দেশ টেলিভিশন লিমিটেড, কর্ণফুলী মিডিয়া পয়েন্ট, ৪২, শহীদ সাংবাদিক সেলিনা পারভীন সড়ক, মালিবাগ, ঢাকা-১২১৭, বাংলাদেশ।
টেলিফোন: +৮৮ (০২) ৮৩৩২৯৫৮, ৮৩৩২৯২২ ফ্যাক্স: +৮৮ (০২) ৮৩৩২৯৮১ মেইল: [email protected]

নিহত ইরানি স্কুলশিশু ও প্রয়াত সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনির ছবি তুলে ধরে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলার সমালোচনা করেছেন ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসউদ পেজেশকিয়ান। জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনে দেওয়া ভাষণে তিনি ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি, গাজা, মার্কিন নিষেধাজ্ঞা এবং দেশটির প্রতিরক্ষা নিয়েও বক্তব্য দেন।
২৩ সেপ্টেম্বর নিউইয়র্কে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের মঞ্চে উঠে ভাষণের শুরুতেই পেজেশকিয়ান ইরানের প্রয়াত সর্বোচ্চ নেতা খামেনির একটি ছবি তুলে ধরেন। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের ইরানবিরোধী হামলার প্রথম দিনে তেহরানে তার কম্পাউন্ডে বিমান হামলায় খামেনি নিহত হন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
এরপর পেজেশকিয়ান ইরানের মিনাব শহরের একটি স্কুলে হামলায় নিহত স্কুলছাত্রীদের ছবিও তুলে ধরেন। তিনি বলেন, ইরানিরা সন্ত্রাসবাদের শিকার হয়েছেন এবং ইরানের ওপর যুক্তরাষ্ট্রের ‘অবৈধ হামলার’ নিন্দা করেন।
পেজেশকিয়ান বলেন, ‘আমি এমন একটি ইরান থেকে এসেছি, যেখানে আমাদের সম্মানিত সর্বোচ্চ নেতাকে কোনো আইনি কাঠামো বা কারণ ছাড়াই হত্যা করা হয়েছে। আমি এমন একটি ইরান থেকে এসেছি, যেখানে সত্যিকার অর্থেই তারা একটি স্কুলে বোমা হামলা করেছে।’
‘ইরানকে আত্মসমর্পণে বাধ্য করা যাবে না’
যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলার প্রসঙ্গে পেজেশকিয়ান বলেন, সর্বাধুনিক প্রযুক্তি ও অত্যাধুনিক অস্ত্রে সজ্জিত দুই দেশের হামলার মুখে ইরান সর্বোচ্চ শক্তি দিয়ে নিজেদের রক্ষা করেছে।
তিনি বলেন, ‘আমাদের নিরপরাধ জনগণ কাপুরুষোচিত হামলা ও আগ্রাসনের লক্ষ্যবস্তু হয়েছে, যা আমাদের দেশের ওপর চাপিয়ে দেওয়া হয়েছিল। আমরা সর্বোচ্চ শক্তি দিয়ে নিজেদের রক্ষা করেছি।’
ইরান যুক্তরাষ্ট্রের হামলার জবাব দিয়েছে, তবে বেসামরিক জনগণকে লক্ষ্য করে হামলা চালায়নি বলেও দাবি করেন তিনি। তার অভিযোগ, যুক্তরাষ্ট্র ইরানের বিশ্ববিদ্যালয়, স্বাস্থ্যকেন্দ্র, স্কুল, হাসপাতাল ও অবকাঠামোতে হামলা চালিয়েছে, যা আন্তর্জাতিক আইনের পরিপন্থী।
পেজেশকিয়ান বলেন, ইরান গত ২০০ বছরে কাউকে আক্রমণ করেনি। তিনি বলেন, ইরান ক্ষমতা ব্যবহার করে আগ্রাসন চালাতে চায় না এবং অন্যদের অনিরাপত্তার ওপর নিজেদের নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যও তাদের নেই।
তিনি বলেন, ইরানের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা এমনভাবে গড়ে তোলা হয়েছে, যাতে কেউ মনে না করে যে ইরানের শহরগুলোতে বোমা হামলা চালানো হলে তার কোনো জবাব দেওয়া হবে না। দেশকে রক্ষার জন্য কারও অনুমতি বা অনুমোদনের প্রয়োজন নেই বলেও জানান তিনি।
‘পারমাণবিক অস্ত্র নয়, শান্তিপূর্ণ প্রযুক্তি’
ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে পেজেশকিয়ান বলেন, ইরানের প্রয়োজন শান্তিপূর্ণ পারমাণবিক শক্তি, পারমাণবিক বোমা নয়। শান্তিপূর্ণ পারমাণবিক প্রযুক্তিকে তিনি ইরানের স্বাভাবিক অগ্রগতির অংশ হিসেবে উল্লেখ করেন।
তিনি বলেন, ‘আমরা এটি স্পষ্টভাবে বলছি, কোনো পারমাণবিক অস্ত্র নয় এবং শান্তিপূর্ণ পারমাণবিক প্রযুক্তির ওপর কোনো সীমাবদ্ধতাও নয়।’
পেজেশকিয়ান আরও বলেন, পারমাণবিক প্রযুক্তি কয়েকটি দেশের একচেটিয়া অধিকারে থাকার বিষয়টি ইরান মেনে নেয় না।
ইরানের ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ কর্মসূচি শান্তিপূর্ণ উদ্দেশ্যে পরিচালিত বলে তেহরান দাবি করে। তবে পশ্চিমা দেশগুলো ও ইসরায়েল সন্দেহ করে, এই কর্মসূচির মাধ্যমে পারমাণবিক বোমা তৈরির সক্ষমতা অর্জনের চেষ্টা করছে ইরান।
ইসরায়েলের পারমাণবিক অস্ত্র নিয়ে প্রশ্ন
ইসরায়েলের হাতে পারমাণবিক অস্ত্র থাকার বিষয়টি উল্লেখ করে পেজেশকিয়ান বলেন, এ ক্ষেত্রে ‘স্পষ্ট দ্বিচারিতা’ রয়েছে। তার বক্তব্য, ইসরায়েল পরমাণু অস্ত্র বিস্তার রোধ চুক্তির স্বাক্ষরকারী নয়, অথচ ইরানে পরমাণু পরিদর্শক পাঠানোর দাবি করা হচ্ছে।
তিনি বলেন, ‘তারা (ইসরায়েলিরা) হত্যা করে, আর আমাদের ওপর নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয়, আমাদের শাস্তি দেওয়া হয়।’
ইসরায়েলের বিরুদ্ধে গাজায় ৭০ হাজারের বেশি নিরপরাধ মানুষ হত্যার অভিযোগ তুলে পেজেশকিয়ান বলেন, ইরান আলোচনার টেবিলে থাকা অবস্থায়ও বোমা হামলার শিকার হয়েছে। তিনি ইসরায়েলকে ‘সত্যিকারের সন্ত্রাসীর মতো’ আচরণ করার অভিযোগও করেন।
ফিলিস্তিন ও গাজা প্রসঙ্গে বক্তব্য
পেজেশকিয়ান বলেন, ফিলিস্তিনকে উপেক্ষা করে শান্তির কথা বলা যায় না। তার ভাষায়, ফিলিস্তিন আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের বিবেকের ওপর ‘একটি খোলা ক্ষত’ এবং গাজা বেসামরিক মানুষের দুর্ভোগ ঠেকাতে আন্তর্জাতিক ব্যবস্থার ব্যর্থতার প্রতীক।
তিনি বলেন, বিশ্বে যতদিন দখলদারত্ব, আগ্রাসন ও অবিচার থাকবে, ততদিন ‘প্রতিরোধ’ চলবে। গাজায় ব্যাপক প্রাণহানি ও ধ্বংসযজ্ঞের মধ্যেও মানুষের মধ্যে প্রতিরোধের ওপর বিশ্বাস আরও শক্তিশালী হয়েছে বলে মন্তব্য করেন তিনি।
পেজেশকিয়ান বলেন, কোনো মানুষকে তার ভূমি থেকে উচ্ছেদ করা হলে সে প্রতিরোধ করবে। তার ঘরবাড়িতে বোমা হামলা, আগ্রাসন ও হামলা চালানো হলে সে প্রতিরোধ করবে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
নিষেধাজ্ঞায় সাধারণ মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত
ইরানের ওপর যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞার সমালোচনা করে পেজেশকিয়ান বলেন, এসব নিষেধাজ্ঞায় দরিদ্র ও সুবিধাবঞ্চিত সাধারণ মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন।
তিনি বলেন, অসুস্থ, নিরপরাধ, দরিদ্র এবং সমাজের সবচেয়ে সুবিধাবঞ্চিত মানুষই এসব নিষেধাজ্ঞার লক্ষ্যবস্তু। যুক্তরাষ্ট্র নিজেদের ‘অবৈধ লক্ষ্য’ অর্জনের জন্য একটি দেশের জনগণকে বলি দিতে চায় বলেও অভিযোগ করেন তিনি।
‘কখনো মাথা নত করব না’
ভাষণের শেষ পর্যায়ে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে উদ্দেশ করে পেজেশকিয়ান বলেন, নিষেধাজ্ঞা, চাপ ও হুমকি বাড়লেও ইরানি জনগণের প্রতিরোধ আরও বাড়বে।
তিনি বলেন, ‘তাকে অবশ্যই জানতে হবে, নিষেধাজ্ঞা, বাড়তি চাপ ও বাড়তি হুমকির মুখে ইরানি জনগণের প্রতিরোধ শুধু বাড়তেই থাকবে।’
এরপর তিনি বলেন, ‘আমরা কখনো মাথা নত করব না কিংবা হাঁটু গেড়ে বসব না।’
পেজেশকিয়ান বলেন, ইরান সংলাপ ও আলোচনার জন্য উন্মুক্ত। তবে ‘শক্তির ভাষা’ গ্রহণ করবে না।
সূত্র: আল-জাজিরা
/অ