দেশ টেলিভিশন লিমিটেড, কর্ণফুলী মিডিয়া পয়েন্ট, ৪২, শহীদ সাংবাদিক সেলিনা পারভীন সড়ক, মালিবাগ, ঢাকা-১২১৭, বাংলাদেশ।
টেলিফোন: +৮৮ (০২) ৮৩৩২৯৫৮, ৮৩৩২৯২২ ফ্যাক্স: +৮৮ (০২) ৮৩৩২৯৮১ মেইল: [email protected]

সাত উপজেলা নিয়ে গঠিত গাইবান্ধার পাঁচটি সংসদীয় আসন। দীর্ঘদিন ধরে আসনগুলো জাতীয় পার্টি ও আওয়ামী লীগের দখলে ছিল। তবে এবারের নির্বাচনে আসনগুলো দখল নিতে মরিয়া বিএনপি-জামায়াত। পিছিয়ে নেই অন্যান্য দলও।
এরই মধ্যে প্রার্থিতা ঘোষণা হয়েছে বিএনপি, জামায়াত ও জাতীয় পার্টির। এছাড়াও স্বতন্ত্রসহ বামপন্থী দলগুলোও তাদের প্রার্থীর নাম ঘোষণা করেছে।
তবে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে জেলার পাঁচটি আসনেই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছেন নারী ভোটাররা। আসনভিত্তিক ভোটার তালিকা বিশ্লেষণে নারী ভোটারের এ আধিপত্য স্পষ্টভাবে ফুটে উঠেছে।
প্রকাশিত তালিকায় দেখা যাচ্ছে, প্রতিটি আসনেই পুরুষের তুলনায় নারী ভোটারের সংখ্যা বেশি, যা জেলার রাজনৈতিক সমীকরণে নতুন মাত্রা যোগ করেছে।
ভোটার তালিকায় জেলার মোট ভোটার সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ২১ লাখ ৯০ হাজার ৪০০। এর মধ্যে পুরুষ ১০ লাখ ৮২ হাজার ৪১৬ আর নারী ভোটার ১১ লাখ ৭ হাজার ৯৪৮ জন। পুরুষের তুলনায় নারী ভোটার ২৫ হাজার ৫৩২ জন বেশি। এছাড়াও ৭টি উপজেলার তৃতীয় লিঙ্গের ভোটার রয়েছেন ৩৬ জন।
ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতার জন্য পাঁচটি সংসদীয় আসনে ৪৫ প্রার্থী মনোনয়নপত্র জমা দেন। তবে যাচাই-বাছাই শেষে ১৬ জনের মনোনয়নপত্র বাতিল ঘোষণা করেছে নির্বাচন কমিশন। জাতীয় পার্টির মহাসচিব ব্যারিস্টার শামীম হায়দার পাটোয়ারীসহ ২৯ প্রার্থীর মনোনয়নপত্র বৈধ ঘোষণা করা হয়েছে।
আসনভিত্তিক তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, গাইবান্ধা-১ আসনে ১৯৭৩-২০২৪ সাল পর্যন্ত ১২টি জাতীয় সংসদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগ (বর্তমানে কার্যক্রম নিষিদ্ধ) প্রার্থী দুবার, জাতীয় পার্টি (জাপা) ছয়বার, বিএনপি একবার, জামায়াত একবার, স্বতন্ত্র একবার ও মুসলিম লীগ-আইডিএল প্রার্থী একবার বিজয়ী হয়েছেন।
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে এ আসনে বিএনপির অধ্যাপক ডা. খন্দকার জিয়াউল হক জিয়া, জামায়াতে ইসলামীর মাজেদুর রহমান, জাতীয় পার্টির ব্যারিস্টার শামীম হায়দার পাটোয়ারী, এলডিপির শরিফুল ইসলাম, সমাজতান্ত্রিক দলের (মার্ক্সবাদী) পরমানন্দ দাস ও আমজনতা দলের কাওছর আজম হান্নুর প্রার্থিতা বৈধতা পেয়েছে।
আসনটিতে মোট ভোটার রয়েছেন ৪ লাখ ১৯ হাজার ১১১ জন। এর মধ্যে পুরুষ ২ লাখ ৭ হাজার ৫৭৪ ও নারী ভোটার ২ লাখ ১১ হাজার ৫৩৪ জন। নারী ভোটার বেশি ৩ হাজার ৯৬০ জন। এছাড়া তৃতীয় লিঙ্গের ভোটার রয়েছেন তিনজন।
গাইবান্ধা-২ আসনেও ১২টি জাতীয় সংসদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগ প্রার্থী ছয়বার, জাপা দুবার, বিএনপি একবার ও স্বতন্ত্র প্রার্থী তিনবার বিজয়ী হয়েছেন। এবারের নির্বাচনে বিএনপির আনিসুজ্জামান খান বাবু, জাতীয় পার্টির আব্দুর রশিদ সরকার, জামায়াতে ইসলামীর আব্দুল করিম, সমাজতান্ত্রিক দলের (মার্ক্সবাদী) আহসানুল হক ও জনতার দলের শাহেদুর রহমান প্রতিদ্বন্দ্বিতা করবেন। আসনটিতে ৪ লাখ ১১ হাজার ৪৬০ ভোটারের মধ্যে পুরুষ ২ লাখ ২ হাজার ৩৭ আর নারী ২ লাখ ৯ হাজার ৪১২ জন। নারী ভোটার ৭ হাজার ৩৭৫ জন বেশি। এছাড়া তৃতীয় লিঙ্গের ভোটার রয়েছেন ১১ জন।
পলাশবাড়ী-সাদুল্যাপুর উপজেলা নিয়ে গঠিত গাইবান্ধা-৩ আসনে বিগত ১২টি সংসদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগ প্রার্থী চারবার, জাপা ছয়বার ও বিএনপি প্রার্থী দুবার বিজয়ী হয়েছেন। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বৈধ প্রার্থীর মধ্যে রয়েছেন বিএনপির অধ্যাপক ডা. সৈয়দ মইনুল হাসান সাদিক, জামায়াতে ইসলামীর অধ্যক্ষ নজরুল ইসলাম লেবু, জাতীয় পার্টির মইনুর রাব্বি চৌধুরী, গণঅধিকার পরিষদের সুরুজ মিয়া, সিপিবির আব্দুল্লাহ আদিল, ইনসানিয়াত বিপ্লবী বাংলাদেশের মোছাদ্দিকুর রহমান ও ইসলামী আন্দোলনের এটিএম আওলাদ হোসাইন।
এ আসনে মোট ভোটার ৫ লাখ ৬ হাজার ১৮৫ জন। এর মধ্যে পুরুষ ২ লাখ ৪৮ হাজার ৯০২ ও নারী ২ লাখ ৫৭ হাজার ২৭৪ জন। পুরুষের তুলনায় নারী ভোটার বেশি ৮ হাজার ৩৭২ জন। তৃতীয় লিঙ্গের ভোটার রয়েছেন নয়জন।
গাইবান্ধা-৪ আসনে ১২টি জাতীয় নির্বাচনে আওয়ামী লীগ প্রার্থী চারবার, জাপা তিনবার, বিএনপি তিনবার ও স্বতন্ত্র প্রার্থী দুবার বিজয়ী হয়েছেন। এবারের নির্বাচনে বিএনপির মোহাম্মদ শামীম কায়সার লিংকন, জামায়াতে ইসলামীর ডা. আব্দুর রহিম সরকার, জাতীয় পার্টির কাজী মো. মশিউর রহমান, বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির আতিয়ারুল রহমান ও ইসলামী আন্দোলনের সৈয়দ তৌহিদুল ইসলাম তুহিন প্রতিদ্বন্দ্বিতা করবেন।
আসনটিতে ৪ লাখ ৬৮ হাজার ৩৮৪ ভোটারের মধ্যে পুরুষ ২ লাখ ৩১ হাজার ৬২৮ ও নারী ২ লাখ ৩৬ হাজার ৭৪৬ জন। আসনটিতে নারী ভোটার বেশি ৫ হাজার ১১৮ জন। এছাড়া তৃতীয় লিঙ্গের ভোটার রয়েছেন ১০ জন।
ফুলছড়ি ও সাঘাটা উপজেলা নিয়ে গঠিত গাইবান্ধা-৫ আসনে ১৯৭৩-২০২৪ সাল পর্যন্ত ১২টি নির্বাচনে আওয়ামী লীগ প্রার্থী পাঁচবার, জাপা পাঁচবার, বিএনপি একবার ও স্বতন্ত্র প্রার্থী একবার বিজয়ী হয়েছেন। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বৈধ প্রার্থী হিসেবে মাঠে রয়েছেন বিএনপির ফারুক আলম সরকার, জামায়াতে ইসলামীর আব্দুল ওয়ারেছ, জাতীয় পার্টির ব্যারিস্টার শামীম হায়দার পাটোয়ারী, ইসলামী আন্দোলনের আজিজুল ইসলাম, সমাজতান্ত্রিক মার্ক্সবাদী দলের রাহেলা খাতুন, নাহিদুজ্জামান নিশাদ ও এএইচএম গোলাম শহীদ রঞ্জু।
এ আসনে ভোটার সংখ্যা ৩ লাখ ৮৫ হাজার ২৬০। ১ লাখ ৯২ হাজার ২৭৫ জন পুরুষ ভোটারের বিপরীতে নারী ভোটার ১ লাখ ৯২ হাজার ৯৮২ জন। নারী-পুরুষ ভোটারের ব্যবধান সর্বনিম্ন; নারী ভোটার মাত্র ৭০৭ জন বেশি। এছাড়া তৃতীয় লিঙ্গের ভোটার রয়েছেন তিনজন।
রাজনীতি বিশ্লেষকরা বলছেন, জেলার পাঁচটি আসনে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছেন নারী ভোটাররা। নির্বাচনী মাঠে তাদের মনোযোগ আকর্ষণই প্রার্থী ও দলগুলোর অন্যতম কৌশল হয়ে উঠছে। শিক্ষা, স্বাস্থ্য, নিরাপত্তা, অর্থনৈতিক সুযোগসহ নারীবান্ধব ইস্যুগুলো প্রতিশ্রুতির কেন্দ্রে অবস্থান করছে। গাইবান্ধার রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নির্ধারণে নারী ভোটারই হতে পারেন মুখ্য নিয়ামক।
এ বিষয়ে বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা গণ উন্নয়ন কেন্দ্রের প্রধান নির্বাহী এম আব্দুস সালাম বলেন, ‘আমার কাছে যেটা মনে হয়, নারী ভোটার বেশি; তার মানে ভোটে তারা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা অবশ্যই রাখতে পারেন। কিন্তু ভোটের ক্ষেত্রে নারীদের ওপর নির্ভরশীল হওয়ার প্রবণতা দেখা যায়। এজন্য নারী ভোটারদের সচেতনতা বাড়ানো দরকার। যারা নারী অধিকার আদায়ে এবং কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করে আয়মূলক কাজে সম্পৃক্ত করার নিশ্চয়তা দেবে, আমার মনে হয় তাদেরই বেছে নেয়া উচিত। নারীদের কর্মক্ষেত্রের সুযোগ অনেক কম, এজন্য পরিবারগুলোতে আয়ের পরিমাণও কম। নারীরা যদি কর্মক্ষেত্র ও সম্মানজনক পরিবেশের নিশ্চয়তা পান, তাহলে তারা সেভাবে চিন্তা করেই ভোট দেবেন।’
এবি/