দেশ টেলিভিশন লিমিটেড, কর্ণফুলী মিডিয়া পয়েন্ট, ৪২, শহীদ সাংবাদিক সেলিনা পারভীন সড়ক, মালিবাগ, ঢাকা-১২১৭, বাংলাদেশ।
টেলিফোন: +৮৮ (০২) ৮৩৩২৯৫৮, ৮৩৩২৯২২ ফ্যাক্স: +৮৮ (০২) ৮৩৩২৯৮১ মেইল: [email protected]

যশোরের বেনাপোল স্থলবন্দরের সিলগালা করা শেড থেকে প্রায় ৬ কোটি টাকা মূল্যের আমদানি পণ্য গায়েব ও পণ্য পরিবর্তনের ঘটনায় বন্দরটির সহকারী পরিচালক (ট্রাফিক) কাজী রতনকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে। দায়িত্বে অবহেলা ও অসদাচরণের অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ায় বাংলাদেশ স্থলবন্দর কর্তৃপক্ষ এ সিদ্ধান্ত নিয়েছে। গত ১০ সেপ্টেম্বর এ সংক্রান্ত আদেশ জারি করা হয়।
বাংলাদেশ স্থলবন্দর কর্তৃপক্ষের আদেশে বলা হয়েছে, কাজী রতন বেনাপোল স্থলবন্দরের সার্কেল-২-এর সহকারী পরিচালক হিসেবে শেড নম্বর ১৫ থেকে ১৯, ৩৬, ৩৭ এবং ৩৯ থেকে ৪২-এর দায়িত্বে ছিলেন। গত ১২ মার্চ ভারত থেকে আসা একটি চালানে ঘোষণার সঙ্গে পণ্যের গরমিল ধরা পড়ার পর শুল্ক কর্তৃপক্ষ পণ্য জব্দ করে শেড নম্বর ৩৭-এ সিলগালা করে রাখে। পরে ওই পণ্য সরিয়ে সেখানে অন্য পণ্য রাখার অভিযোগ ওঠে।
ঘটনার ধারাবাহিকতায় গত ৪ জুন শেড নম্বর ৩৭-এর একটি চাবি নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। বন্দর কর্তৃপক্ষের আদেশ অনুযায়ী, ট্রাফিক পরিদর্শক মোহাম্মদ শাহজালাল চাবির একটি সেট ভারপ্রাপ্ত শেড ইনচার্জ আবুল খায়েরকে না দিয়ে সহকারী পরিচালক কাজী রতনের কাছে হস্তান্তর করেন। এরপর ৬ জুন রাতে সিলগালা করা শেডে কয়েকজনের অবৈধ প্রবেশ এবং ভেতরের পণ্য সরানোর ঘটনা ঘটে। ওই সময় শেডের একটি চাবি কাজী রতনের কাছে ছিল।
পরদিন ৭ জুন শেডটির সিল কাটা বা পরিবর্তন করা হয়েছে দেখতে পেলেও কাজী রতন কোনো ব্যবস্থা নেননি বলে কর্তৃপক্ষের তদন্তে উঠে এসেছে। এ ঘটনায় তাঁর সম্পৃক্ততা প্রমাণিত হয়েছে উল্লেখ করে গত ২৬ জুলাই তাঁর বিরুদ্ধে বিভাগীয় মামলা করা হয়। মামলা নম্বর ০১/২০২৬। পরে ঘটনার গুরুত্ব ও অপরাধের মাত্রা বিবেচনায় তাঁকে দায়িত্বে রাখা সমীচীন নয় বলে মনে করে কর্তৃপক্ষ। এর পরিপ্রেক্ষিতে ১০ সেপ্টেম্বর তাঁকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়।
ঘটনাটি শুধু একজন কর্মকর্তার দায়িত্বে অবহেলার মধ্যে সীমাবদ্ধ কি না, তা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। কারণ শুল্ক ফাঁকির উদ্দেশ্যে পণ্যের ঘোষণা পরিবর্তন, শুল্ক কর্তৃপক্ষের হাতে পণ্য জব্দ, সিলগালা শেডে সংরক্ষণ, চাবির নিয়ন্ত্রণ, রাতে শেডে প্রবেশ, পণ্য সরানো এবং পরবর্তী সময়ে সেখানে অন্য পণ্য রাখার অভিযোগে একাধিক ধাপ রয়েছে। ফলে পণ্য খালাসের পুরো প্রক্রিয়ায় কারা কোন পর্যায়ে যুক্ত ছিলেন, তা তদন্তের আওতায় আনার দাবি উঠেছে।
জানা যায়, গত ১২ মার্চ যশোরের আমদানিকারক প্রতিষ্ঠান সাহা ইমপেক্স ভারত থেকে একটি চালান আমদানি করে। চালানে বেকিং পাউডার উল্লেখ করা হলেও শুল্ক কর্তৃপক্ষের শারীরিক পরীক্ষায় ১০৮ কার্টনে বিপুল পরিমাণ উচ্চ শুল্কের ভারতীয় প্রসাধনী পাওয়া যায়। এসব পণ্যের বাজারমূল্য প্রায় ৬ কোটি টাকা। মিথ্যা ঘোষণার মাধ্যমে সরকারকে ২ কোটি ৩২ লাখ ৬৪ হাজার ৫১৫ টাকা রাজস্ব থেকে বঞ্চিত করার চেষ্টা করা হয়েছিল বলে সংশ্লিষ্ট প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়।
২ জুন শুল্ক বিভাগের একটি জ্যেষ্ঠ দল শেড নম্বর ৩৭ পরিদর্শনে গিয়ে দেখতে পায়, জব্দ করা পণ্য সেখানে নেই। পরে পণ্য পরিবর্তনের অভিযোগ সামনে আসে। এ ঘটনায় ৯ জুন বেনাপোল বন্দর থানায় মামলা করা হয়। বিষয়টি বর্তমানে তদন্তাধীন।
এদিকে বন্দরটির শেড নম্বর ৪১ থেকেও প্রায় ২৫ টন আমদানি পণ্য গায়েব হওয়ার অভিযোগ রয়েছে। বন্দর কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, শেড নম্বর ৩৭ ও ৪১-এর ধারাবাহিক ঘটনাগুলো খতিয়ে দেখা হচ্ছে। ফলে দুটি ঘটনার মধ্যে কোনো যোগসূত্র আছে কি না, একই ব্যক্তি বা গোষ্ঠী পণ্য ব্যবস্থাপনার বিভিন্ন ধাপে প্রভাব বিস্তার করেছে কি না, সেটিও তদন্তের গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে উঠেছে।
এ ছাড়া গত ২০ মে ভারত থেকে আসা পণ্যবাহী একটি ট্রাকের মোট ওজন ছিল ১৫ হাজার ৪৩০ কেজি। কিন্তু ১৫ হাজার ৩০ কেজি দেখিয়ে ওজন স্লিপ দেওয়ার অভিযোগ ওঠে। অর্থাৎ ৪০০ কেজি পণ্যের ওজন কম দেখানো হয়। প্রকৃত ওজনের তুলনায় এই পার্থক্যও বন্দরকেন্দ্রিক পণ্য ব্যবস্থাপনায় অনিয়ম ও রাজস্ব ফাঁকির সুযোগ তৈরি করতে পারে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।
বেনাপোল বন্দর পরিচালক রুহুল আমিন বলেন, শেডে সংরক্ষিত পণ্যের নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকা প্রত্যেকের ভূমিকা যাচাই করা হচ্ছে। কোনো পর্যায়ে দায়িত্বে অবহেলা বা অনিয়মের প্রমাণ পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে বিধি অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে। একই সঙ্গে শেডের চাবি ব্যবস্থাপনা, পণ্য সংরক্ষণ, প্রবেশ ও বের হওয়ার তথ্য এবং ওজন ব্যবস্থাপনা আরও কঠোরভাবে তদারকির উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।
এমএস/