দেশ টেলিভিশন লিমিটেড, কর্ণফুলী মিডিয়া পয়েন্ট, ৪২, শহীদ সাংবাদিক সেলিনা পারভীন সড়ক, মালিবাগ, ঢাকা-১২১৭, বাংলাদেশ।
টেলিফোন: +৮৮ (০২) ৮৩৩২৯৫৮, ৮৩৩২৯২২ ফ্যাক্স: +৮৮ (০২) ৮৩৩২৯৮১ মেইল: [email protected]

সৌদি আরবের সঙ্গে গত এক বছরে পাকিস্তানের প্রতিরক্ষা ও নিরাপত্তা সহযোগিতা উল্লেখযোগ্যভাবে গভীর হয়েছে। দুই দেশের মধ্যে একাধিক প্রতিরক্ষা চুক্তি স্বাক্ষর, সৌদি নেতৃত্বাধীন নতুন সামুদ্রিক জোটে পাকিস্তানের গুরুত্বপূর্ণ সামরিক পদ গ্রহণ এবং সৌদি আরবে হাজার হাজার পাকিস্তানি সেনা মোতায়েন—সব মিলিয়ে রিয়াদের নিরাপত্তায় ইসলামাবাদের সম্পৃক্ততা আগের তুলনায় অনেক বেড়েছে। এর মধ্যেই ইয়েমেনের হুথিদের নতুন করে সৌদি ভূখণ্ডে হামলা পাকিস্তানের এসব প্রতিশ্রুতির বাস্তব পরীক্ষা সামনে এনে দিয়েছে।
সৌদি আরবের প্রতিরক্ষার সঙ্গে পাকিস্তানকে যুক্ত করেছে তিনটি গুরুত্বপূর্ণ নিরাপত্তা ব্যবস্থা। এর মধ্যে প্রথমটি হলো ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে স্বাক্ষরিত দ্বিপক্ষীয় স্ট্র্যাটেজিক মিউচুয়াল ডিফেন্স অ্যাগ্রিমেন্ট। চুক্তি অনুযায়ী, দুই দেশের যেকোনো একটির ওপর হামলাকে উভয় দেশের ওপর হামলা হিসেবে বিবেচনা করার কথা বলা হয়েছে।
এরপর ২০২৬ সালের আগস্টে সৌদি ক্রাউন প্রিন্স মোহাম্মদ বিন সালমান, তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়েপ এরদোয়ান এবং পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ মক্কা জয়েন্ট ডিফেন্স অ্যাগ্রিমেন্ট স্বাক্ষর করেন। এই চুক্তিতেও তিন দেশের যেকোনো একটির ওপর হামলাকে সম্মিলিত প্রতিরক্ষার বিষয় হিসেবে দেখার মতো একই ধরনের ভাষা রয়েছে। পাকিস্তান চুক্তিটিকে সম্মিলিত প্রতিরোধ সক্ষমতা জোরদারের একটি উপায় হিসেবে বর্ণনা করেছে।
এদিকে সৌদি আরব ৩০ জুলাই জাহাজ চলাচলের নিরাপত্তা জোরদার করতে ১৪টি দেশকে নিয়ে মাল্টিন্যাশনাল মেরিটাইম ডিফেন্স কোয়ালিশন গঠন করে। লোহিত সাগর, এডেন উপসাগর ও বাব আল-মান্দাব প্রণালিতে বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচলের নিরাপত্তা নিশ্চিত করাই এর অন্যতম লক্ষ্য। রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, পাকিস্তান এই জোটের ১৪ সদস্যের একটি। ২ সেপ্টেম্বর জোটটি কার্যক্রম শুরু করলে পাকিস্তান নৌবাহিনীর কমোডর রশিদ শেখ উপ-কম্যান্ডারের দায়িত্ব নেন। তাঁর ওপরে রয়েছেন সৌদি রিয়ার অ্যাডমিরাল আবদুল্লাহ বিন সালেম আল-শেহরি।
এসব প্রতিশ্রুতি শুধু কাগজে-কলমে সীমাবদ্ধ নয়। রয়টার্সের মে মাসের এক প্রতিবেদনে বলা হয়, পাকিস্তান সৌদি আরবে প্রায় ৮ হাজার সামরিক সদস্য, ১৬টি জেএফ-১৭ যুদ্ধবিমান, দুটি ড্রোন স্কোয়াড্রন এবং একটি এইচকিউ-৯ আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা মোতায়েন করেছে। গোপন দ্বিপক্ষীয় চুক্তিটি সম্পর্কে অবগত এক সরকারি কর্মকর্তার বরাত দিয়ে রয়টার্স আরও জানিয়েছে, প্রয়োজনে সৌদি আরবে সর্বোচ্চ ৮০ হাজার পাকিস্তানি সেনা মোতায়েনের সুযোগ রয়েছে।
এর মধ্যেই সৌদি আরবকে ঘিরে নিরাপত্তা পরিস্থিতির অবনতি হয়েছে। ইয়েমেনের হুথি বাহিনী দেশটির পশ্চিম উপকূল ধরে বাব আল-মান্দাবের দিকে অগ্রসর হয়েছে এবং সৌদি ভূখণ্ডে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা আবারও শুরু হয়েছে। সৌদি কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, আবহা, খামিস মুশাইত, জাজান ও নাজরানে হামলায় ৭৩ জন আহত হয়েছেন। হুথিরা দাবি করেছে, তারা সৌদি আরামকো স্থাপনা ও কিং খালিদ বিমানঘাঁটিকে লক্ষ্য করে হামলা চালিয়েছে।
১৫ সেপ্টেম্বর সৌদি আরব জানায়, মক্কার দক্ষিণে একটি হুথি ড্রোন ভূপাতিত করা হয়েছে। ড্রোনটি মক্কার নিষিদ্ধ আকাশসীমায় প্রবেশের আগেই প্রতিহত করা হয় বলে জানায় সৌদি কর্তৃপক্ষ। সৌদি জোটের মুখপাত্র মেজর জেনারেল তুর্কি আল-মালকি বলেন, মক্কা, মদিনা ও হজযাত্রীদের নিরাপত্তা ‘রেড লাইন’। তবে হুথিরা মক্কাকে লক্ষ্য করে হামলার কথা অস্বীকার করেছে। ফলে ড্রোনটির প্রকৃত লক্ষ্য নিয়ে বিতর্ক রয়েছে।
ঘটনাটি পাকিস্তানের জন্য বিশেষভাবে স্পর্শকাতর। কারণ সৌদি আরবের সঙ্গে সম্পর্কের ক্ষেত্রে মক্কা ও মদিনার পবিত্র দুই মসজিদের নিরাপত্তাকে পাকিস্তান দীর্ঘদিন ধরে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হিসেবে বিবেচনা করে আসছে।
তবে এসব ঘটনার পরও পাকিস্তান এখন পর্যন্ত চুক্তির আওতায় সরাসরি সামরিক প্রতিক্রিয়া থেকে বিরত রয়েছে। ১০ সেপ্টেম্বর পাকিস্তানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানায়, মক্কা চুক্তির আওতায় কোনো সামরিক পদক্ষেপ নেওয়ার বিষয়টি তখন আলোচনায় ছিল না। এই অবস্থান চুক্তির বিস্তৃত সম্মিলিত প্রতিরক্ষা প্রতিশ্রুতির সঙ্গে প্রশ্ন তৈরি করছে। এর আগে পাকিস্তানের প্রতিরক্ষামন্ত্রী খাজা আসিফ বলেছিলেন, সংঘাত সৌদি ভূখণ্ডে ছড়িয়ে পড়লে চুক্তিটি কার্যকর হবে।
সেপ্টেম্বরের পরিস্থিতিতে হুথিদের ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন সৌদি ভূখণ্ডে আঘাত হানায় সেই শর্ত পূরণ হয়েছে কি না, তা নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। তবে চুক্তিতে হামলার প্রতিক্রিয়ায় পাকিস্তানকে স্বয়ংক্রিয়ভাবে সামরিক অভিযান চালাতেই হবে—এমন ব্যাখ্যা সরাসরি পাওয়া যায় না। ফলে ইসলামাবাদ তার প্রতিরক্ষা প্রতিশ্রুতিকে কীভাবে ব্যাখ্যা করে, সেটিই এখন গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
এটি পাকিস্তানের জন্য নতুন কোনো দ্বিধা নয়। ২০১৫ সালে সৌদি আরব ইয়েমেনে সামরিক অভিযান শুরু করলে রিয়াদ পাকিস্তানের কাছে স্থলসেনা, যুদ্ধবিমান ও নৌযান পাঠানোর অনুরোধ করেছিল। পাকিস্তানের সংসদ পাঁচ দিন ধরে বিষয়টি নিয়ে আলোচনা করে এবং শেষ পর্যন্ত ইয়েমেন যুদ্ধে নিরপেক্ষ থাকার সিদ্ধান্ত নেয়। একই সঙ্গে সৌদি আরবের ভৌগোলিক অখণ্ডতা রক্ষার প্রতিশ্রুতিও দেওয়া হয়। পাকিস্তান তখন ইয়েমেনে কোনো যুদ্ধসেনা পাঠায়নি।
তবে ২০২৬ সালের পরিস্থিতি আগের তুলনায় জটিল। হুথি বাহিনী একই সঙ্গে বাব আল-মান্দাব প্রণালির নিরাপত্তার জন্য হুমকি তৈরি করছে—যে সামুদ্রিক করিডোর সুরক্ষার লক্ষ্যেই পাকিস্তান নতুন সামুদ্রিক জোটে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব নিয়েছে। ফলে সৌদির সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় প্রতিরক্ষা চুক্তি, ত্রিপক্ষীয় মক্কা প্রতিরক্ষা চুক্তি এবং সামুদ্রিক জোটে পাকিস্তানের নেতৃত্বস্থানীয় ভূমিকা—তিন দিক থেকেই ইসলামাবাদের ওপর চাপ তৈরি হয়েছে।
২০১৫ সালে পাকিস্তান ইয়েমেন যুদ্ধে অংশ না নিয়েও সৌদি আরবের ভূখণ্ড রক্ষার প্রতিশ্রুতি বজায় রাখতে পেরেছিল, কারণ সেই প্রতিশ্রুতি সরাসরি পরীক্ষার মুখে পড়েনি। ২০২৬ সালে পরিস্থিতি ভিন্ন। সৌদি আরবে ইতোমধ্যে পাকিস্তানি সামরিক সদস্য মোতায়েন রয়েছে। বাব আল-মান্দাবকেন্দ্রিক হুমকি মোকাবিলায় গঠিত সামুদ্রিক জোটে পাকিস্তানি কর্মকর্তা গুরুত্বপূর্ণ কমান্ডে রয়েছেন। একই সঙ্গে দুই দেশ এমন চুক্তি করেছে, যেখানে সৌদি আরবের ওপর হামলাকে পাকিস্তানের ওপর হামলা হিসেবে বিবেচনার কথা বলা হয়েছে।
এদিকে কূটনৈতিক তৎপরতাও জোরদার হচ্ছে। ২৫ সেপ্টেম্বর পাকিস্তান, সৌদি আরব ও তুরস্কের পররাষ্ট্রমন্ত্রীরা মক্কা জয়েন্ট ডিফেন্স অ্যাগ্রিমেন্টের আওতায় সৌদি আরবকে সহায়তার সম্ভাব্য উপায় নিয়ে আলোচনা করতে তিন দেশের সামরিক বাহিনীর প্রধানদের একটি জরুরি বৈঠক আয়োজনের বিষয়ে আলোচনা করেন।
ফলে এখন প্রশ্নটি শুধু পাকিস্তান সৌদি আরবকে কী প্রতিশ্রুতি দিয়েছে—তা নয়। মূল প্রশ্ন হলো, সেই প্রতিশ্রুতি বাস্তবে কতটা এবং কীভাবে কার্যকর করবে ইসলামাবাদ।
সূত্র: অ্যামেরিকান থিংকার