দেশ টেলিভিশন লিমিটেড, কর্ণফুলী মিডিয়া পয়েন্ট, ৪২, শহীদ সাংবাদিক সেলিনা পারভীন সড়ক, মালিবাগ, ঢাকা-১২১৭, বাংলাদেশ।
টেলিফোন: +৮৮ (০২) ৮৩৩২৯৫৮, ৮৩৩২৯২২ ফ্যাক্স: +৮৮ (০২) ৮৩৩২৯৮১ মেইল: [email protected]

উত্তরের সীমান্তবর্তী জেলা নওগাঁর ওপর দিয়ে বয়ে যাচ্ছে মাঝারি শৈত্যপ্রবাহ। তাপমাত্রা নেমে এসেছে ৬ দশমিক ৭ ডিগ্রি সেলসিয়াসে—যা চলতি মৌসুমের সর্বনিম্ন। হিমেল হাওয়া ও ঘন কুয়াশায় বিপর্যস্ত জনজীবনের পাশাপাশি বাড়ছে স্বাস্থ্যঝুঁকি। সবচেয়ে বেশি ভোগান্তিতে পড়েছে শিশু, বয়স্ক ও খেটে খাওয়া মানুষ। একই সঙ্গে প্রচণ্ড শীত ও কুয়াশায় কৃষি খাতেও দেখা দিয়েছে ব্যাপক ক্ষতির আশঙ্কা।
নওগাঁর বদলগাছী কৃষি ও আবহাওয়া পর্যবেক্ষণাগারের তথ্য অনুযায়ী, বুধবার (৭ জানুয়ারি) সকাল ৯টা পর্যন্ত জেলায় সর্বনিম্ন তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয়েছে ৬ দশমিক ৭ ডিগ্রি সেলসিয়াস। আগের দিন তাপমাত্রা ছিল ১১ ডিগ্রি সেলসিয়াস। মাত্র ২৪ ঘণ্টার ব্যবধানে তাপমাত্রা প্রায় সাড়ে চার ডিগ্রি কমে যাওয়ায় শীতের তীব্রতা বেড়েছে কয়েকগুণ।
সরেজমিনে দেখা যায়, ঘন কুয়াশা ও উত্তরের হিমেল বাতাসে সকাল পর্যন্ত ঢাকা থাকছে চারপাশ। দিনের বেলাতেও অনেক সময় সূর্যের দেখা মিলছে না। কুয়াশার কারণে ছোট ও মাঝারি যানবাহনগুলোকে হেডলাইট জ্বালিয়ে চলাচল করতে হচ্ছে। তীব্র শীতে সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে পড়েছে শিশু ও বয়স্করা।
চিকিৎসকরা জানান, শীতজনিত কারণে জ্বর, সর্দি-কাশি, নিউমোনিয়া, শ্বাসকষ্ট ও হাঁপানির রোগীর সংখ্যা বাড়ছে। বিশেষ করে বয়স্ক ও শিশুদের ক্ষেত্রে নিউমোনিয়ার ঝুঁকি বেশি দেখা দিচ্ছে। শীতের কারণে অনেক শিশু স্কুলে যেতে পারছে না, বয়স্করা ঘর থেকে বের হতে পারছেন না।
শহরের চকবাড়িয়া এলাকার রিকশাচালক মজিদ বলেন, “শীতে শরীর অবশ হয়ে আসে। মানুষ কম বের হওয়ায় আয় নেই। তবুও পরিবার চালাতে বাধ্য হয়ে রিকশা চালাচ্ছি।”
দিনমজুর আব্দুল জলিল বলেন, “ভোরে কাজে বের হতে পারছি না। শীতের কারণে কাজ কমে গেছে, সংসার চালানো খুব কষ্ট হয়ে যাচ্ছে।”
জেলা ত্রাণ ও পুনর্বাসন কর্মকর্তা আশিকুর রহমান জানান, জেলা ও উপজেলা প্রশাসনের মাধ্যমে এখন পর্যন্ত প্রায় ৩০ হাজার ৬০০ পিস কম্বল বিতরণ করা হয়েছে। আরও প্রায় ১ লাখ ১০ হাজার পিস কম্বল বরাদ্দ চাওয়া হয়েছে। শীতের তীব্রতা বাড়লে বিতরণ কার্যক্রম আরও জোরদার করা হবে বলে জানান তিনি।
শীতের প্রভাব পড়েছে জেলার প্রধান অর্থনৈতিক খাত কৃষিতেও। জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বোরো মৌসুমে নওগাঁ জেলায় ১ লাখ ৯২ হাজার ৩৮০ হেক্টর জমিতে বোরো ধান আবাদ লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। এজন্য ৯ হাজার ৪৩০ হেক্টর জমিতে বীজতলা তৈরির পরিকল্পনা নেওয়া হয়। ইতোমধ্যে ৯ হাজার ২৭০ হেক্টর জমিতে বীজতলা তৈরি সম্পন্ন হয়েছে।
কৃষকেরা জানান, প্রচণ্ড শীত ও দীর্ঘস্থায়ী কুয়াশার কারণে বোরো বীজতলায় ‘কোল্ড ইনজুরি’ দেখা দিয়েছে। এতে চারা হলুদ বা লালচে হয়ে পচে যাচ্ছে। চারা রক্ষায় পলিথিন দিয়ে বীজতলা ঢেকে রাখা হচ্ছে।
মান্দা উপজেলার গনেশপুর গ্রামের কৃষক কাজী আবুল কাসেম বলেন, “শীত আর কুয়াশা এত বেশি যে- বীজতলা খোলা রাখলে সব নষ্ট হয়ে যেত। পলিথিন দিয়ে ঢেকে রাখার পরও অর্ধেক চারা নষ্ট হয়ে গেছে।”
নওগাঁ সদর উপজেলার সরাইল গ্রামের কৃষক আব্দুল মতিন বলেন, “ঘন কুয়াশায় বীজতলার প্রায় ৮০ শতাংশ চারা নষ্ট হয়ে গেছে। ছত্রাকনাশক স্প্রে করেও কোনো লাভ হচ্ছে না। নতুন করে চারা লাগালে সময় ও আবহাওয়ার কারণে এবার ইরি ধান আবাদ সম্ভব হবে না।”
এ বিষয়ে জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক কৃষিবিদ হুমায়রা মন্ডল বলেন, “এখন পর্যন্ত যে পরিমাণ ক্ষতি হয়েছে, তা কাটিয়ে ওঠা সম্ভব। কারণ অধিকাংশ কৃষক প্রয়োজনের তুলনায় কিছুটা অতিরিক্ত বীজতলা তৈরি করে থাকেন।”
তিনি আরও বলেন, “কোল্ড ইনজুরি থেকে বীজতলা রক্ষায় পলিথিন দিয়ে ঢেকে রাখা, রাতের বেলায় হালকা পানি দেওয়া এবং প্রয়োজন অনুযায়ী ছত্রাকনাশক স্প্রে করার পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে।”
আরএ