দেশ টেলিভিশন লিমিটেড, কর্ণফুলী মিডিয়া পয়েন্ট, ৪২, শহীদ সাংবাদিক সেলিনা পারভীন সড়ক, মালিবাগ, ঢাকা-১২১৭, বাংলাদেশ।
টেলিফোন: +৮৮ (০২) ৮৩৩২৯৫৮, ৮৩৩২৯২২ ফ্যাক্স: +৮৮ (০২) ৮৩৩২৯৮১ মেইল: [email protected]

যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের সর্বশেষ বৈঠকে জাঁকজমকপূর্ণ আয়োজন ও সৌজন্য বিনিময় থাকলেও বড় কোনো বাস্তব অগ্রগতি দেখা যায়নি। তবে চীনের জন্য আপাতত এটুকুই যথেষ্ট বলে মনে হচ্ছে।
চার মাস পর আবারও বৈঠকে বসেন ট্রাম্প ও শি। এক দশকেরও বেশি সময় পর প্রথমবারের মতো যুক্তরাষ্ট্রের রাজধানী ওয়াশিংটনে সফর করেন চীনা প্রেসিডেন্ট। বৈঠকে দুই নেতা বাণিজ্যিক যুদ্ধবিরতি বাড়ানোর বিষয়ে একমত হন, উপহার ও প্রশংসা বিনিময় করেন এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (এআই) উন্নয়ন থেকে তৈরি ঝুঁকি মোকাবিলায় সহযোগিতার সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা করেন।
বিশ্বের দুই বৃহত্তম অর্থনৈতিক ও ভূরাজনৈতিক শক্তির মধ্যে বাড়তে থাকা উত্তেজনা কমানোর লক্ষ্যে আয়োজিত ঐতিহাসিক এই সম্মেলন তুলনামূলকভাবে নির্বিঘ্নেই শেষ হয়েছে। তবে চীনা প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের বৃহত্তর লক্ষ্য বিবেচনায় বড় কোনো ঘোষণা না থাকলেও চীনের জন্য বৈঠকটি যথেষ্ট গুরুত্বপূর্ণ।
বৃহস্পতিবার হোয়াইট হাউসের রাষ্ট্রীয় নৈশভোজে শি জিনপিং সহযোগিতার গুরুত্ব তুলে ধরেন। তাঁর বক্তব্যে চীনের উত্থানকে যুক্তরাষ্ট্রের জন্য হুমকি নয়, বরং সম্ভাব্য সুবিধা হিসেবে উপস্থাপন করা হয়। তিনি বলেন, দুই দেশের জনগণের বন্ধুত্ব একটি গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ, যার সামনে বড় সম্ভাবনা রয়েছে। দুই দেশকে হাতে হাত রেখে পাশাপাশি এগিয়ে যাওয়ার আহ্বানও জানান তিনি।
মে মাসের বৈঠকের তুলনায় এবারের বৈঠকের একটি বড় পার্থক্য ছিল হোয়াইট হাউসে ট্রাম্পের কিছু সাংবাদিককে প্রবেশে বাধা দেওয়ার সিদ্ধান্ত এবং এর ফলে বৈঠকের দৃশ্যমান প্রচারে তৈরি হওয়া পরিস্থিতি। চীনের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমে সরকারের অনুমোদিত নিয়ন্ত্রিত প্রচারের বিপরীতে যুক্তরাষ্ট্রে এ নিয়ে বিতর্ক তৈরি হয়।
তবে দুই নেতার বক্তব্যের মূল সুরে বড় কোনো পরিবর্তন ছিল না। ট্রাম্পের মেক আমেরিকা গ্রেট এগেইন স্লোগানের সঙ্গে নিজের চীনা জাতির মহান পুনর্জাগরণ পরিকল্পনার তুলনা করেন শি। কয়েক দশকের এই কৌশলগত পরিকল্পনার লক্ষ্য বিশ্বমানের সামরিক, শিল্প ও প্রযুক্তিগত সক্ষমতা নিয়ে চীনকে বৈশ্বিক শক্তিতে পরিণত করা।
চীনের এই অগ্রগতির কারণে যুক্তরাষ্ট্র চীনা পণ্য আমদানি, বিনিয়োগ ও মার্কিন প্রযুক্তির ব্যবহার সীমিত করতে বিভিন্ন সুরক্ষামূলক ব্যবস্থা নিয়েছে। তবে বেইজিংয়ের দৃষ্টিতে এসব পদক্ষেপ চীনের অগ্রগতি বাধাগ্রস্ত করার চেষ্টা হলেও দেশটি রেকর্ড পরিমাণ রপ্তানি ধরে রেখেছে। পাশাপাশি এআই ও রোবোটিক্সে দ্রুত অগ্রগতি এবং যুক্তরাষ্ট্রের প্রয়োজনীয় বিরল খনিজসহ গুরুত্বপূর্ণ পণ্য ও উপকরণের ওপর শক্ত নিয়ন্ত্রণ বজায় রেখেছে চীন।
এসব কারণে ওয়াশিংটনে শির আগের সফরের তুলনায় এবার চীনের হাতে বেশি কূটনৈতিক ও অর্থনৈতিক প্রভাব রয়েছে। ফলে আপাতত বাস্তব অগ্রগতির চেয়ে প্রতীকী সৌজন্য ও সম্পর্ক স্থিতিশীল রাখার বিষয়টিই বেইজিংয়ের জন্য যথেষ্ট হতে পারে।
যুক্তরাষ্ট্র-চীন দ্বন্দ্ব বিশ্ব রাজনীতি ও বৈশ্বিক সরবরাহব্যবস্থায় বড় ধরনের প্রভাব ফেলেছে। তাই চলতি বছরের শুরুতে দুই দেশের সম্পর্ক কিছুটা স্থিতিশীল হওয়াকেই অনেক পর্যবেক্ষক ইতিবাচক অগ্রগতি হিসেবে দেখেছিলেন। তবে এবারের রাষ্ট্রীয় সফরটি মে মাসে ট্রাম্পের বেইজিং সফরের অনেকটা পুনরাবৃত্তিই ছিল। সেবারও জাঁকজমকপূর্ণ প্রতীকী আয়োজন থাকলেও বাস্তব পদক্ষেপ ছিল সীমিত।
এদিকে নভেম্বরে যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে ইরান যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হওয়া ও মূল্যস্ফীতি বাড়ার মতো বিষয় নিয়ে রাজনৈতিক চাপের মুখে রয়েছেন ট্রাম্প।
হোয়াইট হাউসের প্রেস পুল থেকে সিএনএন, এমএস নাও ও পলিটিকোর সাংবাদিকদের বাদ দেওয়ার পর বড় কয়েকটি টেলিভিশন নেটওয়ার্ক বৈঠকটি সরাসরি সম্প্রচার করেনি। পরে আদালত ওই নিষেধাজ্ঞা বাতিল করলেও ট্রাম্পের সিদ্ধান্তে বৈঠকটি কীভাবে উপস্থাপিত হবে, তা নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের কর্মকর্তাদের মধ্যে উদ্বেগ তৈরি হয়।
অন্যদিকে শির ওয়াশিংটন সফরে বড় কোনো ব্যবসায়ী প্রতিনিধিদল ছিল না। বেইজিং ফরেন স্টাডিজ ইউনিভার্সিটির আন্তর্জাতিক সম্পর্কবিষয়ক গবেষক কুই হংজিয়ান বলেন, ব্যবসায়ী প্রতিনিধিদের অনুপস্থিতি ইঙ্গিত করে যে যুক্তরাষ্ট্র-চীন সম্পর্ক ব্যবসা ও বাণিজ্যের ক্ষেত্রে এখনো উল্লেখযোগ্য অগ্রগতিতে পৌঁছায়নি।
চীনা পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা উ শিনবোও বলেন, যুক্তরাষ্ট্র-চীন সম্পর্কের বিষয়ে ট্রাম্পের দলের কিছু সদস্য মার্কিন প্রেসিডেন্টের তুলনায় কম ইতিবাচক অবস্থানে রয়েছেন।
তবে শি জিনপিং যুক্তরাষ্ট্রকে চীনা কোম্পানি ও ব্যবসার জন্য আরও উন্মুক্ত হওয়ার আহ্বান জানান। ট্রাম্পও তাঁর বক্তব্যে যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের মধ্যে দীর্ঘদিনের বাণিজ্য ও বন্ধুত্বের ইতিহাস তুলে ধরেন। তিনি বলেন, দুই দেশের রাজনৈতিক ব্যবস্থা ভিন্ন হলেও দুই দেশের জনগণের মধ্যকার সম্পর্ক টিকে আছে এবং দুই দেশের সম্পর্ক আগে কখনো এত ভালো ছিল না।
লালগালিচা সংবর্ধনা ও সৌজন্যমূলক বক্তব্যের আড়ালেও দুই দেশের মূল বিরোধগুলো বহাল রয়েছে।
শি জিনপিংয়ের অন্যতম প্রধান অগ্রাধিকার হলো তাইওয়ান ইস্যুতে যুক্তরাষ্ট্রের সমর্থন কমানো। বেইজিং তাইওয়ানকে নিজেদের ভূখণ্ডের অংশ মনে করে এবং দ্বীপটিকে চীনা কমিউনিস্ট পার্টির নিয়ন্ত্রণে নেওয়াকে শির চীনা জাতির পুনর্জাগরণ পরিকল্পনার গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে দেখে।
চীনের রাষ্ট্রীয় বার্তা সংস্থা সিনহুয়া জানিয়েছে, রুদ্ধদ্বার বৈঠকে শি ট্রাম্পকে তাইওয়ানের স্বাধীনতার বিরোধিতা করার আহ্বান জানিয়েছেন। তাইওয়ানের সার্বভৌমত্বের বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্র দীর্ঘদিন ধরে কৌশলগত অস্পষ্টতা বজায় রেখেছে। তবে তাইওয়ান রিলেশনস অ্যাক্টের আওতায় দ্বীপটির আত্মরক্ষার জন্য অস্ত্র বিক্রির বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রের বাধ্যবাধকতা রয়েছে।
তাইওয়ানের স্বাধীনতার প্রতি সমর্থন সামরিক সংঘাত ডেকে আনতে পারে বলে এর আগে সতর্ক করেছে চীন। তবে বৃহস্পতিবারের বৈঠক নিয়ে তাইওয়ান ইস্যুতে যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে কোনো আনুষ্ঠানিক বিবৃতি দেওয়া হয়নি।
এআই নিয়েও দুই দেশের মধ্যে মতপার্থক্য রয়েছে। শি জিনপিং যুক্তরাষ্ট্রকে চীনের সঙ্গে সমন্বয় করে এআইয়ের উন্নয়ন দায়িত্বশীলভাবে পরিচালনার আহ্বান জানান। নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যেতে সক্ষম উন্নত এআই মডেল নিয়ে উদ্বেগের কারণে বিশ্বজুড়ে এই প্রযুক্তির ওপর আরও নজরদারির দাবি উঠেছে।
যুক্তরাষ্ট্রের এআই খাতের শীর্ষ প্রতিষ্ঠান ওপেনএআই ও অ্যানথ্রপিকের নেতারা উন্নত মডেল তৈরির প্রতিযোগিতার গতি কমানোর প্রয়োজনীয়তার কথা বললেও ট্রাম্প এআই নিয়ে উদ্বেগকে চীনের জন্য সুবিধা তৈরি করে এমন একটি ভাঁওতাবাজি হিসেবে অভিহিত করেছেন।
যুক্তরাষ্ট্রের প্রযুক্তি রপ্তানি নিয়ন্ত্রণ সত্ত্বেও চীনা এআইয়ের দ্রুত অগ্রগতি মার্কিন কর্মকর্তাদের মধ্যে উদ্বেগ তৈরি করেছে। মার্কিন কর্মকর্তারা চীনা কোম্পানিগুলোর বিরুদ্ধে মার্কিন এআই মডেলের প্রযুক্তি নকল করার অভিযোগও তুলেছেন এবং নিষেধাজ্ঞার সম্ভাবনার কথা বলেছেন। অন্যদিকে চীন জানিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র চীনের এআই খাতের অগ্রগতি বাধাগ্রস্ত করার চেষ্টা করলে পাল্টা ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
তবে বৃহস্পতিবারের বৈঠকে শি জিনপিংয়ের বার্তা ছিল, পরিস্থিতি এতটা দূর গড়ানোর প্রয়োজন নেই। তাঁর ভাষায়, দুই দেশের শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান করা উচিত।
সূত্র: সিএনএন
এমএস/