দেশ টেলিভিশন লিমিটেড, কর্ণফুলী মিডিয়া পয়েন্ট, ৪২, শহীদ সাংবাদিক সেলিনা পারভীন সড়ক, মালিবাগ, ঢাকা-১২১৭, বাংলাদেশ।
টেলিফোন: +৮৮ (০২) ৮৩৩২৯৫৮, ৮৩৩২৯২২ ফ্যাক্স: +৮৮ (০২) ৮৩৩২৯৮১ মেইল: [email protected]

যশোরে সদরের বাহাদুরপুর এলাকার তেঁতুলতলা মোড়ে মধ্যরাতে যুবলীগ কর্মী আলী হোসেনকে হত্যায় অংশ নেয় দুই দুর্বৃত্ত। ৪০ সেকেন্ডের কিলিং মিশনে ছয় রাউন্ড গুলি করা হয়। প্রথম গুলি লক্ষ্যভ্রষ্ট হওয়ায় দৌড়ে পালানোর চেষ্টা করে আলী। এ সময় তার পায়ে গুলি করা হয়। এতে পড়ে যান সেই যুবলীগ কর্মী। পরে তার মাথায় এক রাউন্ড ও পিঠে তিন রাউন্ড গুলি করা হয়। ঘটনাস্থলে উপস্থিত প্রত্যক্ষদর্শী যুবলীগ কর্মীর সহযোগী ও তদন্তসংশ্লিষ্ট পুলিশ কর্মকর্তার সঙ্গে কথা বলে এই তথ্য পাওয়া গেছে।
গত ৫ জুন অনুষ্ঠিত সদর উপজেলা পরিষদ নির্বাচনে বিজয়ী চেয়ারম্যান তৌহিদ চাকলাদারের কর্মী ছিলেন আলী হোসেন। তার বিজয় উপলক্ষে বৃহস্পতিবার (৬ জুন) রাতে উপশহর ই-ব্লক এলাকায় প্রীতিভোজের আয়োজন করা হয়। সেখানে খাওয়া শেষে মধ্যরাতে এক সহযোগীকে নিয়ে মোটরসাইকেলে বাড়ি ফিরছিলেন ৩০ বছর বয়সী আলী হোসেন। পথিমধ্যে বাহাদুরপুর তেঁতুলতলা মোড় এলাকায় পৌঁছলে আরেক মোটরসাইকেলে দুই আরোহী তাদের পিছু নেয়। একপর্যায়ে আলীকে লক্ষ্য করে গুলি ছোঁড়ে। গুলি লক্ষ্যভ্রষ্ট হলে আলী হোসেন ও তার সহযোগী দৌড়ে পালানোর চেষ্টা করে। এ সময় আলীর পায়ে গুলি করা হয়। পড়ে গেলে কাছে গিয়ে মাথা ও পিঠে আরও চার রাউন্ড গুলি করে মৃত্যু নিশ্চিত করে পালিয়ে যায় ঘাতকরা।
আলী হোসেন সদর উপজেলার বাহাদুরপুর পশ্চিম পাড়া এলাকার আব্দুর রহমানের ছেলে। দলীয়ভাবে কোনো পদে না থাকলেও যুবলীগ নেতা ও যশোর পৌরসভার কাউন্সিলর আলমগীর কবির সুমনের সঙ্গে রাজনীতি করতেন তিনি। এই ঘটনার দুদিন অতিবাহিত হলেও (শনিবার পর্যন্ত) এখনও মামলা হয়নি। কাউকে আটকও করতে পারেনি পুলিশ। নিহত আলী হোসেনের বিরুদ্ধে চাঁচড়ার আলোচিত সন্ত্রাসী ইমরোজ হত্যাসহ মাদক, মারামারি ও দ্রুত বিচার আইনে চারটি মামলা রয়েছে।
শনিবার দুপুরে বাহাদুরপুর এলাকায় আলীর বাড়িতে গিয়ে দেখা গেছে, এখনও স্বজনের ভিড়। দুর-দূরান্ত থেকে স্বজন ও এলাকাবাসী তাদের বাড়িতে শোকাহত পরিবারকে সমবেদনা জানাচ্ছেন। বাড়ির ভেতরে অবস্থান করছিলেন নিহতের দীর্ঘদিনের সহযোগী সোহান হোসেন শেখ। তিনি বলেন, আমরা উপজেলা নির্বাচনে মোটরসাইকেলের কর্মী ছিলাম। জয়ের উদযাপনে ৬ জুন পিকনিকের আয়োজন করা হয়। ওখানে থেকে খাওয়া-দাওয়া করে আমরা দুজনে মোটরসাইকেলযোগে বাড়ি ফিরছিলাম। আলী বাইক চালাচ্ছিল, আমি পেছনে ছিলাম। লক্ষ্য করি, এক বাইকে দুজন আমাদের ফলো করছে। রাত সাড়ে ১২ টার দিকে বাড়ির সামনে মোড়ে পৌঁছাতেই পেছন থেকে ওই বাইক থেকে নামেন কিসমত নওয়াপাড়া গ্রামের নবাব আলী। সে প্রথমে গুলি ছুঁড়তেই আমরা পালাতে শুরু করি। প্রথমটি লক্ষ্যভ্রষ্ট হয়। পরে দুজনে দৌঁড়াতে শুরু করি। আবার গুলি ছুঁড়লে এবার আলীর পায়ে লাগলে পড়ে যায়। এরপর নবাব কাছে এসে প্রথমে মাথায় একটি, পরে পিঠে তিনটি গুলি করে। এরপর নবাব ও তার সহযোগী পালিয়ে যায়। পুরো কিলিং মিশনে তারা সময় নিয়েছে ৪০ থেকে ৬০ সেকেন্ড। এ সময় আমি চিৎকার করলে স্থানীয়রা এগিয়ে আসে। উদ্ধার করে হাসপাতালে নিলে আলীকে মৃত ঘোষণা করেন চিকিৎসক।
সোহান হোসেন শেখ অভিযোগ করেন, নবাব ও আলী হোসেনের মধ্যে এলাকায় মাটি এবং বালি ভরাট বিক্রি নিয়ে দ্বন্দ্ব ছিল। এর মধ্যে আলী হোসেন মোটরসাইকেল প্রতীকে ও নবাব ঘোড়া প্রতীকে নির্বাচন করে। নির্বাচন ও পূর্বের ব্যবসায়ীক দ্বন্দ্ব নিয়ে এই হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে।
নিহতের বৃদ্ধ বাবা আব্দুর রহমান বলেন, আমার দুই মেয়ে ও এক ছেলে। দুই মেয়েকে বিয়ে দিয়েছে আলী। বাড়ির একমাত্র উপার্জন সক্ষম ব্যক্তি মারা যাওয়ায় আমাদের বিরাট ক্ষতি হয়ে গেল। এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, আলীর কোনো ছেলে মেয়ে নেই। ৮ মাস হয়েছে বিয়ে করেছে। এলাকায় ব্যবসা ও সালিশ বিচার নিয়ে কারো কারো সঙ্গে দ্বন্দ্ব থাকতে পারে। কিছুদিন আগে নবাব ও তার সহযোগী সিরাজ, টুকুনের সঙ্গে কথাকাটাকাটি হয়। সেই ঘটনার জেরেই এই হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে।
আলীর স্ত্রী লুপা খানম বলেন, অল্প বয়সে আমারে যারা বিধবা করেছে, তাদের বিচার চাই। আমার স্বামী হত্যার বিচার চাই। এই হত্যায় আমাদের পরিবার পঙ্গু হয়ে গেল।
প্রত্যক্ষদর্শী ও স্থানীয় লোকজনের বরাতে যশোর ডিবি পুলিশের উপ-পরিদর্শক মফিজুল ইসলাম বলেন, মোট ছয়টি গুলি করা হয় আলীকে উদ্দেশে করে। এর মধ্যে পাঁচটি বিদ্ধ হয়। আর একটি লক্ষ্যভ্রষ্ট হয়। আপাতত এই হত্যাকাণ্ডে জড়িত দুজনকে খুঁজছি। কাউকে আটক করা যায়নি। এর পেছনে কেউ আছে কি না বা মাস্টার মাইন্ডকে খুঁজছি আমরা। কোতোয়ালি থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আবদুর রাজ্জাক বলেন, আধিপত্য বিস্তার নিয়ে স্থানীয় কয়েকজনের সঙ্গে আলীর বিরোধ ছিল। সেই বিরোধের জেরে তাকে গুলি করে হত্যা করা হয়েছে। এ ঘটনায় শনিবার বিকেল পর্যন্ত কোনো মামলা হয়নি। তবে, মামলা প্রক্রিয়াধীন। নিহতের বিরুদ্ধে হত্যা, মাদক, মারামারি ও দ্রুত বিচার আইনে চারটি মামলা রয়েছে।
এ বিষয়ে জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক শাহীন চাকলাদার বলেন, ঘটনাটি দুঃখজনক। এসব বিচ্ছিন্ন ঘটনা। তারা আমাদের দলের কেউ না। এসব ঘটনার সঙ্গে নির্বাচনের কোনো সম্পর্ক নেই।
এম