দেশ টেলিভিশন লিমিটেড, কর্ণফুলী মিডিয়া পয়েন্ট, ৪২, শহীদ সাংবাদিক সেলিনা পারভীন সড়ক, মালিবাগ, ঢাকা-১২১৭, বাংলাদেশ।
টেলিফোন: +৮৮ (০২) ৮৩৩২৯৫৮, ৮৩৩২৯২২ ফ্যাক্স: +৮৮ (০২) ৮৩৩২৯৮১ মেইল: [email protected]

রাশিয়ার নতুন করে বিমান হামলার নীতির জবাবে দেশটির তেল শোধনাগারগুলোতে হামলা আরও বাড়ানোর ঘোষণা দিয়েছেন ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি। তবে রাশিয়ার মতো বেসামরিক অবকাঠামোতে নির্বিচারে হামলা চালানো হবে না বলেও জানিয়েছেন তিনি।
জেলেনস্কি দাবি করেছেন, ইউক্রেনীয় গোয়েন্দারা এমন কিছু নথি পেয়েছে, যাতে দেখা গেছে রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন শীত মৌসুমের আগে বেসামরিক স্থাপনার আরও বিস্তৃত পরিসরে হামলার অনুমোদন দিয়ে নতুন একটি সামরিক নীতি গ্রহণ করেছেন।
তিনি বলেন, এসব নথিতে অবকাঠামো, সরবরাহব্যবস্থা, সড়ক, স্কুল ও হাসপাতালসহ বিভিন্ন স্থাপনায় হামলার অনুমোদনের কথা রয়েছে। এর উদ্দেশ্য মানুষকে রাজধানী কিয়েভ ও অন্যান্য শহর ছেড়ে যেতে বাধ্য করা বলে দাবি করেন তিনি।
জেলেনস্কির ভাষ্য, রুশ সামরিক বাহিনী একটি গুরুত্বপূর্ণ ফ্রন্টে চাপের মুখে থাকা এবং বেশি সংখ্যক হতাহতের মধ্যে পড়ায় পুতিন শক্ত অবস্থান দেখাতে এই নীতিতে পরিবর্তন এনেছেন।
এ বিষয়ে শনিবার রাশিয়ার ক্রেমলিনের তাৎক্ষণিক কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি। তবে কিয়েভ ছাড়তে বিদেশি নাগরিকদের প্রতি আহ্বান জানিয়ে রুশ পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বলেছে, সাম্প্রতিক মাসগুলোতে রাশিয়ার ওপর ইউক্রেনের হামলার জবাবে মস্কো পরিকল্পিতভাবে বিভিন্ন লক্ষ্যবস্তুতে হামলা চালিয়ে যাবে। দুই পক্ষই বেসামরিক নাগরিকদের ইচ্ছাকৃতভাবে লক্ষ্যবস্তু করার অভিযোগ অস্বীকার করে আসছে।
এদিকে ইউক্রেনের পূর্বাঞ্চলীয় দনবাসে চলমান পাল্টা অভিযান নিয়েও কথা বলেছেন জেলেনস্কি। তাঁর দাবি, ভিভালদি নামে পরিচালিত এ অভিযানে প্রায় ১৪০ বর্গকিলোমিটার এলাকা পুনর্দখল করেছে ইউক্রেনীয় বাহিনী। দনবাসের পুরো নিয়ন্ত্রণকে রাশিয়া সম্ভাব্য শান্তিচুক্তির অন্যতম শর্ত হিসেবে দেখিয়ে আসছে।
গত কয়েক সপ্তাহ ধরে চার বছর ধরে চলা যুদ্ধের অবসানে আলোচনার উদ্যোগ পুনরুজ্জীবিত করার চেষ্টা করছে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসন। গত মাসে ট্রাম্প রাশিয়ার তেল স্থাপনায় হামলা থেকে ইউক্রেনকে বিরত থাকার আহ্বান জানিয়েছিলেন। তাঁর মতে, এসব হামলার কারণে বিশ্ববাজারে ডিজেলের দাম বাড়ছে।
তবে জেলেনস্কি বলেন, রাশিয়া শান্তি আলোচনা বা জ্বালানি অবকাঠামোয় হামলা বন্ধের বিষয়ে আগ্রহী—এমন কোনো ইঙ্গিত তিনি পাননি। গত এক সপ্তাহ ধরে কিয়েভে রুশ ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা অব্যাহত রয়েছে। এসব হামলায় জ্বালানি ও টেলিযোগাযোগ অবকাঠামো, সড়ক ও রেল যোগাযোগের পাশাপাশি দনিপ্রো নদীর ওপর থাকা সেতুগুলোও লক্ষ্যবস্তু হয়েছে।
জেলেনস্কি বলেন, রাশিয়ার জ্বালানি অবকাঠামোয় হামলার জবাবে ইউক্রেনও রাশিয়ার জ্বালানি খাতে আঘাত হানবে। বিশেষ করে তেল শোধনাগারগুলোকে লক্ষ্য করা হবে, কারণ এসব স্থাপনা থেকে পাওয়া অর্থ রাশিয়ার যুদ্ধ পরিচালনায় সহায়তা করে। তবে বেসামরিক স্থাপনায় রাশিয়ার মতো হামলা চালানো হবে না বলে তিনি স্পষ্ট করেন।
ট্রাম্প প্রশাসন ডিসেম্বরে মিয়ামিতে অনুষ্ঠেয় জি-২০ সম্মেলনে পুতিনকে আমন্ত্রণ জানানো এবং রুশ প্রতিনিধিদের সঙ্গে ব্যবসায়িক সম্পর্ক পুনরুদ্ধার নিয়ে আলোচনার পর জেলেনস্কি ওয়াশিংটনকে সতর্ক করে বলেছেন, শান্তি নিশ্চিত হওয়ার আগে রাশিয়ার সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিক করা উচিত নয়।
জেলেনস্কি বলেন, জি-২০ সম্মেলনে শান্তি আলোচনার জন্য পুতিনের সঙ্গে দেখা করতে তিনি প্রস্তুত। তবে দনবাসের নিয়ন্ত্রণ রাশিয়ার হাতে গেলে যুদ্ধ শেষ হয়ে যাবে—এমন ধারণায় যুক্তরাষ্ট্রের বিশ্বাস করা উচিত নয় বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
এদিকে শীত মৌসুমে ইউক্রেনের বিদ্যুৎ ও পানি অবকাঠামোয় বড় ধরনের হামলার আশঙ্কা করছে কিয়েভ। ইউক্রেনীয় কর্মকর্তাদের দাবি, রাশিয়া ইতোমধ্যে শত শত ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র মজুত করেছে। গত শীতে রুশ হামলায় দেশটির বিভিন্ন অঞ্চলে কয়েক দিন পর্যন্ত বিদ্যুৎ ও তাপ সরবরাহ বন্ধ ছিল।
গ্রীষ্মের পর থেকে রাশিয়া প্রতিদিন ইউক্রেনে দ্রুতগতির জেটচালিত শাহেদ ড্রোনের কয়েক ডজন ইউনিট ছুড়ছে বলেও দাবি করেছেন জেলেনস্কি। এসব ড্রোন ঠেকাতে ইউক্রেনের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে। তাঁর দাবি, রুশ জেটচালিত ড্রোনের প্রায় ৬০ শতাংশ ভূপাতিত করতে এফ-১৬ ও মিগ যুদ্ধবিমানের ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভর করতে হচ্ছে। তবে এসব বিমানের ২০ মিলিমিটার গোলাবারুদের মজুত কমে আসছে।
জেলেনস্কি জানান, ড্রোন মোকাবিলায় ইলেকট্রনিক জ্যামিং সক্ষমতা বাড়ানোর পাশাপাশি নতুন ধরনের স্বল্পমূল্যের আকাশ প্রতিরক্ষা ক্ষেপণাস্ত্র সংগ্রহের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। অক্টোবরের দ্বিতীয়ার্ধে এসব ক্ষেপণাস্ত্রের প্রথম চালান পাওয়ার কথা রয়েছে। পাশাপাশি শাহেদ ড্রোন ভূপাতিত করতে পাঁচ ধরনের নতুন ইন্টারসেপ্টর ড্রোন তৈরির কাজও চলছে।
এদিকে চলতি সপ্তাহে নিজেদের তৈরি এফপি-৭ ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র প্রথমবারের মতো যুদ্ধে ব্যবহার করেছে ইউক্রেন। ক্ষেপণাস্ত্রটির পাল্লা প্রায় ২৫০ কিলোমিটার। জেলেনস্কি জানান, এর নির্মাতা ফায়ার পয়েন্টকে আরও দীর্ঘপাল্লার এফপি-৯ ক্ষেপণাস্ত্র দ্রুত প্রস্তুতের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। প্রতিষ্ঠানটির দাবি, এ ক্ষেপণাস্ত্র মস্কো পর্যন্ত আঘাত হানতে সক্ষম হবে।
জেলেনস্কি আরও অভিযোগ করেন, ইউরোপের বিভিন্ন দেশে সাম্প্রতিক রুশ ড্রোন অনুপ্রবেশ ও হাইব্রিড হামলার উদ্দেশ্য ইউরোপীয় জনগণকে ভয় দেখানো এবং ইউক্রেনের প্রতি সমর্থনে বিভাজন তৈরি করা। তবে রাশিয়া এসব অভিযোগ ভিত্তিহীন বলে দাবি করেছে।
ব্রাসেলসে ইউরোপীয় কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠকের পর ইউক্রেন ২০২৭ সালের শুরুতে যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার জন্য প্রয়োজনীয় ড্রোনের অর্ডারে অর্থায়নের ব্যবস্থা করেছে বলেও জানান জেলেনস্কি। চলতি বছরে ইউক্রেনের প্রতিরক্ষা বাজেটে ২৭ বিলিয়ন ডলারের ঘাটতি পূরণে ইউরোপীয় অংশীদারদের সঙ্গে একটি পরিকল্পনা করা হয়েছে বলে জানান তিনি।
সূত্র: রয়টার্স
এমএস/