দেশ টেলিভিশন লিমিটেড, কর্ণফুলী মিডিয়া পয়েন্ট, ৪২, শহীদ সাংবাদিক সেলিনা পারভীন সড়ক, মালিবাগ, ঢাকা-১২১৭, বাংলাদেশ।
টেলিফোন: +৮৮ (০২) ৮৩৩২৯৫৮, ৮৩৩২৯২২ ফ্যাক্স: +৮৮ (০২) ৮৩৩২৯৮১ মেইল: [email protected]

সিরাজগঞ্জের শাহজাদপুরে উপজেলা পরিষদের জমির মালিকানা নিয়ে চৌকি আদালত ও উপজেলা প্রশাসনের বিরোধ আদালত অবমাননার মামলায় গড়িয়েছে। এ মামলায় উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) সাবরিনা শারমিনের বিরুদ্ধে আদালত অবমাননার অভিযোগ আনা হয়েছে। একই সঙ্গে তাঁকে ছয় মাস আটক রাখা ও অর্থদণ্ডের আবেদনও করা হয়েছে।
তবে সংশ্লিষ্ট নথিপত্রে দেখা গেছে, যে সিদ্ধান্তকে আদালতের আদেশ অমান্য হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে, সেটি নেওয়া হয়েছিল আদালতের অন্তর্বর্তীকালীন নিষেধাজ্ঞার আদেশ ইউএনওর দপ্তরে পৌঁছানোর আগেই।
নথি অনুযায়ী, গত ১৮ জুন আদালত জমি-সংক্রান্ত বিরোধে অন্তর্বর্তীকালীন নিষেধাজ্ঞা জারি করে নোটিশ পাঠানোর নির্দেশ দেন। কিন্তু আদেশটি বিবাদীপক্ষের কাছে পৌঁছায় ৩০ জুন। এর আগে ২১ জুন জেলা উন্নয়ন সমন্বয় সভা ও উপজেলা পর্যায়ের বিশেষ সভার সিদ্ধান্ত এবং ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের নির্দেশনা অনুযায়ী গণপূর্ত বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলীকে চিঠি দিয়ে চৌকি আদালতের সীমানা প্রাচীর নির্মাণকাজ সাময়িকভাবে স্থগিত রাখতে বলেন ইউএনও।
চৌকি আদালত ও উপজেলা প্রশাসনের নথি বিশ্লেষণে দেখা যায়, ১৪ জুলাই আদালতের সেরেস্তাদার ইউএনওর বিরুদ্ধে আদালত অবমাননার মামলা করেন। পাঁচ দিন পর, ১৯ জুলাই ইউএনও লিখিত আপত্তি দিয়ে জানান, সরকারপক্ষকে শুনানির সুযোগ না দিয়েই অন্তর্বর্তীকালীন আদেশ দেওয়া হয়েছে এবং যথাযথভাবে নোটিশও সরবরাহ করা হয়নি। একই সঙ্গে তিনি মামলার বাদী ও আদালতের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন তোলেন।
আদালত ওই আপত্তিতে বিচারক ও আদালত সম্পর্কে করা মন্তব্যকে অবমাননাকর উল্লেখ করে ইউএনওকে ২৬ জুলাই ব্যক্তিগতভাবে হাজির হয়ে ব্যাখ্যা দিতে নির্দেশ দেন। তবে অসুস্থতার কারণ দেখিয়ে সময় চাওয়া হলে তা নামঞ্জুর করা হয়। পাশাপাশি জেলা জজ আদালতে দেওয়ানি কার্যবিধির ২৪ ধারায় মামলা স্থানান্তরের আবেদন নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত কার্যক্রম স্থগিত রাখার আবেদনও খারিজ করা হয়। আদালত জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের সচিবকে ইউএনওর বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দেন।
উপজেলা প্রশাসনের দাবি, ২৬ জুলাইয়ের আদালতের আদেশ তারা হাতে পায় ২৮ জুলাই বিকেলে। এর আগে আবেদন করেও আদেশের অনুলিপি পাওয়া যায়নি। তবে ২৭ জুলাই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আদেশের বিবরণ ছড়িয়ে পড়ে। পরে আদালতের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট নন এমন এক ব্যক্তির কাছ থেকে আদেশের কপি সংগ্রহ করা হয়।
এদিকে জেলা প্রশাসক ১৬ জুলাই মামলাটি জেলা জজ আদালতে স্থানান্তরের আবেদন করেন। ওই আবেদনের শুনানির তারিখ নির্ধারণ করা হয়েছে ৬ আগস্ট। তবে এর আগেই আদালত অবমাননার মামলার কার্যক্রম এগিয়ে নেওয়া হয়। পরে সরকারপক্ষের আবেদনের পর মামলার নথি সিরাজগঞ্জ সদর আদালতে পাঠানো হয়েছে।
জমির মালিকানা নিয়েও দুই পক্ষের মধ্যে মতবিরোধ রয়েছে। উপজেলা পরিষদের সম্পদ রেকর্ড অনুযায়ী, বর্তমানে চৌকি আদালত যে ০ দশমিক ৬৫১২ একর জমি ব্যবহার করছে, সেটি উপজেলা পরিষদের খতিয়ানভুক্ত এবং এর ভূমি উন্নয়ন করও উপজেলা পরিষদ পরিশোধ করে আসছে। ১৯৮৩ সালের থানা কমপ্লেক্সের মূল লে-আউট পরিকল্পনায় চৌকি আদালতের জন্য প্রায় ০ দশমিক ৩৩৪২ একর জমি বরাদ্দ ছিল। তবে মামলার সংশোধিত আরজিতে প্রায় ৭ দশমিক ০৬ একর জমি আদালতের দখলে রয়েছে বলে দাবি করা হয়েছে। ওই এলাকায় উপজেলা পরিষদের বিভিন্ন দপ্তর ও সরকারি আবাসনও রয়েছে।
উপজেলা পরিষদের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের দাবি, সংশ্লিষ্ট জায়গাটি উপজেলা পরিষদের সম্পত্তি এবং তারা দীর্ঘদিন ধরে সেখানে বসবাস ও দায়িত্ব পালন করে আসছেন। তাঁদের ভাষ্য, বিভিন্ন সময় আদালত থেকে জায়গা ছাড়ার নির্দেশ দেওয়া হলেও উপজেলা প্রশাসন তাঁদের সেখানে থাকার ব্যবস্থা করেছে।
উপজেলা সমাজসেবা অফিসের কর্মচারী মো. লিটন, উপজেলা প্রশাসনিক কর্মকর্তা তাইফুল বারী, ইউএনও কার্যালয়ের স্টাফ মো. বাবুল হাসান ও উপজেলা পরিষদের একাডেমিক সুপারভাইজার মো. মিলন হোসেন জানান, তাঁরা দীর্ঘদিন ধরে উপজেলা পরিষদের কোয়ার্টার ও ডরমিটরিতে বসবাস করছেন এবং জায়গাটি উপজেলা পরিষদের মালিকানাধীন বলেই জেনে এসেছেন।
শাহজাদপুর চৌকি আদালতের নাজির রবিউল হাসান বলেন, আদালতের নিরাপত্তার জন্য দীর্ঘদিন ধরে আইন মন্ত্রণালয়ে আবেদন করা হচ্ছিল। বরাদ্দ পাওয়ার পর সীমানা প্রাচীর নির্মাণ শুরু হয়। প্রায় অর্ধেক কাজ শেষ হওয়ার পর ইউএনও নির্মাণকাজ বন্ধ করে দেন। পরে আদালত তাঁকে হাজির হয়ে ব্যাখ্যা দিতে বললেও তিনি লিখিত আপত্তি দেন। ওই আপত্তিতে আদালত ও বিচারক সম্পর্কে অবমাননাকর বক্তব্য থাকায় বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
আদালতের সেরেস্তাদার শরিফুল ইসলাম বলেন, আরএস রেকর্ড অনুযায়ী জমিটি ১৯৮২ সালে জেলা পরিষদ অধিগ্রহণ করে আদালতের নামে হস্তান্তর করে। এরপর থেকেই আদালত জমিটি ভোগদখলে রয়েছে। নিরাপত্তার স্বার্থেই সীমানা প্রাচীর নির্মাণ করা হচ্ছে।
সিরাজগঞ্জ গণপূর্ত বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. মাহমাদুল হাসান বলেন, প্রশাসনিক অনুমোদনের ভিত্তিতে নির্মাণকাজ শুরু হয়েছিল। জুন মাসে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের নির্দেশ পাওয়ার পর কাজটি সাময়িকভাবে বন্ধ রাখা হয়েছে। পুনরায় অনুমতি পেলে অবশিষ্ট কাজ শেষ করা হবে।
বাদীপক্ষের আইনজীবী অ্যাডভোকেট আলীমুল হক বলেন, এটি আদালতের জমি হওয়ায় নির্মাণকাজে ইউএনওর অনুমতির প্রয়োজন নেই। আদালতের আদেশ অমান্য করায় ইউএনওর বিরুদ্ধে আদালত অবমাননার মামলা করা হয়েছে।
অন্যদিকে বিবাদীপক্ষের আইনজীবী অ্যাডভোকেট আনোয়ার হোসেন বলেন, আপত্তি নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত নির্মাণকাজ বন্ধ রাখার আবেদন করা হয়েছিল। ইউএনও অসুস্থ থাকায় মেডিকেল সনদসহ সময় চাওয়া হলেও আদালত তা গ্রহণ করেননি।
এ বিষয়ে ইউএনও সাবরিনা শারমিন বলেন, বিষয়টি আদালতে বিচারাধীন। তাই এ বিষয়ে তাঁর কোনো মন্তব্য করার সুযোগ নেই।
এমএস/