দেশ টেলিভিশন লিমিটেড, কর্ণফুলী মিডিয়া পয়েন্ট, ৪২, শহীদ সাংবাদিক সেলিনা পারভীন সড়ক, মালিবাগ, ঢাকা-১২১৭, বাংলাদেশ।
টেলিফোন: +৮৮ (০২) ৮৩৩২৯৫৮, ৮৩৩২৯২২ ফ্যাক্স: +৮৮ (০২) ৮৩৩২৯৮১ মেইল: [email protected]

রাজধানীর জিগাতলার একটি ছাত্রী হোস্টেলের নিরিবিলি কক্ষ থেকে জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) এক নেত্রীর ঝুলন্ত মরদেহ উদ্ধারের ঘটনা শুধু একটি মৃত্যুই নয় এটি জন্ম দিয়েছে বহু প্রশ্ন, সন্দেহ ও বিতর্কের। ৩০ বছর বয়সী জান্নাত আরা রুমি কি সত্যিই আত্মহত্যা করেছেন, নাকি দীর্ঘদিনের হুমকি, সাইবার বুলিং ও রাজনৈতিক প্রতিহিংসার শিকার হয়ে প্রাণ হারিয়েছেন এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজছে পরিবার, সহকর্মী এবং স্বজনরা।
বৃহস্পতিবার (১৮ ডিসেম্বর) সকালে রাজধানীর জিগাতলার একটি ছাত্রী হোস্টেল থেকে ধানমন্ডি থানা এনসিপির যুগ্ম সমন্বয়কারী জান্নাত আরা রুমির মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। পুলিশ জানায়, হোস্টেলের কক্ষটি ভেতর থেকে বন্ধ ছিল। ডাকাডাকি করেও সাড়া না পেয়ে দরজা ভেঙে ভেতরে ঢুকে সিলিং ফ্যানের সঙ্গে ওড়না প্যাঁচানো অবস্থায় মরদেহ উদ্ধার করা হয়।
মরদেহটি পরে ময়নাতদন্তের জন্য ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মর্গে পাঠানো হয়।
জান্নাত আরা রুমি নওগাঁর পত্নীতলা উপজেলার নজিপুর পৌরসভার বাসস্ট্যান্ড এলাকার বাসিন্দা। চার ভাইবোনের মধ্যে তিনি দ্বিতীয়। সবার বড় ভাই মিনহাজ হোসেন এবং তার আরও দুই ছোট বোন রয়েছে, যারা নওগাঁয় পড়াশোনা করছে।
রুমি দীর্ঘদিন ঢাকায় একটি বেসরকারি ক্লিনিকে নার্স হিসেবে কর্মরত ছিলেন। পাশাপাশি সক্রিয়ভাবে যুক্ত ছিলেন জাতীয় নাগরিক পার্টির রাজনীতিতে। ধানমন্ডি থানা ইউনিটে যুগ্ম সমন্বয়কারীর দায়িত্ব পালন করছিলেন তিনি।
পারিবারিক সূত্র জানায়, নওগাঁ সদর উপজেলার সাপাহার এলাকার বিপ্লব নামের এক যুবকের সঙ্গে রুমির বিয়ে হয়েছিল। তবে দাম্পত্য জীবনে নির্যাতনের শিকার হয়ে প্রায় ছয় মাস আগে সেই সম্পর্ক ছিন্ন করেন তিনি। এরপর একাই ঢাকায় বসবাস করছিলেন।
পরিবারের দাবি, দাম্পত্য জটিলতা পেরিয়ে রুমি আবার স্বাভাবিক ও দৃঢ় জীবনযাপনে ফিরছিলেন। আত্মহত্যার মতো কোনো মানসিক দুর্বলতার কথা পরিবার বা ঘনিষ্ঠ কেউই জানতেন না।
নিহতের বাবা জাকির হোসেন মুঠোফোনে বলেন, আজ সকাল ৯টার দিকে মেয়ের মৃত্যুর খবর পাই। আমি এখন ঢাকার পথে। আমার মেয়ে আত্মহত্যা করতে পারে না। রাজনৈতিক কারণে নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের লোকজন দীর্ঘদিন ধরে তাকে হুমকি দিয়ে আসছিল। ফেসবুকে তাকে মানসিকভাবে শেষ করে দেওয়ার চেষ্টা চলছিল। এটা আত্মহত্যা নয়, এটা পরিকল্পিত হত্যা।
তিনি আরও বলেন, আমি এর সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ তদন্ত চাই। যারা আমার মেয়েকে এ অবস্থায় নিয়ে গেছে, তাদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি চাই।
নিহতের বড় ভাই মিনহাজ হোসেন বলেন, রুমি মানসিকভাবে খুব শক্ত ছিল। আমাদের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ করত। কোনো হতাশা বা আত্মহত্যার ইঙ্গিত সে কখনো দেয়নি। বরং সে বলত হুমকিকে ভয় পেলে রাজনীতি করা যায় না। তাহলে হঠাৎ করে কী এমন ঘটল?
নিহতের প্রতিবেশী মাসুদ রানা বলেন, রুমি ছোটবেলা থেকেই প্রতিবাদী ছিল। অন্যায়ের সঙ্গে কখনো আপস করত না। এমন একজন মেয়ে আত্মহত্যা করবে, এটা বিশ্বাস করা কঠিন।
স্থানীয় বাসিন্দা কুরাইশ জানান, রাজনীতিতে যুক্ত হওয়ার পর থেকেই রুমি নানা হুমকির কথা বলত। বিশেষ করে সাম্প্রতিক সময়ে সে আতঙ্কে ছিল।
এনসিপির কেন্দ্রীয় যুগ্ম সদস্যসচিব তারেক রেজা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক পোস্টে দাবি করেন, গত মাসে ধানমন্ডি ৩২ নম্বরে রাজনৈতিক কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের একজন কর্মীকে পুলিশের হাতে তুলে দেওয়ার ঘটনায় রুমির বিরুদ্ধে সংগঠিতভাবে সাইবার বুলিং, ধর্ষণ ও হত্যার হুমকি দেওয়া হচ্ছিল।
তারেক রেজা লেখেন, আমরা এটিকে আত্মহত্যা হিসেবে দেখতে রাজি নই। এটি খুন। যারা আমার বোনের জীবন তছনছ করেছে, তাদের আমরা ছাড় দেব না।
হাজারীবাগ থানার ওসি মো. হাফিজুর রহমান বলেন, ময়নাতদন্ত প্রতিবেদন পাওয়ার পর মৃত্যুর প্রকৃত কারণ নিশ্চিত হওয়া যাবে। সব দিক বিবেচনায় নিয়ে তদন্ত চলছে।
রুমির মৃত্যুর খবরে নজিপুরসহ পুরো পত্নীতলা উপজেলায় শোকের ছায়া নেমে এসেছে। পরিবার ও দলীয় নেতাকর্মীদের একটাই দাবি নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে সত্য উদঘাটন এবং দোষীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি।
জে আই