দেশ টেলিভিশন লিমিটেড, কর্ণফুলী মিডিয়া পয়েন্ট, ৪২, শহীদ সাংবাদিক সেলিনা পারভীন সড়ক, মালিবাগ, ঢাকা-১২১৭, বাংলাদেশ।
টেলিফোন: +৮৮ (০২) ৮৩৩২৯৫৮, ৮৩৩২৯২২ ফ্যাক্স: +৮৮ (০২) ৮৩৩২৯৮১ মেইল: [email protected]

জুনের শেষের দিকে রাশিয়ার সেনাবাহিনীর শীর্ষ কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ঘোষণা করেছিলেন দেশটির ভাড়াটে সেনাবাহিনী ওয়াগনার গ্রুপের প্রধান ইয়েভগেনি প্রিগোশিন। তিনি তার বাহিনীর যোদ্ধাদের নিয়ে মস্কো অভিমুখে যাত্রা শুরু করেছিলেন। তখন রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন বলেছিলেন এমন পরিস্থিতি রাশিয়াকে গৃহযুদ্ধের দিকে ঠেলে দিতে পারে। পরে অবশ্য, বেলারুশের প্রেসিডেন্ট আলেকসান্দার লুকাশেঙ্কোর মধ্যস্থতায় বিদ্রোহ থামান।
এ ঘটনার পর প্রিগোশিনের ভাগ্যে কি ঘটতে চলছে এ নিয়ে ছিল অনেক জল্পনা-কল্পনা। সেই জল্পনাই বাস্তবে রূপ নিলো। বুধবার ইয়েভগেনি প্রিগোশিন বিমান বিধ্বস্ত হয়ে মারা গেছেন।বিধ্বস্তের ৩০ সেকেন্ড আগেও সব কিছু স্বাভাবিক ছিল বিমানটির। আকস্মিক বিমান বিধ্বস্ত হয়ে সব যাত্রী নিহত হয়েছেন। বিমানে ছিলেন ১০ জন, সবাই মারা গেছেন বলে ধারণা করা হচ্ছে। ওয়াগনারপ্রধানের এমন মৃত্যু স্বাভাবিক দুর্ঘটনা নাকি হত্যাকাণ্ড-এ নিয়ে নানা ধোঁয়াশা চলছে।
শুধু প্রিগোশিন নয়, এর আগে যারা রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের সঙ্গে বিদ্রোহ করেছিলেন তাদেরও চরম পরিণতি ভোগ করতে হয়েছে। এসব ঘটনায় রাশিয়াকে দায়ী করা হলেও মস্কো সে অভিযোগ নাকচ করে আসছে।
সেসব রহস্যময় কয়েকটি ঘটনা সম্পর্কে জেনে নেওয়া যাক:
অ্যালেক্সি নাভালনি
২০২০ সালের আগস্টে সাইবেরিয়া থেকে মস্কো যাওয়ার পথে রাশিয়ার বিরোধীদলীয় নেতা অ্যালেক্সি নাভালনি অসুস্থ হয়ে পড়েন। পরে স্বাস্থ্য পরীক্ষায় জানা যায় তাকে বিষ প্রয়োগ করা হয়েছে। তিনি জার্মানিতে গিয়ে চিকিৎসা নেন। পরে পশ্চিমা বিশেষজ্ঞরা দাবি করে, নাভালনির দেহে নোভিচক নামের নার্ভ এজেন্ট প্রয়োগ করা হয়েছে। তবে নাভালনিকে বিষ প্রয়োগে সম্পৃক্ত থাকার কথা অস্বীকার করেছে রাশিয়া।
২০২১ সালে স্বেচ্ছায় দেশে পৌঁছানোর পরপরই তাকে গ্রেপ্তার করা হয়। জালিয়াতিসহ বিভিন্ন অভিযোগে তাকে মোট সাড়ে ১১ বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে। তিনি এখন সাজা ভোগ করছেন। তবে নাভালনি বরাবরই তার বিরুদ্ধে দায়ের করা অভিযোগগুলো অস্বীকার করে আসছেন।
সের্গেই স্ক্রিপাল
রাশিয়ার সাবেক সামরিক গোয়েন্দা কর্মকর্তা সের্গেই স্ক্রিপাল ব্রিটিশ গোয়েন্দা সংস্থার কাছে গোয়েন্দা তথ্য পাচার করেছিলেন। ২০১৮ সালের মার্চে সালিসবুরিতে একটি বিপণিকেন্দ্রের বাইরে স্ক্রিপাল এবং তার মেয়ে ইউলিয়াকে অচেতন অবস্থায় পাওয়া যায়।
আশঙ্কাজনক অবস্থায় তাদের হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। তবে তারা দুজনই বেঁচে যান। ব্রিটিশ কর্মকর্তারা বলেন, তাদের নোভিচক নামের নার্ভ এজেন্ট প্রয়োগ করা হয়েছে। ১৯৭০ এবং ১৯৮০-এর দশকে সোভিয়েত সামরিক বাহিনী এ ধরনের নার্ভ এজেন্ট তৈরি করত।
তবে এ ঘটনায় সম্পৃক্ততার অভিযোগ অস্বীকার করে রাশিয়া। তাদের দাবি, যুক্তরাজ্য রাশিয়ার বিরুদ্ধ আতঙ্ক ছড়াচ্ছে।
ভ্লাদিমির কারা-মুরজা
রাশিয়ার বিরোধীদলীয় মানবাধিকারকর্মী ভ্লাদিমির কারা-মুরজা বলেছেন, তার বিশ্বাস ২০১৫ এবং ২০১৭ সালে তাঁকে বিষ প্রয়োগের চেষ্টা করা হয়েছিল। জার্মানির একটি পরীক্ষাগারে পরীক্ষার পর কারা-মুরজার শরীরে বিপুল মাত্রায় পারদ, তামা, ম্যাংগানিজ ও দস্তা পাওয়া গিয়েছিল। রয়টার্স ওই মেডিকেল রিপোর্টগুলো হাতে পেয়েছে। তবে কারা-মুরজাকে বিষ প্রয়োগের অভিযোগ অস্বীকার করেছে মস্কো।
আলেক্সান্ডার লিতভিনেনকো
কেজিবির সাবেক এজেন্ট এবং পুতিনের সমালোচক আলেক্সান্ডার লিতভিনেনকো ২০০৬ সালে মারা যান। পোলোনিয়াম-২১০ (এক ধরনের বিরল তেজস্ক্রিয় পদার্থ) মিশ্রিত গ্রিন টি খাওয়ার পর তিনি অসুস্থ হয়ে পড়েছিলেন। পরে লন্ডনের মিলেনিয়াম হোটেলে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তার মৃত্যু হয়। লিতভিনেনকোর বয়স হয়েছিল ৪৩ বছর।
২০১৬ সালে এক ব্রিটিশ তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়, পুতিন সম্ভবত এ হত্যাকাণ্ড অনুমোদন করেছিলেন। তবে এ হত্যাকাণ্ডে জড়িত থাকার অভিযোগ অস্বীকার করেছে ক্রেমলিন।
আলেক্সান্ডার পেরেপিলিচনি
২০১২ সালের নভেম্বরে লন্ডনের কাছে নিজের বিলাসবহুল বাড়ির কাছে ৪৪ বছর বয়সী রুশ নাগরিক আলেক্সান্ডার পেরেপিলিচনির মৃতদেহ পাওয়া যায়। তিনি সেদিন জগিং-এর জন্য বের হয়েছিলেন।
রাশিয়ায় মানি লন্ডারিংবিষয়ক এক ঘটনা তদন্তে সুইস কর্তৃপক্ষকে সহযোগিতা করার পর ২০০৯ সালে ব্রিটেনে আশ্রয় নেন পেরেপিলিচনি। তার আকস্মিক এ মৃত্যুর ঘটনা নিয়ে সন্দেহ তৈরি হয়। অনেকে বলে থাকেন, তাকে হত্যা করা হয়েছে।
ভিক্টর ইয়ুশচেঙ্কো
২০০৪ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের প্রচারণা চলাকালে ইউক্রেনের বিরোধীদলীয় নেতা ভিক্টর ইয়ুশচেঙ্কোকে বিষ প্রয়োগের অভিযোগ ওঠে। তিনি পশ্চিমাপন্থী টিকিটে মস্কোপন্থী প্রধানমন্ত্রী ভিক্টর ইয়ানুকোভিচের বিরুদ্ধে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছিলেন।
ভিক্টর ইয়ুশচেঙ্কো অভিযোগ করেছিলেন, ইউক্রেনের নিরাপত্তা বাহিনীর কর্মকর্তাদের সঙ্গে নৈশভোজ চলার সময় তাকে বিষপ্রয়োগ করা হয়েছে। তবে এ ঘটনায় সম্পৃক্ততার অভিযোগ অস্বীকার করেছে রাশিয়া।
স্বাস্থ্য পরীক্ষায় ভিক্টর ইয়ুশচেঙ্কোর দেহে স্বাভাবিকের চেয়ে ১ হাজার গুণ বেশি ডায়োক্সিন পাওয়া গিয়েছিল। বিষক্রিয়ায় তার মুখ ও শরীর বিকৃত হয়ে গিয়েছিল। ওই ঘটনার পর তার অনেকগুলো অস্ত্রোপচার করতে হয়েছে।
আন্না পোলিতকভস্কায়া
রাশিয়ার নারী সাংবাদিক আন্না পোলিতকভস্কায়া মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনা নিয়ে প্রতিবেদন তৈরি করতেন। ২০০৬ সালের ৭ অক্টোবর মস্কোতে নিজের ফ্ল্যাটের সামনে তাকে গুলি করে হত্যা করা হয়। তিনি সুপার মার্কেট থেকে ফিরছিলেন।
পোলিতকভস্কায়ার বয়স হয়েছিল ৪৮ বছর। এ ঘটনা নিয়ে পশ্চিমা বিশ্ব তীব্র ক্ষোভ জানিয়েছিল। রাশিয়ায় কর্মরত সাংবাদিকদের জীবনের ঝুঁকি নিয়ে অনেকে উদ্বেগ জানিয়েছিলেন তখন।
এফএইচ