দেশ টেলিভিশন লিমিটেড, কর্ণফুলী মিডিয়া পয়েন্ট, ৪২, শহীদ সাংবাদিক সেলিনা পারভীন সড়ক, মালিবাগ, ঢাকা-১২১৭, বাংলাদেশ।
টেলিফোন: +৮৮ (০২) ৮৩৩২৯৫৮, ৮৩৩২৯২২ ফ্যাক্স: +৮৮ (০২) ৮৩৩২৯৮১ মেইল: [email protected]

জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনে দেওয়া ভাষণে ইরান, গাজা, ইউক্রেন, ভেনেজুয়েলা, কিউবা, গ্রিনল্যান্ড, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও জাতিসংঘের কার্যক্রম নিয়ে বক্তব্য দিয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। ইরানকে পারমাণবিক অস্ত্র অর্জন করতে না দেওয়ার কথা পুনর্ব্যক্ত করার পাশাপাশি দেশটির ওপর অর্থনৈতিক চাপ বাড়াতে বিশ্বের দেশগুলোর প্রতি আহ্বান জানান তিনি।
ট্রাম্পের ইরানবিষয়ক বক্তব্যের সময় জাতিসংঘ অধিবেশনকক্ষ থেকে ইরানি প্রতিনিধিদলের সদস্যরা বেরিয়ে যান। ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসউদ পেজেশকিয়ান ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি নিউইয়র্কে থাকলেও ট্রাম্পের বক্তব্যের সময় তাদের ইরানি প্রতিনিধিদলের আসনে দেখা যায়নি।
ইরান প্রসঙ্গে ট্রাম্প বলেন, দেশটিকে দীর্ঘদিন শক্তি সঞ্চয়ের সুযোগ দেওয়া হয়েছিল এবং যুক্তরাষ্ট্র এখন তাদের ‘সন্ত্রাস ছড়ানো’ ঠেকাতে পদক্ষেপ নিয়েছে। ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে তিনি বলেন, যুক্তরাষ্ট্র দেশটির ‘পারমাণবিক বোমার দিকে দৌড়’ থামিয়েছে বলে দাবি করেন।
ট্রাম্প আরও বলেন, তিনি ইরানকে পারমাণবিক অস্ত্র অর্জন করতে দেবেন না। ইরানের সঙ্গে আলোচনার প্রসঙ্গে তিনি দাবি করেন, দায়িত্ব নেওয়ার পরপরই দেশটিকে পারমাণবিক কর্মসূচি ও ‘সন্ত্রাসে সমর্থন’ বন্ধের বিনিময়ে পূর্ণ অর্থনৈতিক সহযোগিতার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছিল। তবে ইরান সেই প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেছে বলে দাবি করেন তিনি।
ইরানকে অর্থনৈতিকভাবে পুরোপুরি বিচ্ছিন্ন করতে বিশ্বের সব দেশকে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে যোগ দেওয়ার আহ্বানও জানান ট্রাম্প। বাণিজ্যিক জাহাজে হামলা বন্ধ, পারমাণবিক উচ্চাকাঙ্ক্ষা পরিত্যাগ এবং ‘সন্ত্রাসে সমর্থন’ বন্ধ না করা পর্যন্ত ইরানকে বিচ্ছিন্ন রাখার আহ্বান জানান তিনি। একই সঙ্গে তিনি দাবি করেন, চলমান সংঘাতের মধ্যে মার্কিন সামরিক বাহিনী হরমুজ প্রণালি দিয়ে এক বিলিয়ন ব্যারেলের বেশি তেল পরিবহনে সহায়তা করেছে।
ইরানের সঙ্গে সমঝোতার সম্ভাবনা নিয়েও কথা বলেন ট্রাম্প। তিনি বলেন, ইরানকে নিয়ে একটি চুক্তি হতে পারে এবং তা যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনের পর হতে পারে বলে তিনি মনে করেন। একই সঙ্গে ইরানকে নিয়ে আরও কঠোর সামরিক পদক্ষেপের সম্ভাবনার কথাও বক্তব্যে তুলে ধরেন তিনি।
গাজা যুদ্ধের প্রসঙ্গে ট্রাম্প দাবি করেন, জাতিসংঘে তার আগের বক্তব্যের সময় যুদ্ধ চলছিল এবং হামাসের হাতে জিম্মিরা আটক ছিলেন। তার দাবি, পরে গাজায় যুদ্ধের অবসান ঘটানো হয়েছে এবং এতে বহু মানুষের প্রাণ রক্ষা পেয়েছে। তিনি আরও দাবি করেন, সব অবশিষ্ট জিম্মিকে ‘জীবিত ও মৃত’ অবস্থায় ফিরিয়ে আনা হয়েছে। এ বক্তব্যের সময় অধিবেশনকক্ষে করতালি দেওয়া হয়।
ইউক্রেন যুদ্ধ নিয়েও বক্তব্য দেন ট্রাম্প। তিনি বলেন, রাশিয়া ও ইউক্রেনের নেতাদের সঙ্গে তার প্রশাসন কাজ করছে এবং যুদ্ধের সমাধান মানুষের ধারণার চেয়েও দ্রুত হতে পারে বলে তিনি মনে করেন।
ভেনেজুয়েলার সঙ্গে তেল চুক্তির প্রসঙ্গে ট্রাম্প দাবি করেন, দুই দেশ ৬৫ বিলিয়ন ব্যারেল তেলকে কেন্দ্র করে ইতিহাসের সবচেয়ে বড় তেল চুক্তি করেছে। তার ভাষ্য, এতে দুই দেশই লাভবান হবে এবং বিশ্বজুড়ে জ্বালানির দাম কমাতে সহায়তা করবে। বিশ্বের বড় তেল কোম্পানিগুলো ভেনেজুয়েলায় যাচ্ছে বলেও দাবি করেন তিনি।
কিউবার প্রসঙ্গে ট্রাম্প দেশটির সরকারকে ‘কমিউনিস্ট শাসনব্যবস্থা’ হিসেবে উল্লেখ করে বলেন, দেশটি ব্যর্থতার দিকে যাচ্ছে এবং ‘পতন হবে’। তার এই বক্তব্যের সময় কিউবার প্রতিনিধিদল অধিবেশনকক্ষ থেকে বেরিয়ে যায়।
গ্রিনল্যান্ড প্রসঙ্গে ট্রাম্প বলেন, যুক্তরাষ্ট্র ডেনমার্ক ও গ্রিনল্যান্ডের সঙ্গে একটি ‘অভূতপূর্ব চুক্তি’ করেছে। তার দাবি, এর মাধ্যমে গ্রিনল্যান্ডে দুটি বড় সামরিক ঘাঁটি নির্মাণ করে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক উপস্থিতি বাড়ানোর সুযোগ তৈরি হবে। তিনি বলেন, এতে আমেরিকা ও ইউরোপের নিরাপত্তা এবং ন্যাটো জোট আরও শক্তিশালী হবে।
আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালত বা আইসিসিরও সমালোচনা করেন ট্রাম্প। তিনি প্রতিষ্ঠানটিকে ‘নিয়ন্ত্রণহীন’ ও ‘দুর্বৃত্ত’ প্রতিষ্ঠান হিসেবে উল্লেখ করে যুক্তরাষ্ট্রের কোনো সামরিক সদস্যকে সেখানে তদন্ত বা বিচারের মুখোমুখি করার বিরোধিতা করেন। আইসিসির সদস্য দেশগুলোকে প্রতিষ্ঠানটি থেকে বেরিয়ে যাওয়ার আহ্বানও জানান।
জাতিসংঘের বাজেট নিয়েও নিজের সরকারের পদক্ষেপের কথা তুলে ধরেন ট্রাম্প। তিনি দাবি করেন, ২০২৬ সালে যুক্তরাষ্ট্র জাতিসংঘের বাজেট ১৫ শতাংশ কমাতে সহায়তা করেছে এবং এতে ৪ হাজারের বেশি পদ বিলুপ্ত হয়েছে। আন্তর্জাতিক করের বিরোধিতা করে তিনি বলেন, কোনো বৈশ্বিক সরকার নেই এবং তার প্রেসিডেন্ট থাকাকালে কোনো বৈশ্বিক কর থাকবে না।
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা নিয়েও নিজের অবস্থান তুলে ধরেন ট্রাম্প। তিনি এআই নিয়ন্ত্রণের জন্য কোনো ‘বৈশ্বিকতাবাদী পরিকল্পনা’ যুক্তরাষ্ট্র প্রত্যাখ্যান করছে বলে জানান। তিনি ‘আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স’-এর পরিবর্তে ‘সুপার ইন্টেলিজেন্স’ শব্দটি ব্যবহারের কথা বলেন এবং যুক্তরাষ্ট্র এই প্রযুক্তিতে বিশ্বের নেতৃত্ব দিচ্ছে বলে দাবি করেন।
ভাষণের শেষ দিকে ট্রাম্প বিশ্বের দেশগুলোকে তিনি যাদের ‘মানবতার শত্রু’ বলেছেন, তাদের বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ হওয়ার আহ্বান জানান। তিনি বলেন, ভয় ও সংশয়ের কাছে নতি স্বীকার না করে দায়িত্ব পালনে সাহসী পদক্ষেপ নিলে বিশ্বকে আরও নিরাপদ ও উন্নত করা সম্ভব।
সূত্র: আল-জাজিরা
/অ