সালের শেষেও এই হার ছিল ৫ দশমিক ৫ শতাংশ। অর্থাৎ, রিজার্ভে স্বর্ণ অংশ ক্রমেই বাড়াচ্ছে দেশটি।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের রিজার্ভ বলতে আন্তর্জাতিক লেনদেনের দায় মেটানো এবং আর্থিক সংকট মোকাবিলার জন্য সংরক্ষিত সম্পদকে বোঝায়। এতে সাধারণত বৈদেশিক মুদ্রা, বিদেশি সরকারের ঋণপত্র এবং স্বর্ণ থাকে।
শুধু কেন্দ্রীয় ব্যাংক নয়, চীনের সাধারণ মানুষের মধ্যেও স্বর্ণ কেনার প্রবণতা বেড়েছে। চায়না গোল্ড অ্যাসোসিয়েশনের তথ্যানুযায়ী, ২০২৬ সালের প্রথম ছয় মাসে দেশটিতে স্বর্ণ বার ও মুদ্রা কেনার পরিমাণ আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ২৮ দশমিক ৪ শতাংশ বেড়েছে।
উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, সম্প্রতি স্বর্ণের দাম কমলেও কেনাকাটা অব্যাহত রয়েছে। এক মাসে স্বর্ণের দাম প্রায় ৮ দশমিক ৫ শতাংশ কমেছে। বিশ্ব স্বর্ণ কাউন্সিলের মতে, এর পেছনে ডলারের শক্তিশালী অবস্থান এবং মার্কিন সরকারি ঋণপত্রের তুলনামূলক বেশি মুনাফা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে।
মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে সুদের হার বাড়ানো হলে মার্কিন সরকারি ঋণপত্রের মতো সম্পদে বিনিয়োগ আকর্ষণীয় হয়ে ওঠে। কারণ, এসব বিনিয়োগ থেকে সুদ পাওয়া যায়। বিপরীতে, স্বর্ণ নিজে কোনও সুদ বা নিয়মিত আয় দেয় না। ফলে সুদহার বাড়লে স্বর্ণের তুলনায় সুদভিত্তিক সম্পদের প্রতি বিনিয়োগকারীদের আগ্রহ বাড়তে পারে।
জার্মানির ফ্রাঙ্কফুর্টভিত্তিক কমার্জব্যাংকের পণ্যবাজার গবেষণা বিভাগের প্রধান থু লান নগুয়েনের মতে, মার্কিন সরকারি ঋণপত্র বা ট্রেজারিজের ওপর নির্ভরতা কমানো চীনের স্বর্ণ কেনার অন্যতম প্রধান উদ্দেশ্য।
চীনের বৈদেশিক রিজার্ভের একটি বড় অংশ ডলারভিত্তিক সম্পদে বিনিয়োগ করা। ফলে যুক্তরাষ্ট্রের নীতিগত সিদ্ধান্ত, নিষেধাজ্ঞা কিংবা দুই দেশের মধ্যে সংঘাতের কারণে এসব সম্পদের নিরাপত্তা ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে। স্বর্ণ কেনার মাধ্যমে সেই ঝুঁকিতে বৈচিত্র্য আনতে চাইছে বেইজিং।
চীন বিপুল স্বর্ণ কিনলেও এর অর্থ এই নয় যে, বিশ্ব অর্থনীতিতে মার্কিন ডলারের আধিপত্য শিগগিরই শেষ হতে চলেছে। বিশ্লেষকদের মতে, ডলার এখনও বিশ্বের প্রধান রিজার্ভ মুদ্রা এবং আন্তর্জাতিক লেনদেনের গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম।
সব মিলিয়ে, চীনের স্বর্ণ কেনার কৌশলকে ডলারের আধিপত্যের অবসানের তাৎক্ষণিক পদক্ষেপ হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। বরং এটি বৈদেশিক রিজার্ভে বৈচিত্র্য আনা, ভূরাজনৈতিক ঝুঁকি মোকাবিলা এবং দীর্ঘমেয়াদে আর্থিক নিরাপত্তা বাড়ানোর একটি প্রক্রিয়া। তথ্যসূত্র: আল-জাজিরা
কেএম