দেশ টেলিভিশন লিমিটেড, কর্ণফুলী মিডিয়া পয়েন্ট, ৪২, শহীদ সাংবাদিক সেলিনা পারভীন সড়ক, মালিবাগ, ঢাকা-১২১৭, বাংলাদেশ।
টেলিফোন: +৮৮ (০২) ৮৩৩২৯৫৮, ৮৩৩২৯২২ ফ্যাক্স: +৮৮ (০২) ৮৩৩২৯৮১ মেইল: [email protected]

শরীরের কোনো অস্বস্তি, শিশুর হঠাৎ ব্যথা বা কোনো উপসর্গের কারণ বুঝতে না পারলে এখন অনেকেই চিকিৎসকের পাশাপাশি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (এআই) সাহায্য নিচ্ছেন। তবে স্বাস্থ্যসংক্রান্ত ব্যক্তিগত তথ্য এআই ব্যবস্থায় জমা দেওয়ার আগে গোপনীয়তা, নির্ভুলতা ও নিরাপত্তার বিষয়গুলো জানা জরুরি বলে সতর্ক করছেন বিশেষজ্ঞরা।
স্বাস্থ্যনীতি বিষয়ক সংস্থা কেএফএফের মার্চ মাসের এক জরিপ অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্রের প্রতি তিনজন প্রাপ্তবয়স্কের একজন স্বাস্থ্যসংক্রান্ত বিষয়ে এআইয়ের পরামর্শ নিয়েছেন। যুক্তরাষ্ট্রে সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত এআই ব্যবস্থা চ্যাটজিপিটি ব্যবহার করেন দেশটির ৪৪ শতাংশ প্রাপ্তবয়স্ক। নির্মাতা প্রতিষ্ঠান ওপেনএআই জানিয়েছে, বিশ্বজুড়ে প্রতি সপ্তাহে ৩০ কোটির বেশি মানুষ স্বাস্থ্যসংক্রান্ত প্রশ্নের উত্তর জানতে এই প্রযুক্তি ব্যবহার করেন।
বর্তমানে বিভিন্ন এআই প্রতিষ্ঠান ব্যবহারকারীদের চিকিৎসা নথি, পরীক্ষার ফলাফল, চিকিৎসকের মন্তব্য, দৈনন্দিন হাঁটার পরিমাণ, খাবারের তথ্য এবং ঘুমের হিসাবসহ বিভিন্ন স্বাস্থ্য তথ্য জমা দেওয়ার সুযোগ দিচ্ছে। এসব তথ্য বিশ্লেষণ করে এআই স্বাস্থ্যসংক্রান্ত ব্যাখ্যা ও পরামর্শ দেওয়ার চেষ্টা করে।
সম্প্রতি ওপেনএআই জানিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রের ব্যবহারকারীরা আরও ব্যাপকভাবে নিজেদের চিকিৎসা নথি আপলোড করে চ্যাটজিপিটির মাধ্যমে স্বাস্থ্য পরিস্থিতি বুঝতে, পরিবর্তন পর্যবেক্ষণ করতে এবং চিকিৎসকের সঙ্গে আরও তথ্যভিত্তিক আলোচনা করতে পারবেন। এমনকি নির্দিষ্ট স্বাস্থ্য সমস্যার জন্য খাবারের তালিকাও তৈরি করে দিতে পারে এআই।
তবে কেএফএফের জরিপে অংশ নেওয়া অধিকাংশ মানুষ স্বাস্থ্য তথ্য এআই প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে শেয়ার করার ক্ষেত্রে গোপনীয়তা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। স্বাস্থ্যসংক্রান্ত প্রশ্ন করা ব্যক্তিদের মধ্যে ৪১ শতাংশ জানিয়েছেন, তারা নিজেদের চিকিৎসা তথ্য এআইয়ে জমা দিয়েছেন।
বিশেষজ্ঞদের একাংশ মনে করেন, ব্যক্তিগত সিদ্ধান্ত হিসেবে কেউ চাইলে স্বাস্থ্য তথ্য এআইয়ে দিতে পারেন এবং প্রতিষ্ঠানগুলোর গোপনীয়তা রক্ষার প্রতিশ্রুতির ওপর আস্থা রাখা যায়। তবে অন্য অনেক বিশেষজ্ঞ এ বিষয়ে সতর্ক থাকার পরামর্শ দিয়েছেন।
এআই চিকিৎসাবিষয়ক পরীক্ষায় সফলতা দেখিয়েছে এবং ওপেনএআই জানিয়েছে, চ্যাটজিপিটির সর্বশেষ সংস্করণ শত শত চিকিৎসকের মূল্যায়নের মধ্য দিয়ে গেছে। প্রতিষ্ঠানটির দাবি, নতুন মডেলগুলো এখন মানুষের চিকিৎসকদের সমপর্যায়ের বা তার চেয়েও ভালো বিশ্লেষণ করতে সক্ষম।
তবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এআই এখনো ভুলের ঊর্ধ্বে নয়। এর পরামর্শে জাতি ও লিঙ্গভিত্তিক পক্ষপাত থাকতে পারে। ব্যবহারকারীকে সন্তুষ্ট করার প্রবণতার কারণে এটি অনেক সময় আত্মবিশ্বাসী ভাষায় ভুল তথ্যও দিতে পারে। এমনকি গুরুতর জরুরি অবস্থায় প্রয়োজনীয় চিকিৎসা নেওয়ার পরিবর্তে বাড়িতে থাকার পরামর্শ দেওয়ার মতো ঝুঁকিও রয়েছে।
স্বাস্থ্য তথ্যের গোপনীয়তা নিয়ে উদ্বেগ
হাসপাতাল ও চিকিৎসকদের ব্যক্তিগত রোগীর তথ্য সুরক্ষার জন্য নৈতিক নীতি ও কঠোর নিয়ম মেনে চলতে হয়। তবে এআই প্রতিষ্ঠানগুলো একই ধরনের কঠোর ফেডারেল নিয়মের আওতায় পড়ে না। যুক্তরাষ্ট্রে স্বাস্থ্য তথ্যের জন্য এখনো কোনো পূর্ণাঙ্গ ফেডারেল গোপনীয়তা আইন নেই।
অ্যানথ্রপিক, মাইক্রোসফট, পারপ্লেক্সিটি ও ওপেনএআই দাবি করেছে, তারা স্বাস্থ্য তথ্যের নিরাপত্তা নিশ্চিত করে। প্রতিষ্ঠানগুলো জানিয়েছে, তথ্য আদান-প্রদান এনক্রিপ্ট করা থাকে এবং ব্যবহারকারীর স্বাস্থ্য তথ্য তাদের এআই মডেল প্রশিক্ষণে বা বিজ্ঞাপন দেখানোর কাজে ব্যবহার করা হয় না।
তবে চিকিৎসা নৈতিকতা বিশেষজ্ঞ আর্ট ক্যাপলান মনে করেন, আরও স্পষ্ট আইনি সুরক্ষা ছাড়া ব্যক্তিগত স্বাস্থ্য তথ্য বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের হাতে তুলে দেওয়া ঝুঁকিপূর্ণ।
তিনি উদাহরণ হিসেবে ২০২৩ সালে জেনেটিক পরীক্ষাকারী প্রতিষ্ঠান ‘২৩অ্যান্ডমি’-এর তথ্য ফাঁসের ঘটনা উল্লেখ করেন। ওই ঘটনায় প্রায় ৭০ লাখ গ্রাহকের ব্যক্তিগত, জেনেটিক ও স্বাস্থ্য তথ্য প্রকাশ হয়ে যায়।
ক্যাপলান বলেন, স্বাস্থ্য ও ব্যক্তিগত তথ্য ব্যবস্থাপনার জন্য প্রয়োজনীয় আইনি ও নৈতিক কাঠামো এখনো পুরোপুরি তৈরি হয়নি।
মাউন্ট সিনাইয়ের চিকিৎসক গিরিশ নাদকর্নি পরামর্শ দিয়েছেন, এআইয়ের ক্ষেত্রে ব্যবহারকারীদের ‘যাচাই করে তারপর বিশ্বাস’ করার নীতি অনুসরণ করা উচিত।
এআইয়ের পরামর্শ কতটা নির্ভরযোগ্য?
বিশেষজ্ঞদের অন্যতম বড় উদ্বেগ হলো, এআইয়ের উত্তর অনেক সময় বিশ্বাসযোগ্য শোনালেও তা ভুল হতে পারে। এআই ব্যবস্থাগুলো এখনো ভুল তথ্য তৈরি করতে পারে।
২০২৩ সালে জার্নাল অব আমেরিকান মেডিকেল অ্যাসোসিয়েশনের একটি গবেষণায় দেখা যায়, পুরোনো সংস্করণের চ্যাটজিপিটি ক্যানসার চিকিৎসাসংক্রান্ত এক-তৃতীয়াংশের বেশি প্রশ্নে অনুপযুক্ত পরামর্শ দিয়েছিল।
আরেকটি গবেষণায় দেখা যায়, হাঁপানি ও ডায়াবেটিসজনিত গুরুতর জটিলতার মতো পরিস্থিতিতে এআই কখনো কখনো ঝুঁকি কমিয়ে দেখিয়েছে এবং জরুরি বিভাগে যাওয়ার পরামর্শ দেয়নি, যেখানে চিকিৎসকরা তা প্রয়োজনীয় মনে করতেন।
তবে ওপেনএআই জানিয়েছে, এসব গবেষণা বাস্তবে চ্যাটজিপিটির ব্যবহার পদ্ধতির পুরো চিত্র তুলে ধরে না এবং নিরাপত্তা ও নির্ভরযোগ্যতা বাড়াতে তারা কাজ করছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, স্বাস্থ্যসংক্রান্ত বিষয়ে এআই ব্যবহার করা গেলেও চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে চিকিৎসকের পরামর্শই গুরুত্বপূর্ণ।
এআই ব্যবহারে বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ
স্বাস্থ্য তথ্য এআইয়ে দেওয়ার ক্ষেত্রে কয়েকটি বিষয়ে সতর্ক থাকার পরামর্শ দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা।
তাদের মতে—
-প্রয়োজন অনুযায়ী কতদিন তথ্য সংরক্ষণ করা হবে, সে বিষয়ে সতর্ক থাকতে হবে।
-প্রশ্ন করার সময় আবেগপূর্ণ ভাষা এড়িয়ে স্পষ্ট তথ্যভিত্তিক প্রশ্ন করতে হবে।
-একই বিষয়ে বারবার নতুন আলোচনা শুরু করে এআইয়ের উত্তর যাচাই করা যেতে পারে।
-এআইকে প্রমাণ বা সূত্র দিতে বলতে হবে এবং তার উত্তর নিয়ে প্রশ্ন তুলতে হবে।
-গুরুতর শারীরিক সমস্যা হলে এআইয়ের ওপর নির্ভর না করে সরাসরি চিকিৎসকের কাছে যেতে হবে।
চিকিৎসক অ্যাশউইন রামাস্বামী বলেন, সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো নিজের শরীরের সংকেত ও সাধারণ বুদ্ধির ওপর আস্থা রাখা। যদি কেউ এআইকে প্রশ্ন করার আগেই জরুরি বিভাগে যাওয়ার কথা ভাবেন, তাহলে এআইয়ের সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভর না করে সরাসরি চিকিৎসা নেওয়া উচিত।
/অ