দেশ টেলিভিশন লিমিটেড, কর্ণফুলী মিডিয়া পয়েন্ট, ৪২, শহীদ সাংবাদিক সেলিনা পারভীন সড়ক, মালিবাগ, ঢাকা-১২১৭, বাংলাদেশ।
টেলিফোন: +৮৮ (০২) ৮৩৩২৯৫৮, ৮৩৩২৯২২ ফ্যাক্স: +৮৮ (০২) ৮৩৩২৯৮১ মেইল: [email protected]

রাশিয়ার বিপুলসংখ্যক সেনা হত্যার মাধ্যমে দেশটির সামরিক অগ্রযাত্রার সক্ষমতা ভেঙে দেওয়া হয়েছে বলে দাবি করেছেন ইউক্রেনের সাবেক সেনাপ্রধান জেনারেল ওলেক্সান্দর সিরস্কি। তাঁর ভাষ্য, যুদ্ধক্ষেত্রে ইউক্রেনের প্রতিরক্ষা স্থিতিশীল হয়েছে এবং রুশ বাহিনীর অগ্রযাত্রা অনেকটাই আটকে গেছে।
বিবিসিকে দেওয়া এক বিশেষ সাক্ষাৎকারে এসব কথা বলেন সিরস্কি। দায়িত্ব থেকে নাটকীয়ভাবে সরিয়ে দেওয়ার পর এটিই তাঁর প্রথম সাক্ষাৎকার। এ সময় তিনি নিজের অপসারণ, সামরিক নেতৃত্ব নিয়ে সমালোচনা এবং যুদ্ধক্ষেত্রে ইউক্রেনীয় সেনাদের ক্ষয়ক্ষতি নিয়ে ওঠা অভিযোগের জবাব দেন।
সিরস্কি বলেন, যুদ্ধে রাশিয়ার সামগ্রিক ক্ষয়ক্ষতি ইউক্রেনের তুলনায় ছয় গুণ বেশি। শুধু নিহতের সংখ্যা হিসাব করলে এই ব্যবধান ১১ গুণ পর্যন্ত হতে পারে বলেও দাবি করেন তিনি। তবে রাশিয়া ও ইউক্রেন—কোনো দেশই আনুষ্ঠানিকভাবে তাদের নিহত সেনাদের সংখ্যা প্রকাশ করে না। ফলে এসব দাবি স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি।
যুক্তরাজ্যের গোয়েন্দা কর্মকর্তাদের হিসাব অনুযায়ী, ২০২২ সালে ইউক্রেনে পূর্ণমাত্রার আগ্রাসন শুরুর পর থেকে রাশিয়ার প্রায় পাঁচ লাখ সেনা নিহত হয়েছে। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক সেন্টার ফর স্ট্র্যাটেজিক অ্যান্ড ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজের হিসাবে, ২০২৬ সালের জুন পর্যন্ত ইউক্রেনের নিহত সেনার সংখ্যা দেড় লাখ পর্যন্ত হতে পারে।
সিরস্কির মতে, রুশ বাহিনীর তুলনামূলক বেশি প্রাণহানি, প্রযুক্তিগত অগ্রগতি এবং রুশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থার দুর্বল জায়গায় আঘাত করার কৌশল যুদ্ধের বর্তমান অচলাবস্থার পেছনে ভূমিকা রেখেছে। তাঁর দাবি, ২০২৬ সালের প্রথম ছয় মাসে রাশিয়া সব মিলিয়ে মাত্র ৬১ বর্গকিলোমিটার এলাকা দখল করতে পেরেছে। তাঁর ভাষায়, এটি যুদ্ধের সম্মুখসার স্থিতিশীল হওয়ার ইঙ্গিত। ইনস্টিটিউট ফর দ্য স্টাডি অব ওয়ারের (আইএসডব্লিউ) এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৬ সালের সেপ্টেম্বরে রাশিয়া যতটা ভূখণ্ড দখল করেছে, তার চেয়ে বেশি এলাকা হারিয়েছে।
২০২৪ সালে ইউক্রেনের সেনাপ্রধানের দায়িত্ব পান সিরস্কি। ২০২২ সালে রাশিয়ার পূর্ণমাত্রার আগ্রাসনের শুরুতে রাজধানী কিয়েভ রক্ষায় ভূমিকার জন্য তিনি প্রশংসিত হন। একই বছর খারকিভের পূর্বাঞ্চলে ইউক্রেনের সফল পাল্টা অভিযানের নেতৃত্বও দেন তিনি। তবে চলতি বছরের গ্রীষ্মে প্রতিরক্ষামন্ত্রী মিখাইলো ফেদোরভের সঙ্গে মতবিরোধের জেরে তাঁকে দায়িত্ব থেকে সরিয়ে দেন প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি। পরে তাঁর স্থলাভিষিক্ত হন মেজর জেনারেল মিখাইলো দ্রাপাতি।
ফেদোরভের সঙ্গে মতবিরোধের বিষয়ে সিরস্কি বলেন, অস্ত্র ও সামরিক সরঞ্জাম সংগ্রহের ক্ষেত্রে সেনাবাহিনীর প্রয়োজনীয়তা বিবেচনায় নেওয়া হয়নি। তাঁর অভিযোগ, ফেদোরভ ড্রোনকে অগ্রাধিকার দিতে গিয়ে চালকবিহীন স্থলযান, পিকআপ ট্রাক ও মোটরসাইকেলের মতো সম্মুখসারিতে প্রয়োজনীয় সরঞ্জামের বিষয়টি উপেক্ষা করেছেন। এমনকি ড্রোনের ক্ষেত্রেও সেনাবাহিনী চাহিদার মাত্র অর্ধেক পেয়েছে বলে দাবি করেন তিনি।
প্রযুক্তিনির্ভর আধুনিক যুদ্ধ পরিচালনার উপযোগী নন—এমন সমালোচনাও প্রত্যাখ্যান করেছেন সিরস্কি। তাঁর দাবি, তাঁর নেতৃত্বের সময়ই ইউক্রেনের ড্রোন ব্যবহারে অভূতপূর্ব অগ্রগতি হয়েছে। শত্রুপক্ষের ভূখণ্ডের দুই হাজার কিলোমিটারেরও বেশি ভেতরে হামলা চালানোর সক্ষমতা অর্জন করেছে ইউক্রেন। তাঁর ভাষ্য, রাশিয়ার মোট ক্ষয়ক্ষতির ৮০ শতাংশের জন্য এখন ড্রোন দায়ী। ইউক্রেনই প্রথম দেশ হিসেবে সশস্ত্র বাহিনীর পৃথক শাখা হিসেবে চালকবিহীন ব্যবস্থা বাহিনী গঠন করেছে বলেও উল্লেখ করেন তিনি।
তবে সিরস্কির নেতৃত্বে আভদিভকা ও ভুহলেদার শহর এবং পোকরভস্কের আশপাশ থেকে ইউক্রেনীয় সেনাদের বিশৃঙ্খলভাবে পিছু হটার ঘটনাও সমালোচনার জন্ম দিয়েছিল। এর আগে বিবিসিকে সাক্ষাৎকার দেওয়া কয়েকজন সেনা অভিযোগ করেছিলেন, রুশ বাহিনীর হাতে প্রায় ঘেরাও হয়ে পড়লেও তাঁদের অবস্থান ধরে রাখার নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল। পরে পিছু হটার অনুমতি মিললেও ততক্ষণে পরিস্থিতি বিপজ্জনক হয়ে উঠেছিল।
এ ধরনের পরিস্থিতি যুদ্ধক্ষেত্রে ঘটে বলে স্বীকার করলেও সিরস্কি বলেন, ইউক্রেনকে অনেক বেশি শক্তিশালী একটি বাহিনীর বিরুদ্ধে লড়তে হচ্ছে। তাঁর দাবি, ২০২৫ সালে যুদ্ধবিমান ও বোমার ক্ষেত্রে রাশিয়ার সক্ষমতা ইউক্রেনের তুলনায় ১৮ গুণ বেশি ছিল। একই সময়ে রাশিয়ার কাছে ইউক্রেনের তুলনায় আড়াই গুণ বেশি কামান ও গোলাবারুদ ছিল। এ ছাড়া রাশিয়ার প্রায় ৪০ লাখ সামরিক প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত মানুষকে যুদ্ধে নিয়োগের সুযোগ রয়েছে, যা তাদের নতুন করে অগ্রসর হওয়ার সম্ভাবনা তৈরি করে।
২০২৪ সালের আগস্টে রাশিয়ার কুরস্ক অঞ্চলে ইউক্রেনের সামরিক অভিযানও সিরস্কির আলোচিত পদক্ষেপগুলোর একটি। পরের বছরের বসন্তে ওই অঞ্চল থেকে ইউক্রেনীয় সেনাদের পিছু হটতে হয়। কিছু সেনা এই প্রত্যাহারকে বিপর্যয়কর বলে বর্ণনা করলেও সিরস্কির দাবি, অভিযানটি ছিল প্রয়োজনীয়। তাঁর মতে, ২০২৪ সালের গ্রীষ্মে সম্মুখসারির প্রধান দিকগুলোতে রুশ সেনাসংখ্যা ইউক্রেনের তুলনায় ছয় গুণ পর্যন্ত বেশি ছিল। কুরস্ক অভিযান রাশিয়ার আক্রমণে বিঘ্ন ঘটায় এবং মস্কোকে অন্য এলাকা থেকে সেনা সরিয়ে নিতে বাধ্য করে। এতে পূর্ব ও দক্ষিণাঞ্চলে চাপের মুখে থাকা ইউক্রেনীয় ব্রিগেডগুলো পুনর্গঠনের সুযোগ পায়।
ইউরোপীয় মিত্রদের উদ্দেশে সিরস্কি বলেন, রাশিয়ার ইউক্রেনের বাইরেও ভূখণ্ডগত উচ্চাকাঙ্ক্ষা থাকতে পারে—এমন সম্ভাবনাকে অবহেলা করা উচিত নয়। যুদ্ধের জন্য এখনই প্রস্তুতি নেওয়ার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, যুদ্ধ ইউরোপে ছড়িয়ে পড়বে না—এমন ধারণা থেকে বেরিয়ে আসতে হবে।
ভবিষ্যতে যুদ্ধ আরও প্রযুক্তিনির্ভর হয়ে উঠবে বলেও মনে করেন সিরস্কি। তাঁর মতে, রোবট, স্বয়ংক্রিয় ব্যবস্থা ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ব্যবহার বাড়বে। প্রচলিত অস্ত্রেও সক্ষমতা বাড়াতে এআইভিত্তিক নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা যুক্ত করা হচ্ছে। রাশিয়া ও ইউক্রিয়া—উভয় দেশই সাঁজোয়া যান সুরক্ষায় সক্রিয় প্রতিরক্ষাব্যবস্থা তৈরির প্রতিযোগিতায় রয়েছে। তবে এসব প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়লেও যুদ্ধক্ষেত্রে মানুষের ভূমিকা নির্ধারক থাকবে বলে মন্তব্য করেন তিনি।
সূত্র: বিবিসি
এমএস/