দেশ টেলিভিশন লিমিটেড, কর্ণফুলী মিডিয়া পয়েন্ট, ৪২, শহীদ সাংবাদিক সেলিনা পারভীন সড়ক, মালিবাগ, ঢাকা-১২১৭, বাংলাদেশ।
টেলিফোন: +৮৮ (০২) ৮৩৩২৯৫৮, ৮৩৩২৯২২ ফ্যাক্স: +৮৮ (০২) ৮৩৩২৯৮১ মেইল: [email protected]

নাব্যতা সংকটের কারণে কুড়িগ্রামের ওপর দিয়ে প্রবাহিত ব্রহ্মপুত্র, ধরলা, তিস্তা ও দুধকুমারসহ ছোট-বড় অন্তত ১৬টি নদ-নদী এখন প্রায় পানিশূন্য হয়ে পড়েছে। একসময় যে নদীগুলো ছিল এই অঞ্চলের প্রাণ ও জীবিকার প্রধান উৎস, আজ সেগুলো পরিণত হয়েছে বালুচর আর ফাটল ধরা স্মৃতিতে। নদীর পানি শুকিয়ে যাওয়ায় বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে নদীনির্ভর মানুষের জীবন-জীবিকা, একই সঙ্গে মারাত্মক হুমকির মুখে পড়েছে এলাকার জীববৈচিত্র্য ও পরিবেশের ভারসাম্য।
সরেজমিনে দেখা গেছে, ধরলা নদীর বুক এখন আর নদীর মতো নেই। অধিকাংশ জায়গায় শুকিয়ে গিয়ে তা বিস্তীর্ণ মাঠে পরিণত হয়েছে। নদীর বুকে জেগে ওঠা চরে কৃষকরা ধান, ভুট্টা ও নানা ধরনের সবজি চাষ করছেন। তবে এই চাষাবাদে স্বস্তির চেয়ে অনিশ্চয়তাই বেশি।
স্থানীয়রা জানান, নদী যে কোনো সময় আবার জেগে উঠতে পারে এবং মুহূর্তেই সব ফসল ভাসিয়ে নিয়ে যেতে পারে। একই চিত্র দেখা যাচ্ছে তিস্তা, দুধকুমারসহ অন্যান্য নদীতেও।
নদীতে পানি না থাকায় পুরোপুরি বন্ধ হয়ে গেছে নৌযান চলাচল। একসময় যে নদীপথ ছিল যোগাযোগের সহজ ও সাশ্রয়ী মাধ্যম, সেখানে এখন নৌকা ভাসানোর মতো পানিও নেই। এতে চরম সংকটে পড়েছেন মাঝি, জেলে, নৌকার মালিকসহ নদীঘেঁষা অসংখ্য মানুষ। জীবিকার পথ হারিয়ে অনেকেই পেশা পরিবর্তনে বাধ্য হচ্ছেন, কেউ কেউ পরিবার নিয়ে মানবেতর জীবনযাপন করছেন।
ধরলা নদীপাড়ের নৌকার মাঝি ভানু চন্দ্র বলেন, নদীতে একেবারে পানি নাই। নৌকা ঠিকমতো চালানো যায় না। আয়-রোজগার অনেক কমে গেছে। অন্য কাজও করতে পারছি না, সংসার চালানো খুব কষ্ট হয়ে গেছে।
নদী শুকিয়ে যাওয়ায় শুধু মানুষের জীবনই নয়, মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে মাছ, জলজ উদ্ভিদ, পাখিসহ নানা প্রজাতির জীববৈচিত্র্য। নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ নষ্ট হওয়ায় জলজ ইকোসিস্টেম ভেঙে পড়ছে বলে আশঙ্কা করছেন বিশেষজ্ঞরা।
পরিবেশ নিয়ে কাজ করা সুজন মোহন্ত বলেন, দীর্ঘদিন ধরে নদীগুলো খনন না করায় তলদেশ ভরাট হয়ে গেছে। বর্ষা মৌসুমে সামান্য পানির চাপও নদীগুলো নিতে পারে না। অনেক নদী প্রায় মৃত। পরিকল্পিত ও নিয়মিত খননের মাধ্যমেই এসব নদীকে বাঁচানো সম্ভব।
ধরলা নদীপাড়ের স্থানীয় বাসিন্দা মো. আবু সাঈদ বলেন, আমরা ছোটবেলায় দেখেছি ধরলা নদী পানিতে টইটম্বুর থাকত। এখন সেই নদী মরা গাঙে পরিণত হয়েছে। নদীর সৌন্দর্য হারিয়ে গেছে, নদীনির্ভর মানুষগুলো পেশা বদল করতে বাধ্য হয়েছে। নদীর প্রাণ ফেরাতে সরকারিভাবে কার্যকর উদ্যোগ প্রয়োজন।
কুড়িগ্রাম সরকারি কলেজের অধ্যক্ষ মির্জা নাসির উদ্দীন বলেন, নদী শুকিয়ে যাওয়ার ফলে বাতাসে ধুলিকণা উড়ে বায়ুদূষণ বাড়ছে। একই সঙ্গে নাব্যতা সংকট ও পানিশূন্যতার কারণে জলজ ইকোসিস্টেম মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে, যা পরিবেশের জন্য অত্যন্ত উদ্বেগজনক।
বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, দ্রুত নদীগুলোর পরিকল্পিত খনন কার্যক্রম শুরু করা জরুরি। নিয়মিত খননের মাধ্যমে নাব্যতা ফিরিয়ে আনা গেলে নদীর প্রাণ যেমন ফিরবে, তেমনি জলবায়ু পরিবর্তনের বিরূপ প্রভাবও অনেকাংশে কমানো সম্ভব হবে।
জে আই