দেশ টেলিভিশন লিমিটেড, কর্ণফুলী মিডিয়া পয়েন্ট, ৪২, শহীদ সাংবাদিক সেলিনা পারভীন সড়ক, মালিবাগ, ঢাকা-১২১৭, বাংলাদেশ।
টেলিফোন: +৮৮ (০২) ৮৩৩২৯৫৮, ৮৩৩২৯২২ ফ্যাক্স: +৮৮ (০২) ৮৩৩২৯৮১ মেইল: [email protected]

তৃতীয় শ্রেণির শিক্ষার্থী বাংলা পাঠ্যবই সাবলীলভাবে পড়তে পারছে না, চতুর্থ শ্রেণির শিশুরা পারছে না যোগ-বিয়োগ করতে, আর পঞ্চম শ্রেণিতে উঠেও থমকে যাচ্ছে সহজ ইংরেজি পাঠে। পাবনা জেলাজুড়ে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোতে শিক্ষার্থীদের এই চরম মৌলিক শিখন-দুর্বলতায় গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কার্যালয় (ডিপিইও)।
প্রাথমিক শিক্ষার গুণগত মানোন্নয়নে চালুকৃত ‘ফাউন্ডেশন লিটারেসি অ্যান্ড নিউমারেসি’ (এফএলএন) কর্মসূচির লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে ব্যর্থতার দায়ে চলতি সপ্তাহে জেলার ৯টি উপজেলার ৩৬৭টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক ও শিক্ষকদের কারণ দর্শানোর নোটিশ (শো কজ) দেওয়া হয়েছে।
জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কার্যালয় সূত্রে জানা যায়, শিক্ষার্থীদের মৌলিক শিখনফল জোরদার করতে এফএলএন কর্মসূচি চালু করা হয়েছিল। নিয়ম অনুযায়ী, তৃতীয় শ্রেণির সব শিক্ষার্থীকে বাংলা পাঠ্যবই সাবলীলভাবে পড়া, চতুর্থ শ্রেণির শিক্ষার্থীদের যোগ, বিয়োগ, গুণ ও ভাগে দক্ষতা অর্জন এবং পঞ্চম শ্রেণির শিক্ষার্থীদের ইংরেজি বই সাবলীলভাবে পড়তে পারার কথা।
তবে জুন মাসে পরিচালিত জেলাব্যাপী এক বিশেষ পরিদর্শনে উঠে আসে হতাশার চিত্র। ব্যাপক সহায়তার পরও জেলার ১ হাজার ১৩৬টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের মধ্যে অন্তত ৩০০-র বেশি স্কুলের শিক্ষার্থীরা এই ন্যূনতম মানদণ্ড পূরণে চরম ব্যর্থতার পরিচয় দিয়েছে। পরিদর্শনের পরপরই জেলা শিক্ষা অফিস প্রথমে ৯টি উপজেলার শিক্ষা কর্মকর্তাকে কারণ দর্শানোর নোটিশ দেয়। পরবর্তীতে তাঁদের মাধ্যমে চলতি সপ্তাহে সংশ্লিষ্ট ৩৬৭টি স্কুলের শিক্ষকদের কাছে ব্যাখ্যা তলব করে নোটিশ পাঠানো হয়। চলতি মাসের মধ্যেই শিক্ষকদের নোটিশের জবাব দিতে বলা হয়েছে।
উপজেলাভিত্তিক কারণ দর্শানোর নোটিশের চিত্র-
ডিপিইওর তথ্য অনুযায়ী, সবচেয়ে বেশি নোটিশ পাঠানো হয়েছে সাঁথিয়া উপজেলার ৭৪টি বিদ্যালয়ে। এ ছাড়া আটঘরিয়ায় ৫৯টি, পাবনা সদরে ৫৪টি, বেড়ায় ৫০টি, চাটমোহরে ৪৮টি, সুজানগরে ৪১টি, ঈশ্বরদীতে ২৩টি, ভাঙ্গুড়ায় ১১টি এবং ফরিদপুর উপজেলায় ৭টি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শোকজ নোটিশ দেওয়া হয়েছে। চলতি মাসের মধ্যেই শিক্ষকদের এই নোটিশের জবাব জমা দিতে বলা হয়েছে। শিক্ষকদের দাবি: সংকট শুধু পাঠদানে নয়-
হঠাৎ এমন ব্যাপক পরিসরে নোটিশ জারির পর ক্ষোভ ও উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন একাধিক প্রধান শিক্ষক। তাঁদের দাবি, শিক্ষার এই খারাপ ফলাফলের পেছনে কাঠামোগত দুর্বলতা, তীব্র শিক্ষক সংকট এবং অভিভাবকদের চরম উদাসীনতা দায়ী।
বেড়া উপজেলার দুর্গম চরাঞ্চলে অবস্থিত নাতিবপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মো. মনিরুজ্জামান বলেন, "আমার স্কুলে তিন শতাধিক শিক্ষার্থী, কিন্তু নতুন নিয়োগপ্রাপ্ত একজনসহ শিক্ষক আছেন মাত্র তিনজন। এত কম কর্মী দিয়ে প্রতিটি শিশুর ওপর আলাদা নজর দেওয়া অসম্ভব। চরাঞ্চলের অনেক অভিভাবক সন্তানদের স্কুলে পাঠানোর চেয়ে মাঠে কৃষিকাজে পাঠাতে পছন্দ করেন।"
একই উপজেলার নতুন মিরপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মো. মকবুল হোসেনের মতে, এফএলএন কর্মসূচির নির্ধারিত সময়সীমা শেষ হওয়ার আগেই এই তড়িঘড়ি মূল্যায়ন করা হয়েছে, যা যৌক্তিক নয়।
তবে এই শিখন-দুর্বলতা কেবল দুর্গম বা চরাঞ্চলেই সীমাবদ্ধ নয়, শহরের স্বনামধন্য স্কুলেও একই চিত্র দেখা গেছে। ঈশ্বরদী পৌরসভার ফতেহ মোহাম্মদপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ৬২৩ জন শিক্ষার্থীর বিপরীতে ১৬ জন শিক্ষক রয়েছেন, যা মানদণ্ড অনুযায়ী প্রায় নিখুঁত। কিন্তু এই স্কুলেও প্রাথমিক গণিতে ৫০ শতাংশের কম শিক্ষার্থী প্রয়োজনীয় মান অর্জন করতে পেরেছে।
বিদ্যালয়টির প্রধান শিক্ষক মো. রেজাউস সেলিম বলেন, "শুধু শিক্ষকদের নোটিশ দিয়ে শিক্ষার মান বাড়ানো যাবে না। অনেক অভিভাবকই সন্তান নিয়মিত স্কুলে গেল কি না, সে খবর রাখেন না। অভিভাবকদের সচেতনতা ও নিয়মিত উপস্থিতি ছাড়া এককভাবে শিক্ষকের পক্ষে কাঙ্ক্ষিত ফল আনা সম্ভব নয়।"
দায় এড়াতে পারেন না শিক্ষকেরা-
শিক্ষকদের এসব যুক্তি ও উদ্বেগের বিষয়ে পাবনা জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মো. আশরাফুল কবির বলেন, সরকার প্রাথমিক শিক্ষার মান বাড়াতে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিচ্ছে এবং এফএলএন সেই কর্মসূচির মূল কেন্দ্রবিন্দু। শিক্ষকদের সঙ্গে একাধিক বৈঠক করার পরও আশানুরূপ ফল মেলেনি।
তিনি স্পষ্ট জানান, সীমাবদ্ধতা যা-ই থাকুক, শিক্ষকেরা জবাবদিহিতা ও দায়িত্ব এড়াতে পারেন না। শিক্ষকদের দেওয়া লিখিত জবাব পাওয়ার পর পর্যালোচনা করে পরবর্তী প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়া হবে। আগামী দিনে শিক্ষার মূল্যায়ন কেবল যান্ত্রিক পঠনের বদলে শিক্ষার্থীর অনুধাবন বা বোঝার ক্ষমতার ওপর জোর দেবে বলে তিনি জানান।
পাবনা বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের অধ্যাপক ড. আব্দুল আলীম বলেন, উন্নত বিশ্বে প্রাথমিক শিক্ষায় সবচেয়ে গুরুত্ব দেয়া হয়। অতীতে বিশেষ করে গ্রামাঞ্চলে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলিই শিশুদের মৌলিক, নৈতিক শিক্ষার ভিত্তি তৈরি করেছে। কিন্তু বর্তমানে প্রাথমিক শিক্ষকদের বেতন ভাতা বৃদ্ধি, উচ্চ ডিগ্রিধারীদের নিয়োগ দিয়েও ক্রমাবনতি ঘটছে। এটি খুবই উদ্বেগের বিষয়। শিক্ষা বিভাগ, পরিবার,স্কুল কর্তৃপক্ষ সকলকেই দায়িত্বশীল ভূমিকা নিয়ে পরিস্থিতির উত্তরণ করতে হবে। অন্যথায় আমাদের জন্য ভবিষ্যতে ভয়াবহ প্রতিক্রিয়া অপেক্ষা করছে।
কেএম