দেশ টেলিভিশন লিমিটেড, কর্ণফুলী মিডিয়া পয়েন্ট, ৪২, শহীদ সাংবাদিক সেলিনা পারভীন সড়ক, মালিবাগ, ঢাকা-১২১৭, বাংলাদেশ।
টেলিফোন: +৮৮ (০২) ৮৩৩২৯৫৮, ৮৩৩২৯২২ ফ্যাক্স: +৮৮ (০২) ৮৩৩২৯৮১ মেইল: [email protected]

ইয়েমেনে চলমান সহিংসতা আরও বাড়তে না দেওয়ার প্রচেষ্টায় হুথি প্রতিনিধিদের সঙ্গে বৈঠক করেছেন দেশটির জন্য জাতিসংঘের বিশেষ দূত হ্যান্স গ্রুন্ডবার্গ। দেশটির পশ্চিম উপকূলে ইরান-সমর্থিত হুথি ও সৌদি-সমর্থিত, তবে বিভক্ত সরকারি বাহিনীর মধ্যে তীব্র লড়াইয়ের মধ্যেই এ বৈঠক অনুষ্ঠিত হলো।
মঙ্গলবার কায়রোতে অ্যাসোসিয়েটেড প্রেসকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে গ্রুন্ডবার্গ বলেন, সপ্তাহান্তে ওমানে হুথিদের প্রধান আলোচক মোহাম্মদ আবদুল সালামের সঙ্গে বৈঠক করেছেন তিনি। বর্তমান উত্তেজনা আরও বাড়তে না দেওয়ার কোনো উপায় আছে কি না, তা নিয়ে আলোচনাই ছিল বৈঠকের উদ্দেশ্য।
এর আগে সৌদি আরবের রাজধানী রিয়াদে আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত ইয়েমেন সরকার ও আঞ্চলিক শক্তিগুলোর সঙ্গেও বৈঠক করেন গ্রুন্ডবার্গ। এসব আলোচনায় সৌদি আরবও ছিল। হুথিদের সাম্প্রতিক তৎপরতাকে তিনি নজিরবিহীন ও নাটকীয় হিসেবে বর্ণনা করেন। সাম্প্রতিক উত্তেজনায় সৌদি আরবই হুথিদের প্রধান লক্ষ্য বলে জানান তিনি।
গ্রুন্ডবার্গ বলেন, আঞ্চলিক অস্থিতিশীলতা এবং ইরানসহ ইয়েমেনের প্রতিবেশী ও অন্যান্য আঞ্চলিক পক্ষগুলোর প্রভাবও দেশটির সংঘাতের গতিপথে প্রভাব ফেলেছে।
ইরানি বিশেষজ্ঞদের সহায়তায় হুথিরা সেপ্টেম্বরের শুরুতে লোহিত সাগরের উপকূল ধরে দ্রুত অগ্রসর হয়ে কৌশলগত শহর মোকা এবং লোহিত সাগরের কয়েকটি দ্বীপ দখল করে। এর ফলে গুরুত্বপূর্ণ বাব আল-মান্দাব প্রণালির দিকে তাদের নিয়ন্ত্রণ আরও বিস্তৃত হয়। কয়েক বছরের মধ্যে এটিই ছিল হুথিদের সবচেয়ে বড় ভূখণ্ড দখলের ঘটনা। এর মধ্য দিয়ে ২০২২ সালে শুরু হওয়া যুদ্ধবিরতিরও অবসান ঘটে। ওই যুদ্ধবিরতির কারণে ইয়েমেনের দীর্ঘস্থায়ী গৃহযুদ্ধে বড় ধরনের লড়াই অনেকটাই বন্ধ ছিল।
হুথিরা সৌদি আরবের অভ্যন্তরেও হামলা বাড়িয়েছে। তারা দেশটির তেল স্থাপনায় হামলা চালানোর পাশাপাশি বাব আল-মান্দাব প্রণালি দিয়ে তেলবাহী জাহাজ চলাচলেও বাধা দিয়েছে। বিশ্বের মোট বাণিজ্যের প্রায় ১২ শতাংশ এই প্রণালি দিয়ে পরিচালিত হয়।
জাতিসংঘের তথ্য অনুযায়ী, হুথিদের হামলা ও সৌদি-সমর্থিত ইয়েমেনি ও মিত্র বাহিনীর সঙ্গে সংঘর্ষে অন্তত ৮৩৮ জন নিহত এবং ৩ হাজার ৬৪০ জনের বেশি আহত হয়েছেন। জাতিসংঘের অভিবাসন সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, সংঘাতের কারণে ইয়েমেনের অভ্যন্তরে ১ লাখ ৪৫ হাজারের বেশি মানুষ বাড়িঘর ছেড়ে পালাতে বাধ্য হয়েছেন। আরও ৩ হাজারের বেশি মানুষ সমুদ্রপথে জিবুতিতে আশ্রয় নিয়েছেন।
গ্রুন্ডবার্গ বলেন, ইয়েমেনে বর্তমান উত্তেজনা গৃহযুদ্ধের আগের দফাগুলোর তুলনায় আরও জটিল হয়ে উঠেছে। যুদ্ধের সম্মুখসারির অবস্থান এখন লোহিত সাগরের উপকূলে সরে গেছে, যেখানে সবচেয়ে সংবেদনশীল যুদ্ধক্ষেত্রগুলো বৈশ্বিক বাণিজ্যের জন্য গুরুত্বপূর্ণ সমুদ্রপথকে হুমকির মুখে ফেলছে।
তিনি বলেন, লোহিত সাগরে বাণিজ্যিক জাহাজেও হামলা হয়েছে। এটি উদ্বেগজনক এবং জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের জন্যও বিষয়টি উদ্বেগের হওয়া উচিত।
জাতিসংঘের বিশেষ দূত আরও বলেন, ইয়েমেনের সংঘাত মধ্যপ্রাচ্যে সাম্প্রতিক যুদ্ধগুলোর সঙ্গেও ক্রমেই যুক্ত হয়ে পড়ছে। ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর হামাসের ইসরায়েলের দক্ষিণাঞ্চলে হামলার মধ্য দিয়ে শুরু হওয়া সংঘাত এবং সর্বশেষ যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধের সঙ্গেও ইয়েমেনের পরিস্থিতির যোগসূত্র তৈরি হয়েছে।
ইয়েমেনের সংঘাত সৌদি আরব ও ইরানের মধ্যে আঞ্চলিক প্রক্সি যুদ্ধেও পরিণত হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রও দীর্ঘদিন ধরে সৌদি আরবকে গোয়েন্দা সহায়তা দিয়ে পরোক্ষভাবে এই সংঘাতে যুক্ত ছিল। তবে সৌদি বিমান হামলায় বেসামরিক মানুষ নিহত হওয়ার ঘটনায় আন্তর্জাতিক সমালোচনার পর যুক্তরাষ্ট্র তাদের সমর্থন কমিয়ে দেয়।
গ্রুন্ডবার্গ বলেন, বর্তমান পরিস্থিতির সমাধান করা কঠিন হবে। সংঘাতে জড়িত পক্ষ ও তাদের সমর্থকেরা উত্তেজনা বাড়ার পরিণতি মূল্যায়নের চেষ্টা করছে। যুদ্ধক্ষেত্রে কিংবা আলোচনার টেবিলে সামনে এগোনোর সবচেয়ে ভালো পথ কী হতে পারে, তা নির্ধারণের আগে পরিস্থিতি কিছুটা স্থির হওয়া প্রয়োজন।
ইয়েমেনের সংকটের সমাধান খুঁজে পেতে দেশটির যুদ্ধকে মধ্যপ্রাচ্যের অন্যান্য সংঘাত থেকে আলাদা করা প্রয়োজন বলেও মন্তব্য করেন জাতিসংঘের বিশেষ দূত। তার মতে, সংঘাতগুলো আলাদা করে একটির পর একটি কার্যকর ও দক্ষতার সঙ্গে আলোচনার মাধ্যমে সমাধানের উদ্যোগ নেওয়া উচিত এবং চূড়ান্ত সমাধান ইয়েমেনিদের দ্বারাই নির্ধারিত হওয়া প্রয়োজন।
সূত্র: এপি
এমএস/