দেশ টেলিভিশন লিমিটেড, কর্ণফুলী মিডিয়া পয়েন্ট, ৪২, শহীদ সাংবাদিক সেলিনা পারভীন সড়ক, মালিবাগ, ঢাকা-১২১৭, বাংলাদেশ।
টেলিফোন: +৮৮ (০২) ৮৩৩২৯৫৮, ৮৩৩২৯২২ ফ্যাক্স: +৮৮ (০২) ৮৩৩২৯৮১ মেইল: [email protected]

শরীয়তপুরে অপহরণের পর শিশু শিক্ষার্থী হৃদয় খান নিবিরকে (১১) হত্যার ঘটনায় দুই আসামিকে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছেন আদালত। একই মামলায় অপর এক কিশোর আসামিকে ২১ বছরের আটকাদেশ দেওয়া হয়েছে।
মঙ্গলবার (১৩ জানুয়ারি) দুপুরে শরীয়তপুর নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালের বিচারক শেখ হাফিজুর রহমান এ রায় ঘোষণা করেন।
মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত দুই আসামি হলেন- শরীয়তপুর সদর উপজেলার খিলগাঁও এলাকার শাকিল হোসেন গাজী (১৯) এবং পাবনার সিংগা এলাকার সিয়াম হোসেন (২০)। অপর ১৬ বছর বয়সী কিশোর আসামির বিচার হয় শিশু আদালতে। তাকে তিনটি ধারায় মোট ২১ বছরের আটকাদেশ দেওয়া হয়েছে।
আদালত সূত্রে জানা যায়, হৃদয় খান নিবির শরীয়তপুর সদর উপজেলার খিলগাঁও এলাকার মনির খানের ছেলে এবং শিশুকানন কিন্ডারগার্টেনের পঞ্চম শ্রেণির শিক্ষার্থী ছিল। ২০২৩ সালের ৩১ জুলাই হৃদয় নিখোঁজ হলে পরিবারের পক্ষ থেকে পালং মডেল থানায় একটি সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করা হয়। ওই রাতেই হৃদয়ের মায়ের মোবাইলে ফোন করে অপহরণকারীরা জানায়, শিশুটিকে মুক্তি দিতে হলে ১০ লাখ টাকা মুক্তিপণ দিতে হবে।
পুলিশ মুক্তিপণ চাওয়া মোবাইল নম্বরের সূত্র ধরে ওই রাতেই শাকিল, সিয়াম ও এক কিশোরকে আটক করে। তাদের স্বীকারোক্তি অনুযায়ী, পরদিন ১ আগস্ট খিলগাঁও এলাকার একটি ইটভাটা থেকে মাটিচাপা দেওয়া অবস্থায় হৃদয়ের লাশ উদ্ধার করা হয়। পরে আদালতে আসামিরা স্বীকার করেন, তারা হৃদয়কে শ্বাসরোধ করে হত্যা করেন। মামলাটি প্রথমে পালং মডেল থানার একজন কর্মকর্তা তদন্ত করেন। পরে তদন্তের দায়িত্ব নেয় পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই)। দীর্ঘ তদন্ত শেষে ২০২৪ সালের ১ জুন আদালতে অভিযোগপত্র দাখিল করা হয়।
মামলায় সাক্ষ্যপ্রমাণ ও স্বীকারোক্তির ভিত্তিতে আদালত দুই আসামিকে মৃত্যুদণ্ড এবং কিশোর আসামিকে ৩ টি ধারায় ২১ বছরের আটকাদেশ দেন। রায় ঘোষণার পর আসামিদের আদালত কাস্টডিতে নেওয়ার সময় স্থানীয় কিছু লোকজন পুলিশের কাছ থেকে আসামিদের ছিনিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করে। তবে পুলিশ দ্রুত পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে এনে আসামিদের নিরাপদে সরিয়ে নেয়। রায় ঘোষণার সময় আদালতে উপস্থিত ছিলেন নিহত হৃদয়ের মা নিপা আক্তার বাবা মনির খান সহ-স্বজন ও স্থানীয়রা।
কান্নাজড়িত কণ্ঠে নিপা আক্তার বলেন, টাকার জন্য ওরা আমার ছেলেকে মেরে ফেলেছে। আড়াই বছর ধরে আমি ছেলের জন্য হাহাকার করছি। এক রাতও শান্তিতে ঘুমাতে পারিনি। যে কিশোরকে শিশু বলা হয়েছে, সে-ই মূল পরিকল্পনাকারী ছিল। তার শাস্তিতে আমরা সন্তুষ্ট নই। রাষ্ট্রের কাছে আমার আবেদন, আসামিরা যেন উচ্চ আদালতে গিয়ে কোনোভাবেই খালাস না পায় এবং দ্রুত রায় কার্যকর করা হয়।
এ বিষয়ে বাদীপক্ষের আইনজীবী আজিজুর রহমান রোকন বলেন, বিজ্ঞ আদালত যে রায় দিয়েছেন তাতে আমরা সন্তুষ্ট। তবে যাকে আটকাদেশ দেওয়া হয়েছে, তার বিষয়ে পরিবারের সঙ্গে আলোচনা করে পরবর্তী সময়ে আপিল করা হবে কি না সে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে। পাশাপাশি তিনি এ রায় দ্রুত কার্যকরের দাবি জানান।
আসামিপক্ষের আইনজীবী অ্যাডভোকেট ইশতিয়াক আহমেদ বলেন, এই মামলার রায়ে আমরা সংখুদ্ধ।মামলার প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ আলামত (এভিডেন্স) টেম্পারিং করা হয়েছে। শুধুমাত্র ১৬৪ ধারার জবানবন্দির ভিত্তিতে মামলাটি বিচারে নেওয়া হয়েছে। বাদীপক্ষ নারাজি দিলেও তা রহস্যজনকভাবে গুরুত্ব পায়নি। মামলার মূল আসামি শাওন চৌকিদারকে পরিকল্পিতভাবে সাক্ষ্যপ্রমাণের বাইরে রাখা হয়েছে। যারা প্রকৃত অপরাধী নয়, তাদেরই বেশি শাস্তি দেওয়া হয়েছে।
তিনি আরও বলেন, এ মামলায় কোনো ডিজিটাল ও ফরেনসিক ইভিডেন্স নেই, কোনো প্রত্যক্ষদর্শীও নেই। ২১ জন সাক্ষীর কেউই ঘটনাটি চোখে দেখেননি। এরপরও এক ও দুই নম্বর আসামিকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়ায় আমরা গভীরভাবে হতাশ। রায়ের বিরুদ্ধে আমাদের মক্কেলদের আপত্তি রয়েছে এবং এ বিষয়ে আমরা উচ্চ আদালতে আপিল করব।
রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী (পিপি) কামরুল হাসান বলেন, দুই আসামির বিচার হয়েছে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আদালতে এবং একজনের বিচার হয়েছে শিশু আদালতে। রাষ্ট্রপক্ষ সর্বোচ্চ শাস্তির আবেদন করেছিল। আদালতের রায়ে আমরা সন্তুষ্ট।
আরএ