দেশ টেলিভিশন লিমিটেড, কর্ণফুলী মিডিয়া পয়েন্ট, ৪২, শহীদ সাংবাদিক সেলিনা পারভীন সড়ক, মালিবাগ, ঢাকা-১২১৭, বাংলাদেশ।
টেলিফোন: +৮৮ (০২) ৮৩৩২৯৫৮, ৮৩৩২৯২২ ফ্যাক্স: +৮৮ (০২) ৮৩৩২৯৮১ মেইল: [email protected]

নওগাঁর আত্রাইয়ে চলাচলের রাস্তা ও জমির সীমানাপ্রাচীর নির্মাণকে কেন্দ্র করে দুই পক্ষের বিরোধ এখন পাল্টাপাল্টি মামলা, ভাঙচুর, হামলা, লুটপাট ও প্রাণনাশের হুমকির অভিযোগে গড়িয়েছে। এক পক্ষের দাবি, চলাচলের রাস্তা থাকা সত্ত্বেও নিজেদের সুবিধামতো জায়গা দিয়ে রাস্তা নিতে না পেরে তাঁদের বিরুদ্ধে মিথ্যা মামলা দিয়ে হয়রানি করা হচ্ছে। অন্য পক্ষের অভিযোগ, তাঁদের জমির ওপর জোর করে সীমানাপ্রাচীর নির্মাণের প্রতিবাদ করতে গিয়ে হামলা, মারধর ও লুটপাটের শিকার হয়েছেন তাঁরা।
ঘটনার সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ তদন্ত এবং মুক্তাদির রহমান মামুনের পরিবারের নিরাপত্তার দাবিতে রোববার সকালে উপজেলার ধুলাউড়ি গ্রামে ঘটনাস্থলের সামনে মানববন্ধন করেন স্থানীয় বাসিন্দারা। এতে শতাধিক মানুষ অংশ নেন।
স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ধুলাউড়ি গ্রামের মুক্তাদির রহমানের পরিবারের সঙ্গে জাহাঙ্গীর আলম ও তাঁর স্ত্রী খুরশেদা বিবির জমিজমা ও চলাচলের রাস্তা নিয়ে দীর্ঘদিনের বিরোধ রয়েছে। বিরোধ মেটাতে স্থানীয়ভাবে একাধিকবার সালিশ-বৈঠক হলেও স্থায়ী সমাধান হয়নি। সম্প্রতি সীমানাপ্রাচীর নির্মাণ ও ভাঙাকে কেন্দ্র করে দুই পক্ষের মধ্যে উত্তেজনা আরও বেড়েছে।
মুক্তাদির রহমানের দাবি, জাহাঙ্গীর আলমের পরিবারের চলাচলের জন্য আগে থেকেই রাস্তা রয়েছে। ওই রাস্তা দিয়ে স্থানীয় লোকজনও নিয়মিত চলাচল করেন। এরপরও নিজেদের পছন্দমতো জায়গা দিয়ে রাস্তা নেওয়ার জন্য তাঁদের ওপর চাপ সৃষ্টি করা হচ্ছে। এতে রাজি না হওয়ায় তাঁদের বিরুদ্ধে মিথ্যা মামলা দেওয়া হচ্ছে।
মুক্তাদির রহমান বলেন, গত ৩ আগস্ট দুপুরে জাহাঙ্গীর আলম ও আমজাদ হোসেনের নেতৃত্বে একদল লোক দেশীয় অস্ত্র নিয়ে তাঁদের বাড়িতে প্রবেশ করে। তারা দীর্ঘদিনের সীমানাপ্রাচীর ও একটি স্টোররুম ভাঙচুর করে। এতে প্রায় ছয় লাখ টাকার ক্ষতি হয়েছে। এ সময় তাঁর ১৬ বছর বয়সী মেয়ে মেহেরুন আক্তার স্মৃতি ঘটনার প্রতিবাদ করলে তাঁকে ধারালো অস্ত্র দিয়ে কোপ দেওয়ার চেষ্টা করা হয়। পরে প্রতিপক্ষের লোকজন তাঁদের লাশ গুমের হুমকি দিয়ে চলে যায় বলেও অভিযোগ করেন তিনি।
এ ঘটনায় ৪ আগস্ট মুক্তাদির রহমান বাদী হয়ে আত্রাই থানায় মামলা করেন। মামলায় ১৫ জনের নাম উল্লেখ করে অজ্ঞাতনামা আরও ৮ থেকে ১০ জনকে আসামি করা হয়েছে বলে জানান তিনি।
অন্যদিকে এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন জাহাঙ্গীর আলম। তাঁর দাবি, তাঁদের চলাচলের রাস্তা বন্ধ করে মুক্তাদিরের পক্ষ তাঁদের জমির ওপর প্রাচীর নির্মাণ করেছিল। সেটি ভেঙে দেওয়ার পর তাঁদের বিরুদ্ধে মামলা করা হয়। পরে তাঁরা জামিন নিয়ে বাড়িতে ফিরলে আবারও প্রাচীর নির্মাণ শুরু করা হয়। তাঁর স্ত্রী বাধা দিতে গেলে তাঁকে মারধর করে টাকা নিয়ে যাওয়া হয়েছে।
জাহাঙ্গীর আলমের স্ত্রী খুরশেদা বিবি ৭ আগস্ট মুক্তাদির রহমান মামুনসহ ১৪ জনের বিরুদ্ধে পাল্টা মামলা করেন। মামলার এজাহারে তিনি অভিযোগ করেন, ৬ আগস্ট আসামিরা রাস্তা বন্ধ করে প্রাচীর নির্মাণ করছিলেন। তিনি ও তাঁর মেয়ে আন্নিকা অথই বাধা দিলে তাঁদের মারধর করা হয় এবং পরনের কাপড় ছিঁড়ে শ্লীলতাহানি করা হয়।
এজাহারে আরও অভিযোগ করা হয়, পরে আসামিরা তাঁদের বাড়িতে ঢুকে আসবাবপত্র ভাঙচুর করেন। এ সময় ড্রয়ার ভেঙে আট ভরি স্বর্ণ, নগদ দুই লাখ টাকা ও দুটি মোবাইল ফোন নিয়ে যাওয়া হয়।
তবে খুরশেদা বিবির এসব অভিযোগও অস্বীকার করেছেন মুক্তাদির রহমান। তাঁর দাবি, পূর্বশত্রুতার জেরে তাঁদের বাড়িতে হামলা ও ভাঙচুর করা হয়েছে। তাঁর মেয়েকেও হত্যার চেষ্টা করা হয়েছে। পরে তাঁদের বিরুদ্ধে নারী নির্যাতন ও চুরির মামলা দিয়ে হয়রানি করা হচ্ছে। বহিরাগতদের দিয়েও নিয়মিত হুমকি দেওয়া হচ্ছে বলে অভিযোগ করেন তিনি।
মানববন্ধনে অংশ নেওয়া স্থানীয় ভ্যানচালক সেলিম হোসেন বলেন, খুরশেদা বিবির দায়ের করা নারী নির্যাতন ও চুরির মামলা সঠিক নয়। ঘটনার দিন তিনি সেখানে উপস্থিত ছিলেন বলে দাবি করেন। তাঁর ভাষ্য, হয়রানি করার উদ্দেশ্যেই মামলাটি করা হয়েছে।
স্থানীয় ছামছুর রহমান মৃধা ও মুকুল হোসেনসহ কয়েকজন বলেন, দীর্ঘদিন ধরে দুই পক্ষের বিরোধ চলে আসছে। স্থানীয়ভাবে বিষয়টি মীমাংসার চেষ্টা হলেও সমাধান হয়নি। প্রকৃত ঘটনা বের করতে নিরপেক্ষ তদন্ত প্রয়োজন।
মানববন্ধন শেষে স্থানীয়দের সঙ্গে প্রতিপক্ষের লোকজনের মধ্যে উত্তেজনা তৈরি হয়। স্থানীয়দের অভিযোগ, তাঁরা মুক্তাদির রহমানের পরিবারের পাশে দাঁড়ানোয় প্রতিপক্ষের কয়েকজন সেখানে এসে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির চেষ্টা করেন। মানববন্ধন শেষে ফেরার সময় সংবাদকর্মীদের সামনেও হুমকিমূলক বক্তব্য দেওয়ার অভিযোগ ওঠে।
জাহাঙ্গীর আলম বলেন, চলাচলের রাস্তা না দিয়ে তাঁদের জমির ওপর প্রাচীর নির্মাণ করা হয়েছিল। সালিশ-বৈঠকের সিদ্ধান্তও মানা হয়নি। এ কারণেই একবার প্রাচীর ভেঙে দেওয়া হয়েছিল। পরে আবার প্রাচীর নির্মাণের সময় তাঁর স্ত্রী বাধা দিতে গেলে তাঁকে মারধর করে টাকা নিয়ে যাওয়া হয়েছে।
জাহাঙ্গীরের সঙ্গে থাকা আমজাদ হোসেনও দাবি করেন, সালিশের সিদ্ধান্ত না মেনে জোর করে প্রাচীর নির্মাণ করা হচ্ছিল। এ কারণে প্রাচীর ভেঙে দেওয়া হয়েছিল। তবে খুরশেদা বিবিকে মারধরের সময় তিনি ঘটনাস্থলে ছিলেন না বলে জানান।
মুক্তাদির রহমানের ভাই লন্ডনপ্রবাসী ড. মিজানুর রহমান বলেন, তাঁদের পরিবারের নিরাপত্তা এবং ঘটনার নিরপেক্ষ তদন্ত চান তাঁরা। এ জন্য নওগাঁর পুলিশ সুপার মোহাম্মদ তারিকুল ইসলামের হস্তক্ষেপ কামনা করেন তিনি।
আত্রাই থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মাহবুব আলম বলেন, জমি ও রাস্তা নিয়ে বিরোধের ঘটনায় উভয় পক্ষেরই মামলা রয়েছে। বিষয়টি নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করা হচ্ছে। ভবিষ্যতে যাতে কোনো ধরনের মারামারি বা অপ্রীতিকর ঘটনা না ঘটে, সে জন্য উভয় পক্ষকে সতর্ক করে দেওয়া হয়েছে।
এমএস/