দেশ টেলিভিশন লিমিটেড, কর্ণফুলী মিডিয়া পয়েন্ট, ৪২, শহীদ সাংবাদিক সেলিনা পারভীন সড়ক, মালিবাগ, ঢাকা-১২১৭, বাংলাদেশ।
টেলিফোন: +৮৮ (০২) ৮৩৩২৯৫৮, ৮৩৩২৯২২ ফ্যাক্স: +৮৮ (০২) ৮৩৩২৯৮১ মেইল: [email protected]

বাংলাদেশসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশের শিক্ষার্থীদের জীবনে উচ্চমাধ্যমিক সার্টিফিকেট (এইচএসসি) পরীক্ষা একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় ও শিক্ষাজীবনের অন্যতম মাইলফলক। এই পরীক্ষার ফলাফলের সঙ্গে জড়িয়ে থাকে উচ্চশিক্ষার স্বপ্ন, বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির সম্ভাবনা এবং ভবিষ্যৎ পেশাজীবনের পথচলা। শুধু শিক্ষার্থী নয়, তাঁদের পরিবার, সমাজ এমনকি রাষ্ট্রের কাছেও এই পরীক্ষার ফলাফল বিশেষ তাৎপর্য বহন করে। ফলে পরীক্ষায় প্রত্যাশিত সাফল্য অর্জন করতে না পারলে অনেক শিক্ষার্থী ও তাঁদের পরিবার সেটিকে জীবনের বড় ব্যর্থতা হিসেবে বিবেচনা করেন। কিন্তু একটি পরীক্ষার ফলাফলই কি একজন শিক্ষার্থীর মেধা, যোগ্যতা কিংবা ভবিষ্যৎ নির্ধারণের চূড়ান্ত মানদণ্ড হতে পারে? নাকি ব্যর্থতার আড়ালেও লুকিয়ে থাকে নতুন করে ঘুরে দাঁড়ানোর, নিজেকে আবিষ্কার করার এবং সাফল্যের পথে এগিয়ে যাওয়ার অসংখ্য সম্ভাবনা?
দেশে চলতি বছর এইচএসসি ও সমমানের পরীক্ষায় অকৃতকার্য হয়েছেন ৫ লাখ ৯৪ হাজার ১১৩ জন শিক্ষার্থী। উত্তীর্ণ হয়েছেন ৬ লাখ ৪৬ হাজার ৬৮৫ জন। পাসের হার মাত্র ৫২ দশমিক ১২ শতাংশ। অর্থাৎ পরীক্ষায় অংশ নেয়া প্রায় অর্ধেক শিক্ষার্থীই কাঙ্ক্ষিত ফল অর্জন করতে পারেননি।
যারা উত্তীর্ণ হয়েছেন, তারা হয়তো সামনে এগিয়ে যাওয়ার নতুন পথ খুঁজে পাবেন। কিন্তু যারা অকৃতকার্য হয়েছেন, তাদের গল্পও এখানেই শেষ হয়ে যাওয়ার কথা নয়। বরং তাদের অনেকের ঘুরে দাঁড়ানোর যাত্রা শুরু হতে পারে এই জায়গা থেকেই।
এবার দেখা যাক, এমন কয়েকজন মানুষের গল্প, যাদের জীবনের বড় বাধা কিংবা ব্যর্থতা শেষ পর্যন্ত তাদের অগ্রযাত্রা থামাতে পারেনি।
বিশ্বখ্যাত বিজ্ঞানী ও নোবেলজয়ী আলবার্ট আইনস্টাইনের কথাই ধরা যাক। মাত্র ১৬ বছর বয়সে তিনি সুইজারল্যান্ডের জুরিখের ফেডারেল পলিটেকনিক ইনস্টিটিউটে ভর্তির প্রবেশিকা পরীক্ষায় অকৃতকার্য হন। গণিত ও বিজ্ঞানে ভালো করলেও ভাষা ও ইতিহাসের মতো বিষয়ে তার ফল আশানুরূপ ছিল না। তবে তিনি হাল ছাড়েননি। পরবর্তী সময়ে আরাউয়ের একটি বিদ্যালয়ে পড়াশোনা শেষ করে আবারও ভর্তির সুযোগ পান। পরবর্তী সময়ে তার আপেক্ষিকতাবাদ আধুনিক পদার্থবিজ্ঞানের ধারণাকেই বদলে দেয়। ১৯২১ সালে তিনি পদার্থবিজ্ঞানে নোবেল পুরস্কার পান।
আইনস্টাইনের এই অভিজ্ঞতা আমাদের একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা দেয়। কোনো একটি পরীক্ষায় একজন শিক্ষার্থীর সব যোগ্যতা প্রকাশ পায় না। একটি নির্দিষ্ট সময়ের প্রস্তুতি, কিছু বিষয়ের দুর্বলতা কিংবা পরীক্ষার পরিস্থিতি তার সামগ্রিক মেধার যথার্থ প্রতিফলন নাও হতে পারে।
আরেকজন বিশ্বখ্যাত উদ্ভাবক থমাস আলভা এডিসনের শিক্ষাজীবনও প্রচলিত শিক্ষাব্যবস্থার সঙ্গে একেবারেই মসৃণ ছিল না। শৈশবে অল্প সময় বিদ্যালয়ে পড়াশোনার পর তিনি প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা থেকে সরে আসেন। তার মা বাড়িতেই তাকে পড়াশোনায় সহায়তা করেন। পরবর্তী সময়ে নিজের কৌতূহল, পরীক্ষা-নিরীক্ষা ও অধ্যবসায়ের মাধ্যমে তিনি হয়ে ওঠেন ইতিহাসের অন্যতম প্রভাবশালী উদ্ভাবক। বৈদ্যুতিক বাতির ব্যবহারিক উন্নয়ন, ফোনোগ্রাফ এবং চলচ্চিত্র প্রযুক্তির বিকাশে তার অবদান স্মরণীয় হয়ে আছে।
অ্যাপলের সহপ্রতিষ্ঠাতা স্টিভ জবসের জীবনও তরুণদের জন্য অনুপ্রেরণার। যুক্তরাষ্ট্রের রিড কলেজে ভর্তি হলেও আর্থিক সংকটের কারণে তিনি ছয় মাসের মাথায় নিয়মিত পড়াশোনা ছেড়ে দেন। এরপরও নিজের আগ্রহের বিষয়গুলোতে ক্লাস করার সুযোগ নিয়েছিলেন। তার উদ্ভাবনী চিন্তা ও নেতৃত্ব ব্যক্তিগত কম্পিউটার, সংগীত শোনা এবং মুঠোফোন ব্যবহারের জগতে বড় পরিবর্তন এনেছে।
মাইক্রোসফটের সহপ্রতিষ্ঠাতা বিল গেটস হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা শুরু করলেও ডিগ্রি শেষ করেননি। তিনি পড়াশোনা ছেড়ে নিজের প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানের কাজে মনোযোগ দেন। পরবর্তী সময়ে বিশ্বের অন্যতম সফল উদ্যোক্তা ও দাতা হিসেবে পরিচিতি পান।
একইভাবে ফেসবুকের প্রতিষ্ঠাতা মার্ক জাকারবার্গও হার্ভার্ডে পড়াশোনা অসমাপ্ত রেখে প্রযুক্তি উদ্যোগে মনোযোগী হন। তার প্রতিষ্ঠিত সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম মানুষের যোগাযোগের ধরন বদলে দিয়েছে।
ভারতের সাবেক রাষ্ট্রপতি ও ‘মিসাইল ম্যান’ খ্যাত ড. এ. পি. জে. আবদুল কালামের স্বপ্ন ছিল যুদ্ধবিমানের পাইলট হওয়া। কিন্তু ভারতীয় বিমানবাহিনীর নির্বাচনি পরীক্ষায় ২৫ জনের মধ্যে নবম হওয়ায় তার সেই স্বপ্ন পূরণ হয়নি। নিয়োগের সুযোগ ছিল মাত্র আটজনের। জীবনের এই প্রত্যাখ্যান তাকে থামাতে পারেনি। পরবর্তী সময়ে তিনি হয়ে ওঠেন ভারতের অন্যতম বিজ্ঞানী, দেশটির ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচির প্রধান স্থপতি এবং রাষ্ট্রপতি।
তবে এসব মানুষের গল্পকে সরাসরি পরীক্ষায় অকৃতকার্য হওয়ার উদাহরণ হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। তাদের অভিজ্ঞতা থেকে বরং বোঝা যায়, শিক্ষাজীবনের কোনো একটি পর্যায়ে বাধা আসা কিংবা প্রচলিত শিক্ষার পথ থেকে সরে যাওয়া মানেই জীবনের সম্ভাবনা শেষ হয়ে যাওয়া নয়।
জনপ্রিয় হ্যারি পটার সিরিজের লেখিকা জে কে রাউলিংয়ের জীবনেও ছিল প্রত্যাখ্যান ও হতাশার দীর্ঘ অধ্যায়। ব্যক্তিগত জীবনের সংকটের মধ্যে সন্তানকে নিয়ে কঠিন সময় পার করতে হয়েছে তাকে। তার লেখা পাণ্ডুলিপি প্রকাশের জন্য একাধিক প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান থেকে প্রত্যাখ্যাত হয়েছিল। কিন্তু তিনি লেখালেখি ছেড়ে দেননি। শেষ পর্যন্ত সেই হ্যারি পটার সিরিজই তাকে বিশ্বের অন্যতম জনপ্রিয় লেখকে পরিণত করে।
এই গল্পগুলো এইচএসসিতে অকৃতকার্য শিক্ষার্থীদের জন্য সবচেয়ে বড় শিক্ষা হতে পারে, জীবনে সফল হওয়ার কোনো একটিমাত্র পথ নেই। পরীক্ষায় ভালো ফল করা অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ। উচ্চশিক্ষা ও পেশাগত জীবনে ভালো ফলের প্রয়োজনীয়তাও অস্বীকার করার উপায় নেই। কিন্তু পরীক্ষার ফলই মানুষের সামগ্রিক যোগ্যতার চূড়ান্ত মাপকাঠি নয়।
এদিকে চলতি বছরের এইচএসসি ও সমমানের পরীক্ষায় এক বা দুই বিষয়ে অকৃতকার্য হওয়া শিক্ষার্থীদের জন্য বিশেষ সুযোগের কথাও জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা মাহদী আমিন। এসব শিক্ষার্থীকে এক বছর অপেক্ষা না করিয়ে আগামী এক মাসের মধ্যে শুধু অকৃতকার্য বিষয়গুলোতে পুনরায় পরীক্ষায় অংশগ্রহণের সুযোগ দেয়ার উদ্যোগ নেয়া হচ্ছে। ফলে অনেক শিক্ষার্থীর সামনে দ্রুত ঘুরে দাঁড়ানোর একটি সুযোগ তৈরি হচ্ছে।
তবে শুধু পুনরায় পরীক্ষার সুযোগই যথেষ্ট নয়। এই মুহূর্তে সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন পরিবার, শিক্ষক ও সমাজের সহমর্মিতা। যেসব শিক্ষার্থী অকৃতকার্য হয়েছে, তাদের তিরস্কার না করে কোথায় ঘাটতি ছিল, তা খুঁজে বের করতে সহায়তা করতে হবে। প্রয়োজন মানসিক সমর্থন, নতুন করে প্রস্তুতি নেয়ার পরিবেশ এবং নিজেদের সক্ষমতার ওপর বিশ্বাস ফিরিয়ে আনা।
২০০৮ সালে হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাবর্তন অনুষ্ঠানে দেয়া বক্তব্যে নিজের জীবনের ব্যর্থতার অভিজ্ঞতা তুলে ধরে হ্যারি পটার সিরিজের লেখিকা জে কে রাউলিং বলেন,‘জীবনে কোনো কিছুতেই ব্যর্থ না হয়ে বেঁচে থাকা অসম্ভব, যদি না কেউ এতটা সতর্কভাবে জীবনযাপন করে যে, আদতে সে বেঁচেই থাকে না। ব্যর্থতা আমাকে এমন আত্মবিশ্বাস দিয়েছিল, যা পরীক্ষায় পাস করেও কখনো অর্জন করতে পারিনি। ব্যর্থতা আমাকে নিজের সম্পর্কে এমন কিছু শিখিয়েছে, যা অন্য কোনোভাবে শেখা সম্ভব ছিল না।’
ব্যর্থতা থেকে শিক্ষা নেয়ার গুরুত্ব তুলে ধরে মাইক্রোসফটের সহপ্রতিষ্ঠাতা বিল গেটস বলেন,‘সাফল্য উদ্যাপন করা ভালো, তবে ব্যর্থতা থেকে পাওয়া শিক্ষাকে গুরুত্ব দেয়া আরও বেশি জরুরি।’
পরীক্ষায় পাস করা অবশ্যই আনন্দের, কিন্তু একটি পরীক্ষায় অকৃতকার্য হওয়া মানেই জীবনের সম্ভাবনার দরজা বন্ধ হয়ে যাওয়া নয়। জে কে রাউলিংয়ের অভিজ্ঞতা আমাদের মনে করিয়ে দেয়, পরীক্ষায় পাস করার বাইরেও মানুষের আত্মবিশ্বাস, যোগ্যতা ও সৃজনশীলতা বিকশিত হওয়ার অনেক পথ রয়েছে। আর বিল গেটসের কথায়, ব্যর্থতা থেকে শিক্ষা নেওয়াটাই হতে পারে পরবর্তী সাফল্যের গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি।
কেএম