দেশ টেলিভিশন লিমিটেড, কর্ণফুলী মিডিয়া পয়েন্ট, ৪২, শহীদ সাংবাদিক সেলিনা পারভীন সড়ক, মালিবাগ, ঢাকা-১২১৭, বাংলাদেশ।
টেলিফোন: +৮৮ (০২) ৮৩৩২৯৫৮, ৮৩৩২৯২২ ফ্যাক্স: +৮৮ (০২) ৮৩৩২৯৮১ মেইল: [email protected]

একসময় অবিভক্ত ভারতের চলচ্চিত্রজগতে তার কণ্ঠ ও অভিনয়ে মুগ্ধ হয়েছিল দর্শক। দেশভাগের পর যখন অনেকেই নতুন বাস্তবতায় থমকে গিয়েছিলেন, তখন তিনি বেছে নিয়েছিলেন আরেক কঠিন পথ। মুম্বাইয়ের প্রতিষ্ঠিত তারকার জীবন পেছনে ফেলে পাড়ি জমিয়েছিলেন পাকিস্তানে। সেখানেই শূন্য থেকে গড়ে তোলার কাজে যুক্ত হন দেশটির চলচ্চিত্রশিল্পে। তিনি নূরজাহান, যাকে ভারতে প্রায়ই ‘পাকিস্তানের লতা মঙ্গেশকর’ বলা হয়। আর পাকিস্তানে ভক্তদের কাছে তিনি ছিলেন ‘মালিকা-ই-তারান্নুম’, অর্থাৎ সুরের রানি।
বর্তমান প্রজন্মের কাছে ‘সানু নেহর ওয়ালে পুল’ কিংবা ফয়েজ আহমেদ ফয়েজের লেখা ‘মুঝসে পেহলি সি মহব্বত’ গানের কণ্ঠ হিসেবে নূরজাহান পরিচিত। তবে তার পরিচয় শুধু গায়িকা হিসেবে সীমাবদ্ধ ছিল না। অভিনয়, গান, চলচ্চিত্র পরিচালনা, ব্যবসা এবং সন্তানদের দেখাশোনা, জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রেই নিজের আলাদা অবস্থান তৈরি করেছিলেন তিনি।
নূরজাহানের চলচ্চিত্রজীবনের শুরু ১৯৩০-এর দশকে শিশুশিল্পী হিসেবে। প্রথমে বাংলায় কাজ শুরু করেন তিনি। পরে তরুণ বয়সে মুম্বাইয়ে চলে যান। ১৯৪২ সালের ‘খানদান’ চলচ্চিত্র তাকে তারকাখ্যাতি এনে দেয়। ছবিটিতে অভিনয় করেছিলেন প্রাণও।

‘খানদান’-এর সাফল্যের পর মুম্বাইয়ের চলচ্চিত্রে একের পর এক কাজ আসতে থাকে তার। অভিনেত্রী হিসেবে জনপ্রিয়তার পাশাপাশি নিজের গাওয়া গানেও দর্শকদের মুগ্ধ করতেন তিনি। অভিনয় ও গানের এই দুই দক্ষতা তাকে অন্য অনেক তারকার তুলনায় আলাদা অবস্থানে নিয়ে যায়। পরে দিলীপ কুমার অভিনীত ‘জুগনু’সহ বেশ কিছু সফল চলচ্চিত্রে অভিনয় করেন তিনি।
তখন তার ক্যারিয়ার যখন ঊর্ধ্বমুখী, ঠিক সেই সময় আসে দেশভাগ। ভারত ও পাকিস্তান আলাদা হয়ে যাওয়ার পর নূরজাহান সিদ্ধান্ত নেন পাকিস্তানে যাওয়ার। কারণ সেটিই ছিল তার জন্মভূমি।
শূন্য থেকে পাকিস্তানের চলচ্চিত্রশিল্প গড়ার পথে
দেশভাগের পর পাকিস্তানের চলচ্চিত্রশিল্প তখনও নিজের ভিত শক্ত করার চেষ্টা করছে। লাহোরের অনেক স্টুডিও ক্ষতিগ্রস্ত ও পুড়ে গিয়েছিল। ভারতের প্রতিষ্ঠিত চলচ্চিত্র ব্যক্তিত্বদের কেউ কেউ লাহোরে কিছুদিন থাকার পর মুম্বাইয়ে ফিরে যান। কিন্তু নূরজাহান থেকে যান।
স্বামীর সঙ্গে মিলে একটি পুরোনো স্টুডিও কিনে সেটিকে আবার গড়ে তোলার কাজ শুরু করেন তিনি। চলচ্চিত্রশিল্পের অবকাঠামো তখন কার্যত নতুন করে দাঁড় করাতে হচ্ছিল। নূরজাহান সেই কঠিন কাজের অংশ হন।
এর তিন বছর পর তিনি পাকিস্তানের প্রথম নারী চলচ্চিত্র পরিচালক হন। তার পরিচালিত ‘চাঁদ ওয়্যে’ চলচ্চিত্রে তিনি নিজেই অভিনয় করেন এবং কণ্ঠও দেন। ছবিটি ব্যাপক সাফল্য পায় এবং পাকিস্তানের চলচ্চিত্রশিল্পের শুরুর দিকের অন্যতম সফল ছবি হিসেবে পরিচিতি পায়।
অন্যরা পেতেন ৩৫০, নূরজাহানের পারিশ্রমিক ২ হাজার
নূরজাহানের জনপ্রিয়তা যত বাড়তে থাকে, তার আর্থিক অবস্থানও তত শক্ত হয়। অর্থের ব্যাপারেও তিনি ছিলেন অত্যন্ত সচেতন। নিজের বাড়ি নিজের নামে রাখার পাশাপাশি স্বামীর সঙ্গে গড়ে তোলা স্টুডিওরও সহ-মালিক ছিলেন তিনি।
প্রথম দাম্পত্যের ইতি ঘটার পর ১৯৫৯ সালে অভিনেতা এজাজ দুররানিকে বিয়ে করেন নূরজাহান। এ সময় এজাজ তাকে চলচ্চিত্রে অভিনয় ছেড়ে দিতে বলেন। নূরজাহান তাতে রাজি হন। ১৯৬১ সালে চলচ্চিত্রে অভিনয় পুরোপুরি ছেড়ে দিয়ে গানে মনোযোগ দেন তিনি।

এরপর তার সংগীতজীবন নতুন উচ্চতায় পৌঁছে যায়। ঐ সময় অন্য গায়কেরা একটি চলচ্চিত্রের গানের জন্য যেখানে ৩৫০ পাকিস্তানি রুপি পারিশ্রমিক পেতেন, সেখানে নূরজাহান পেতেন ২ হাজার রুপি। অর্থাৎ অন্যদের তুলনায় প্রায় পাঁচ গুণের বেশি। এই তথ্য দিয়েছেন নূরজাহানকে নিয়ে লেখা গ্রন্থের লেখক আইজাজ গুল।
উর্দু ও পাঞ্জাবি গানে নিজের অবস্থান আরও শক্ত করেন নূরজাহান। সংগীত নিয়ে বিশ্বের বিভিন্ন দেশেও ভ্রমণ শুরু করেন তিনি।
নিজের অবস্থান নিয়ে ছিলেন আপসহীন
নূরজাহানের জীবন অবশ্য শুধু সাফল্যের গল্প ছিল না। তার ব্যক্তিগত জীবন নিয়েও নানা গুঞ্জন ছড়িয়েছিল। তার চরিত্র নিয়ে প্রশ্ন তোলা হয়েছিল, ছড়ানো হয়েছিল নানা গল্প। কিন্তু এসবের মধ্যেও নিজের অবস্থান থেকে সরে যাননি তিনি।
নূরজাহানের তিন মেয়ে একবার তাদের মায়ের ২০তম মৃত্যুবার্ষিকীতে প্রকাশিত এক ভিডিওতে বলেছিলেন, তাদের মা ছিলেন অত্যন্ত সাহসী। সম্মানের সঙ্গে তিনি সেই জগতে টিকে ছিলেন এবং সবাইকে তাকে সম্মান করতে বাধ্য করেছিলেন।

একবার এক চলচ্চিত্র প্রযোজক নূরজাহানের রেকর্ডিং স্টুডিওতে ঢুকে তাকে গান গাওয়ার অনুরোধ করেন। কারণ ওই চলচ্চিত্রে তিনি অর্থ বিনিয়োগ করেছিলেন। নূরজাহান তখন উঠে দাঁড়িয়ে ওই প্রযোজককে কান ধরে স্টুডিও থেকে বের করে দেন। তার মেয়ের বর্ণনা অনুযায়ী, ঘটনাটি দেখে উপস্থিত সবাই হতবাক হয়ে গিয়েছিলেন।
ছয় সন্তানকে মাসে দিতেন ৩৫ হাজার রুপি করে
নূরজাহানের দ্বিতীয় সংসারেও তিন সন্তান জন্ম নেয়। সব মিলিয়ে তার ছয় সন্তান ছিল। সংসারে নানা টানাপোড়েনের সময় তিন মেয়েকে তিনি আবাসিক স্কুলে পাঠিয়েছিলেন, যাতে পারিবারিক অস্থিরতার প্রভাব তাদের ওপর না পড়ে।
সন্তানদের প্রতি অবশ্য তার ভালোবাসায় কোনো কমতি ছিল না। মেয়েদের জন্য আম পাঠানোর সময় পুরো স্কুলের জন্যই যথেষ্ট আম পাঠাতেন তিনি।
১৯৭০-এর দশকে নূরজাহান তার প্রত্যেক সন্তানকে প্রতি মাসে ৩৫ হাজার পাকিস্তানি রুপি করে ভাতা দিতেন। তৎকালীন সময়ে এটি ছিল বিশাল অঙ্কের অর্থ।

জীবনের শেষ ছয় বছর নূরজাহান পাকিস্তান, লন্ডন ও যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন হাসপাতালে চিকিৎসার মধ্যে ছিলেন। শেষ সময়েও সন্তানরা তার পাশে ছিলেন। মৃত্যুর পর সম্পত্তি নিয়ে সন্তানদের মধ্যে বিরোধ তৈরি হতে পারে, এমন আশঙ্কায় জীবদ্দশাতেই নিজের বেশির ভাগ সম্পদ বিক্রি করে সেই অর্থ সন্তানদের মধ্যে ভাগ করে দিয়েছিলেন তিনি।
১৯৮২ সালে একবারই ভারতে ফিরেছিলেন
দেশভাগের পর ১৯৮২ সালে একবারই ভারতে যাওয়ার সুযোগ হয়েছিল নূরজাহানের। সেটিই ছিল দেশভাগের পর তার একমাত্র ভারত সফর।
ভারতে পৌঁছানোর সময় তিনি আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েছিলেন। দূরদর্শনে দিলীপ কুমারের সঙ্গে এক আলাপচারিতায় ১৯৪০-এর দশকে একসঙ্গে কাজ করার দিনগুলোর স্মৃতিও তুলে ধরেছিলেন তিনি।
ভারত যাওয়ার সময় বিমানবন্দরে তার কাগজপত্র নিয়ে জটিলতা তৈরি হয়েছিল। পরে দেশে পৌঁছালে চলচ্চিত্রজগতের অনেকেই তাকে উষ্ণ অভ্যর্থনা জানান। তাদের মধ্যে ছিলেন লতা মঙ্গেশকরও।
নূরজাহানকে নিয়ে লতা মঙ্গেশকরের শ্রদ্ধাও ছিল গভীর। নূরজাহানের মৃত্যুর পর এক সাক্ষাৎকারে লতা বলেছিলেন, প্রত্যেকেরই একজন আদর্শ থাকে এবং নূরজাহান যে তারও আদর্শ ছিলেন, তা স্বীকার করতে তার কোনো দ্বিধা নেই।
১৯৯৬ সালে শেষবারের মতো গান রেকর্ড করেন নূরজাহান। কিন্তু তার কণ্ঠ থেমে যাওয়ার পরও সেই সুর ছড়িয়ে আছে দক্ষিণ এশিয়ার অগণিত মানুষের ঘরে।
২০০০ সালে ৭৪ বছর বয়সে মারা যান নূরজাহান। ভারত ও পাকিস্তান, দুই দেশের চলচ্চিত্র ও সংগীতের ইতিহাসেই রেখে যান এমন এক অধ্যায়, যেখানে তারকাখ্যাতির পাশাপাশি রয়েছে নিজের হাতে একটি চলচ্চিত্রশিল্প গড়ে তোলার গল্প, আর্থিকভাবে স্বাধীন থাকার দৃঢ়তা এবং নিজের শর্তে বেঁচে থাকার এক অনন্য দৃষ্টান্ত।
/অ