দেশ টেলিভিশন লিমিটেড, কর্ণফুলী মিডিয়া পয়েন্ট, ৪২, শহীদ সাংবাদিক সেলিনা পারভীন সড়ক, মালিবাগ, ঢাকা-১২১৭, বাংলাদেশ।
টেলিফোন: +৮৮ (০২) ৮৩৩২৯৫৮, ৮৩৩২৯২২ ফ্যাক্স: +৮৮ (০২) ৮৩৩২৯৮১ মেইল: [email protected]

দেশের তৈরি পোশাক খাতের শীর্ষ সংগঠন বাংলাদেশ গার্মেন্টস ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশন বিজিএমইএ এমন একটি সিদ্ধান্তের দিকে এগোচ্ছে, যা কার্যকর হলে শত শত পোশাক কারখানার মালিক সংগঠনের নির্বাচনে ভোটাধিকার হারাতে পারেন। সংঘবিধিতে নতুন ধারা যুক্ত করার প্রস্তাব ঘিরে সংগঠনের ভেতরে ও বাইরে তীব্র আলোচনা-সমালোচনা শুরু হয়েছে।
ব্যবসায়ী নেতাদের একাংশের আশঙ্কা, এই সিদ্ধান্ত কার্যকর হলে অনেক সদস্যের ভোটাধিকার সীমিত হয়ে পড়বে। একই সঙ্গে বন্ধ ও আংশিকভাবে বন্ধ থাকা কারখানা পুনরায় চালুর সরকারের সাম্প্রতিক উদ্যোগও বাধাগ্রস্ত হতে পারে। এতে সংগঠনের ভবিষ্যৎ নেতৃত্ব নির্বাচন ও ক্ষমতার ভারসাম্যে বড় পরিবর্তন আসতে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
জানা গেছে, আগামী ২০ জুন অনুষ্ঠিতব্য বিজিএমইএ’র বিশেষ সাধারণ সভায় সংঘবিধিতে নতুন ধারা ৫(গ) যুক্ত করার প্রস্তাব তোলা হবে। প্রস্তাব অনুযায়ী, যে সদস্য বর্তমানে রপ্তানি কার্যক্রমে যুক্ত নন অথবা বিজিএমইএ থেকে এককভাবে ইউটিলাইজেশন ডিক্লারেশন সেবা গ্রহণ করেন না, তিনি পরিচালনা পর্ষদ নির্বাচনে ভোটার তালিকায় অন্তর্ভুক্ত হতে বা ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে পারবেন না।
এ ক্ষেত্রে সদস্যদের সর্বশেষ অর্থবছরের রপ্তানি আয়ের প্রমাণ হিসেবে প্রোসিডস রিয়েলাইজেশন সার্টিফিকেট বিবেচনায় নেওয়া হবে। ফলে বর্তমানে উৎপাদন বা রপ্তানিতে যুক্ত না থাকা বা বিভিন্ন কারণে বন্ধ থাকা কারখানার একটি বড় অংশ ভোটার তালিকা থেকে বাদ পড়ার ঝুঁকিতে রয়েছে।
সংগঠনের অনেক সদস্যের কারখানা আর্থিক সংকট, ব্যাংক ঋণের জটিলতা, রাজনৈতিক অস্থিরতা, বৈশ্বিক মন্দা ও প্রশাসনিক চাপের কারণে বন্ধ থাকলেও তারা এখনো সদস্য হিসেবে আছেন এবং ভোটাধিকার ভোগ করছেন।
ব্যবসায়ী নেতাদের মতে, গত দেড় দশকে বিভিন্ন রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক পরিস্থিতির কারণে বহু উদ্যোক্তা ব্যবসা হারিয়েছেন। তাদের একটি অংশ এখনো কারখানা পুনরায় চালুর চেষ্টা করছেন। নতুন প্রস্তাব কার্যকর হলে এসব উদ্যোক্তা সংগঠনের নীতিনির্ধারণ প্রক্রিয়া থেকে কার্যত বাইরে চলে যেতে পারেন।
বিশেষজ্ঞদের মতে, বিষয়টি সরকারের শিল্প পুনরুদ্ধার কর্মসূচির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ কি না, তা নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে। ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটে অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বন্ধ ও রুগ্ন শিল্প পুনরুজ্জীবনের জন্য বড় অঙ্কের প্রণোদনা তহবিল ঘোষণা করেছেন।
এই তহবিলের একটি অংশ বন্ধ কলকারখানা ও সেবা খাত পুনরুদ্ধারে বরাদ্দ রাখা হয়েছে। সরকারের লক্ষ্য এসব উদ্যোগের মাধ্যমে ব্যাপক কর্মসংস্থান সৃষ্টি করা।
নীতিনির্ধারকদের মতে, বন্ধ কারখানা সচল হলে উৎপাদন ও কর্মসংস্থান বাড়বে এবং অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে গতি আসবে।
তবে বিজিএমইএ’র প্রস্তাব বাস্তবায়িত হলে বন্ধ ও আংশিক বন্ধ কারখানার মালিকরা নির্বাচনি প্রক্রিয়া থেকে বাদ পড়তে পারেন, যা অনেক উদ্যোক্তার মধ্যে নিরুৎসাহ তৈরি করতে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
এ বিষয়ে সরব হয়েছেন বিএনপির কেন্দ্রীয় শিল্পবিষয়ক সম্পাদক এবং কুমিল্লা-৯ আসনের সংসদ সদস্য ও শিল্পপতি মো. আবুল কালাম।
তিনি বলেন, গত ১৭ বছরে রাজনৈতিক বৈষম্য, প্রশাসনিক চাপ ও হয়রানির কারণে বহু ব্যবসায়ী তাদের শিল্পপ্রতিষ্ঠান হারিয়েছেন বা বন্ধ করতে বাধ্য হয়েছেন।
তার নিজের ছয়টি কারখানা বন্ধ হয়ে যায় এবং পরে চেষ্টার মাধ্যমে তিনটি পুনরায় চালু করতে সক্ষম হয়েছেন বলে তিনি জানান। তিনি বলেন, সরকার যখন বন্ধ কারখানা পুনরুজ্জীবনে বড় প্রণোদনা দিচ্ছে, তখন বিজিএমইএ যদি এমন সিদ্ধান্ত নেয় যা এসব মালিকদের ভোটাধিকার সীমিত করে, তা সরকারের লক্ষ্যকে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কয়েকজন গার্মেন্টস উদ্যোক্তা জানান, অনেক কারখানা সরাসরি রপ্তানিতে যুক্ত না থাকলেও উৎপাদন কার্যক্রম চালু রয়েছে। ব্যাংকিং ও আর্থিক জটিলতার কারণে সরাসরি রপ্তানি করতে না পারলেও তারা সাব কন্ট্রাক্টের মাধ্যমে কাজ চালিয়ে যাচ্ছেন।
তাদের মতে, এসব প্রতিষ্ঠান কার্যত সক্রিয় এবং সক্ষম, তাই সাময়িক সংকটের কারণে তাদের বন্ধ হিসেবে বিবেচনা করা ঠিক নয়।
বিজিএমইএ নির্বাচন বরাবরই দেশের ব্যবসায়িক অঙ্গনের গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র হিসেবে বিবেচিত। প্রায় প্রতিটি নির্বাচনে বিভিন্ন ব্যবসায়ী গোষ্ঠীর মধ্যে প্রতিদ্বন্দ্বিতা দেখা যায়।
বিশ্লেষকদের মতে, সক্রিয় রপ্তানিকারকদের মধ্যে ভোটার তালিকা সীমিত হলে ভোটার সংখ্যা কমে যেতে পারে এবং ক্ষমতার ভারসাম্যেও পরিবর্তন আসতে পারে।
তবে প্রস্তাবের সমর্থকদের মতে, বিজিএমইএ মূলত রপ্তানিমুখী পোশাক খাতের প্রতিনিধিত্বকারী সংগঠন। তাই যারা বাস্তবে রপ্তানি কার্যক্রমে যুক্ত নন, তাদের নির্বাচনি প্রক্রিয়ায় প্রভাব সীমিত থাকা উচিত।
সব মিলিয়ে প্রস্তাবিত সংশোধনীটি এখন পোশাক খাতের অন্যতম আলোচিত ইস্যুতে পরিণত হয়েছে। আগামী ২০ জুনের বিশেষ সাধারণ সভায় চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের ওপরই নির্ভর করবে বিজিএমইএ’র নির্বাচনি কাঠামো ও ভবিষ্যৎ ক্ষমতার ভারসাম্য।
এমএস/