দেশ টেলিভিশন লিমিটেড, কর্ণফুলী মিডিয়া পয়েন্ট, ৪২, শহীদ সাংবাদিক সেলিনা পারভীন সড়ক, মালিবাগ, ঢাকা-১২১৭, বাংলাদেশ।
টেলিফোন: +৮৮ (০২) ৮৩৩২৯৫৮, ৮৩৩২৯২২ ফ্যাক্স: +৮৮ (০২) ৮৩৩২৯৮১ মেইল: [email protected]

গাইবান্ধা ও বগুড়া অঞ্চলের ঐতিহ্যবাহী করতোয়া নদী পুনরুদ্ধারে ১ হাজার ১২২ কোটি টাকার ‘করতোয়া নদী সিস্টেম উন্নয়ন প্রকল্প’ অনুমোদন করেছে সরকার। তবে পরিবেশবাদী ও স্থানীয়দের দাবি, পুনঃখননের আগে নদীকে দখলমুক্ত করে স্বাভাবিক পানিপ্রবাহ নিশ্চিত না করলে প্রকল্পের সুফল মিলবে না।
জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) সভায় গত ১৬ জুন প্রকল্পটি অনুমোদন দেওয়া হয়। ২০৩০ সালের জুনের মধ্যে প্রকল্পের কাজ শেষ করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। প্রকল্পের আওতায় প্রায় ২৩০ কিলোমিটার নদীপথ পুনঃখনন, ২৪ হেক্টর ভূমি অধিগ্রহণ, ছয় কিলোমিটার স্লোপ সুরক্ষা, সাড়ে তিন কিলোমিটার নদীতীর সংরক্ষণ এবং প্রায় এক কিলোমিটার বাঁধ নির্মাণের পরিকল্পনা রয়েছে।
সরেজমিনে গাইবান্ধার গোবিন্দগঞ্জ উপজেলার খলসি চাঁদপুর এলাকায় গিয়ে দেখা যায়, করতোয়া নদীর উৎসমুখে নির্মিত জলকপাটের দক্ষিণ অংশে নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ অনেকটাই কমে গেছে। নদীর বিভিন্ন স্থানে পলি জমে চর সৃষ্টি হয়েছে এবং দুই তীরে গড়ে উঠেছে বসতবাড়ি ও বিভিন্ন স্থাপনা।
স্থানীয়দের ভাষ্য, ১৯৮৮ সালে বন্যা নিয়ন্ত্রণের উদ্দেশ্যে পানি উন্নয়ন বোর্ড করতোয়া ও কাটাখালী নদীর সংযোগস্থলে জলকপাট নির্মাণ করে। এরপর থেকেই নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ বাধাগ্রস্ত হতে থাকে। ভাটির দিকে প্রায় ১২৩ কিলোমিটার এলাকায় পানির প্রবাহ কমে যাওয়ায় নদী ভরাট, দখল ও দূষণের মাত্রা বেড়েছে।
খলসি চাঁদপুর এলাকার কৃষক রবিউল ইসলাম বলেন, ‘একসময় করতোয়া ছিল খরস্রোতা নদী। বড় বড় নৌকা চলত। এখন বর্ষাতেও অনেক জায়গায় হাঁটুপানি থাকে। নদীকে আগের অবস্থায় ফিরিয়ে আনতে হলে আগে দখলমুক্ত করতে হবে।’
স্থানীয় বাসিন্দা আনোয়ার মিয়া বলেন, ‘একসময় এই নদীপথে খুলনা থেকে নৌকায় বিভিন্ন পণ্য আসত। জলকপাট নির্মাণের পর নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ বন্ধ হয়ে যায়। এরপর থেকেই নদীটি ধীরে ধীরে প্রাণ হারাতে শুরু করে।’

স্থানীয়দের অভিযোগ, পানিপ্রবাহ কমে যাওয়ার সুযোগে গোবিন্দগঞ্জ, বগুড়া শহর, মহাস্থান, শিবগঞ্জ ও শাহজাহানপুরসহ বিভিন্ন এলাকায় নদীর তীর ও তলদেশ দখল করে স্থাপনা নির্মাণ করা হয়েছে। একই সঙ্গে বাজার ও শহরের ড্রেনের বর্জ্য নদীতে পড়ায় দূষণও বেড়েছে।
গাইবান্ধা সামাজিক আন্দোলনের নেতা অ্যাডভোকেট কাজী আমিনুল ইসলাম ফকু বলেন, ‘উৎস পরিবর্তনের পরও করতোয়া প্রাকৃতিকভাবে টিকে ছিল। কিন্তু পানি নিয়ন্ত্রণ কাঠামো, দখল, ভরাট ও দূষণের কারণে নদী এখন চরম সংকটে রয়েছে।’
পরিবেশ আন্দোলন গাইবান্ধার আহ্বায়ক ওয়াজিউর রহমান বলেন, ‘জলকপাট নির্মাণের পর নদীর উৎসমুখ ভরাট হতে শুরু করে। বর্তমানে দখল ও দূষণও বেড়েছে। ফলে অনেক স্থানে নদীর পাড়ে দাঁড়ানোও কঠিন হয়ে পড়েছে।’
এর আগে করতোয়া পুনরুদ্ধারে একাধিক প্রকল্প নেওয়া হলেও কাঙ্ক্ষিত ফল মেলেনি। ২০২৪ সালে প্রায় ৩৬ কোটি টাকা ব্যয়ে ১৭ কিলোমিটার নদীপথ পুনঃখনন, তীর সংরক্ষণ ও ওয়াকওয়ে নির্মাণ করা হলেও নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ পুরোপুরি ফিরিয়ে আনা সম্ভব হয়নি।
পানি উন্নয়ন বোর্ডের গাইবান্ধা কার্যালয়ের নির্বাহী প্রকৌশলী শরিফুল ইসলাম বলেন, ‘নতুন প্রকল্পের আওতায় গোবিন্দগঞ্জ থেকে বগুড়া পর্যন্ত কাজ করা হবে। পুনঃখননের মাধ্যমে করতোয়ার স্বাভাবিক প্রবাহ ফিরিয়ে আনা, নদীতীর সংরক্ষণ এবং দখল ও দূষণ প্রতিরোধের ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’
এমএম/