দেশ টেলিভিশন লিমিটেড, কর্ণফুলী মিডিয়া পয়েন্ট, ৪২, শহীদ সাংবাদিক সেলিনা পারভীন সড়ক, মালিবাগ, ঢাকা-১২১৭, বাংলাদেশ।
টেলিফোন: +৮৮ (০২) ৮৩৩২৯৫৮, ৮৩৩২৯২২ ফ্যাক্স: +৮৮ (০২) ৮৩৩২৯৮১ মেইল: [email protected]

ইয়েমেনে কৌশলগত উচ্চভূমি দখলের তৎপরতা জোরদার করেছে হুতিরা। সৌদি আরবের মিত্র বাহিনীর নিয়ন্ত্রণে থাকা এলাকাগুলো থেকে লোহিত সাগরের উপকূলকে বিচ্ছিন্ন করতে সোমবার এসব উচ্চভূমির দিকে অগ্রসর হয়েছে ইরান-সমর্থিত গোষ্ঠীটি। এর মধ্যেই যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প শেষ মুহূর্তে হুতিদের বিরুদ্ধে বিমান হামলার পরিকল্পনা বাতিল করেছেন বলে খবর প্রকাশিত হয়েছে।
নিউইয়র্ক টাইমসের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমানের নতুন করে সামরিক সহায়তার অনুরোধের পর রোববার হুতিদের বিরুদ্ধে বিমান হামলার প্রস্তুতি নিয়েছিল ট্রাম্প প্রশাসন। তবে হামলা শুরুর ঠিক আগে ট্রাম্প তা বাতিল করেন। সে সময় বিমানগুলোতে বোমা তোলার কাজ চলছিল বলেও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। রয়টার্স অবশ্য তাৎক্ষণিকভাবে এ তথ্য যাচাই করতে পারেনি।
রোববার ইয়েমেনের সৌদি-সমর্থিত ও আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত সরকারের প্রেসিডেন্ট রশাদ আল-আলিমির সঙ্গে ফোনে কথা বলেন ট্রাম্প। রয়টার্সকে চারটি সূত্র জানায়, আল-আলিমি যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক সহায়তা চেয়েছিলেন। তবে ইয়েমেনি ও পশ্চিমা একটি সূত্রসহ দুজনের দাবি, ফোনালাপে ট্রাম্প সরাসরি সামরিক সহায়তার কোনো প্রতিশ্রুতি দেননি।
চলতি মাসে হুতিদের আকস্মিক অগ্রযাত্রায় ইয়েমেনের সংঘাত মধ্যপ্রাচ্যের চলমান যুদ্ধের নতুন একটি মঞ্চে পরিণত হয়েছে। এতে বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহও নতুন করে ঝুঁকির মুখে পড়েছে। হুতিরা ২০১৪ সাল থেকে ইয়েমেনের রাজধানী সানার নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। চলতি মাসে তারা সৌদি-সমর্থিত সরকারি বাহিনীকে হটিয়ে লোহিত সাগরের উপকূলের একটি বড় অংশ দখলে নেয়।
হুতিদের দাবি, সাম্প্রতিক দিনগুলোতে সৌদি আরব তাদের উচ্চভূমির অবস্থান লক্ষ্য করে শত শত হামলা চালিয়েছে। জাতিসংঘের হিসাবে, নতুন করে সংঘাত ছড়িয়ে পড়ার পর প্রায় ৭০০ মানুষ নিহত এবং হাজারো মানুষ আহত হয়েছেন। দেশের ভেতরেই প্রায় ১ লাখ ৩০ হাজার মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছেন। এ ছাড়া ৩ হাজারের বেশি ইয়েমেনি নৌপথে লোহিত সাগর পাড়ি দিয়ে আফ্রিকায় পালিয়েছেন।
রয়টার্সকে ইয়েমেনের পাঁচ সামরিক সূত্র জানিয়েছে, হুতিরা এখন তাইজ ও লাহিজ প্রদেশের কাহবুব পর্বতমালা নামে পরিচিত কৌশলগত উচ্চভূমি দখলের চেষ্টা করছে। এই উচ্চভূমিগুলো লোহিত সাগরের উপকূলকে দক্ষিণাঞ্চলে সরকারি বাহিনীর নিয়ন্ত্রণাধীন এলাকা থেকে আলাদা করেছে।
তাইজ প্রদেশের দুর্গম আল-ওয়াজিয়াহ জেলার উপকণ্ঠ এবং লোহিত সাগরের মুখ ও এডেনের মধ্যবর্তী ভারত মহাসাগরীয় উপকূলের রাস আল-আরা এলাকায় লড়াই চলছে। গত সপ্তাহে হুতিরা লোহিত সাগরের মুখের একটি এলাকা দখল করার পর থেকে সেখানে সংঘাত আরও তীব্র হয়েছে।
সূত্রগুলোর মতে, বাব আল-মান্দাব প্রণালির আশপাশে নিজেদের বাহিনীর পেছনের অংশ সুরক্ষিত করতেই এসব উচ্চভূমি দখল করতে চায় হুতিরা। এতে তারা নতুন ফ্রন্ট খুলতে পারবে এবং সম্প্রতি দখল করা অবস্থানগুলোও আরও সুরক্ষিত করতে পারবে।
সৌদি আরব ও হুতিদের মধ্যে সংঘাত বেড়ে যাওয়ায় নতুন সংকটে পড়েছে ট্রাম্প প্রশাসন। একদিকে সৌদি মিত্রদের সুরক্ষায় যুক্তরাষ্ট্রের ওপর চাপ বাড়ছে, অন্যদিকে ইরানের বিরুদ্ধে ফেব্রুয়ারিতে শুরু করা যুদ্ধ আরও বিস্তৃত করতে চায় না ওয়াশিংটন।
২০২৫ সালের শুরুতে দুই মাস হুতিদের ওপর বিমান হামলা চালিয়েছিল যুক্তরাষ্ট্র। পরে গোষ্ঠীটির সঙ্গে যুদ্ধবিরতিতে পৌঁছানোর পর ট্রাম্প হামলা বন্ধ করেন। এরপর থেকে ইয়েমেনের সংঘাতে সরাসরি যুক্ত হয়নি যুক্তরাষ্ট্র।
হুতিদের বাব আল-মান্দাব প্রণালির নিয়ন্ত্রণ সৌদি আরবের তেল রপ্তানির ওপরও প্রভাব ফেলছে। হরমুজ প্রণালির ঝুঁকি এড়িয়ে তেল রপ্তানির জন্য সৌদি আরব যে বিকল্প সমুদ্রপথ ব্যবহার করত, বাব আল-মান্দাবের নিয়ন্ত্রণ হারালে সেটিও বাধাগ্রস্ত হতে পারে।
এর জেরে সৌদি আরব হরমুজ প্রণালি দিয়ে তেল পরিবহন বাড়িয়েছে। স্যাটেলাইট তথ্য অনুযায়ী, সাম্প্রতিক দিনগুলোতে হরমুজ দিয়ে সৌদি তেল রপ্তানি বেড়ে দিনে ২৯ লাখ ব্যারেলে দাঁড়িয়েছে, যা আগস্টে ছিল প্রায় ৭ লাখ ব্যারেল। একই সময়ে লোহিত সাগর দিয়ে সৌদি তেল পরিবহন বন্ধ রয়েছে।
বিশ্ববাজারে অপরিশোধিত তেলের দামও এর প্রভাব অনুভব করছে। গত সপ্তাহে ব্যারেলপ্রতি প্রায় ১১০ ডলারে ওঠার পর দাম আবার ১০০ ডলারের কাছাকাছি নেমেছে। তবে পরিশোধিত জ্বালানির দাম এখনো উচ্চ পর্যায়ে রয়েছে। সোমবার যুক্তরাষ্ট্রে ডিজেলের খুচরা দাম গ্যালনপ্রতি ৬ ডলার ৫১ সেন্ট ছাড়িয়ে নতুন রেকর্ড করেছে। যুদ্ধ শুরুর আগে এ দাম ছিল প্রায় ৩ ডলার ৭৫ সেন্ট।
এদিকে হরমুজ প্রণালিতে সর্বশেষ হামলার ঘটনায় ব্রিটিশ সামুদ্রিক নিরাপত্তা সংস্থা ইউকেএমটিও জানিয়েছে, প্রণালিতে প্রবেশের সময় একটি জাহাজে প্রজেক্টাইল আঘাত হানে। এতে কয়েকজন নাবিক সামান্য আহত হন।
বৃহত্তর মধ্যপ্রাচ্য সংঘাত নিয়ে কূটনৈতিক প্রচেষ্টাও কার্যত স্থবির হয়ে আছে। জুনে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে একটি অন্তর্বর্তী সমঝোতা হলেও কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই তা ভেস্তে যায়। এর মধ্যে ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসউদ পেজেশকিয়ান মঙ্গলবার জাতিসংঘের সাধারণ অধিবেশনে যোগ দিতে নিউইয়র্কে যাওয়ার কথা রয়েছে। ফেব্রুয়ারিতে ট্রাম্প ইসরায়েলের সঙ্গে মিলে ইরানের বিরুদ্ধে ‘অপারেশন এপিক ফিউরি’ শুরু করার পর এটিই হবে তার প্রথম যুক্তরাষ্ট্র সফর।
সূত্র: রয়টার্স
এমএস/