দেশ টেলিভিশন লিমিটেড, কর্ণফুলী মিডিয়া পয়েন্ট, ৪২, শহীদ সাংবাদিক সেলিনা পারভীন সড়ক, মালিবাগ, ঢাকা-১২১৭, বাংলাদেশ।
টেলিফোন: +৮৮ (০২) ৮৩৩২৯৫৮, ৮৩৩২৯২২ ফ্যাক্স: +৮৮ (০২) ৮৩৩২৯৮১ মেইল: [email protected]

টাঙ্গাইলের বাসাইল থানার বেতার অপারেটর শামছুল হকের দায়িত্ব শুধু ভেতরের কাজেই সীমাবদ্ধ থাকা। কিন্তু বাস্তবে তিনি নিয়মিত আসামি ধরতে যাওয়া, মামলা তদবির করা থেকে শুরু করে নানা প্রভাব খাটাচ্ছেন সর্বত্রই। পুলিশের পদমর্যাদা না থাকলেও সাধারণ মানুষের কাছ থেকে অনৈতিক সুবিধা আদায় করা এখন তার নিত্যকার অভ্যাস। এসব কর্মকান্ডে স্থানীয়দের মারধরের শিকারও হয়েছিলেন তিনি। শুধু তাই নয়, থানার ওসির বাড়ি আর শামছুলের বাড়ি একই জেলায় হওয়ায় তার পরিচিতি তৈরি হয়েছে ‘ওসি টু’ হিসেবে। ফলে থানায় আগত সেবা প্রার্থীরা মনে করেন, শামছুলই যেন ওসির প্রতিনিধি।
গত ৪ সেপ্টেম্বর প্রশাসনিকভাবে চট্টগ্রাম রেঞ্জে বদলী (পার্বত্য অঞ্চল) হলেও সে বহাল তবিয়তে থানায় কাজ চালিয়ে যাচ্ছেন। বদলি হওয়ার পরও একই জায়গায় দায়িত্ব পালন করায় প্রশ্ন তুলেছেন স্থানীয়রা।
পুলিশ হেডকোয়ার্টার্সের এআইজি (পার্সোনেল ম্যানেজমেন্ট-৩) মো. জামিরুল ইসলাম স্বাক্ষরিত বদলি আদেশের চিঠিতে বলা হয়, উল্লেখিত পুলিশ সদস্যগণকে বদলিকৃত কর্মস্থলে যোগদানের নিমিত্তে আগামী ৭ সেপ্টেম্বরের মধ্যে ছাড়পত্র প্রদান করার জন্য অনুরোধ করা হল। অন্যথায় ৮ সেপ্টেম্বর হতে তাৎক্ষনিক অবমুক্ত (স্ট্যান্ড রিলিজ) হয়েছেন মর্মে গণ্য হবেন। এরপরও অদ্যবধি তিনি স্বপদে বহাল রয়েছেন।
অভিযোগ উঠেছে, বদলির আদেশ হলেও এখনও সেই থানাতেই বহাল তবিয়তে কাজ চালিয়ে যাচ্ছেন শামছুল। তবে একা নন তিনি। এরসাথে থানার এসআই, এএসআইসহ কয়েকজন পুলিশ সদস্যও শামছুলের সঙ্গে যোগসাজশে এসব কর্মকাণ্ডে জড়িত বলে অভিযোগ উঠেছে। ফলে থানার ভেতরে গড়ে উঠেছে এক প্রভাবশালী চক্র, যারা প্রভাব খাটিয়ে আইনকানুনকে পাশ কাটিয়ে যাচ্ছে বলে অভিযোগ স্থানীয়দের।
সরেজমিনে গিয়ে জানা গেছে, বাসাইল থানার উপপরিদর্শক (এসআই) মঞ্জুরুল ইসলাম, এএসআই মনিরুল, এএসআই সাখাওয়াতের সাথে নিয়মিত ওয়ারেন্টের আসামী, মামলা ও থানার কার্যক্রমে অংশগ্রহণ করে বেতার অপারেটর শামছুল। উপজেলার হাবলা এলাকার মাদক ব্যবসায়ী রিপনকে আটক করা হয়। এসময় রিপনের কাছ থেকে পোসপোর্ট জব্দ করেন শামছুল। ৫০ হাজার টাকা না দেয়ায় এখনও রিপনের পাসপোর্টটি শামছুলের কাছেই রয়েছে। শাকিল নামের অটোরিকশা চালক মাদকের দায়ে পরপর চারবার আটক করা হয়েছিল। তৃতীয়বার আটকের সময় ঘুষের টাকা দিতে তাকে অটোরিকশাটি বিক্রি করতে হয়েছে। গত রমজান মাসে উপজেলার কালিয়া এলাকায় সিভিল বেশে অভিযানে গিয়ে মাদক ব্যবসায়ী হিমেলকে আটকের সময় স্থানীয়দের হাতে মারধরের শিকার হয় বেতার অপারেটর শামছুল হক। এছাড়াও বন্নী এলাকার সজিব নামের একজনের পুলিশ ক্লিয়ারেন্স সার্টিফিকেটের জন্য ঘুষের টাকা না দেয়ায় তার সাথে খারাপ আচরণ করা হয়। পরে সজিব শামছুলকে ২ হাজার টাকা দিয়ে সার্টিফিকেট সংগ্রহ করে।
থানা সূত্রে জানা গেছে, বর্তমান বাসাইল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) জালাল উদ্দিনের সঙ্গে শামছুলের ব্যক্তিগত পরিচয় রয়েছে। ওসির বাড়ি আর শামছুলের বাড়ি একই জেলায় হওয়ায় বিশেষ সুবিধা পান তিনি। এই কারণে থানায় তাকে অনেকেই "ওসি টু" নামেই ডাকেন।
স্থানীয়রা জানান, বেতার অপারেটর শামছুল নিয়মিত মাঠে যান। মামলা সংক্রান্ত কাজে তিনি অনেক সময় পুলিশের দায়িত্বশীল কর্মকর্তাদের থেকেও বেশি প্রভাব খাটান। অভিযোগ রয়েছে, মামলার আসামি কিংবা অভিযোগকারীদের কাছ থেকে তিনি নিয়মিত অর্থ আদায় করেন। অনেকে মন্তব্য করেছেন, শামছুল থানার অঘোষিত ওসি।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন ভুক্তভোগী বলেন, মামলা নিয়ে থানায় গেলে প্রথমেই শামছুলের মুখোমুখি হতে হয়। তিনি কাগজপত্র দেখেন, কাকে কী করতে হবে তা বলে দেন। পরে বুঝিয়ে নিতে হয় সুবিধা। অথচ পরে জানতে পারি তিনি তো পুলিশই নন।
রিপনের স্ত্রী শিউলি জানান, যতবারই আটক হয়েছে ততবারই টাকা দিতে হয়েছে। সর্বশেষ পাসপোর্টটাও দিচ্ছে না তার। শামছুল অনেক টাকা চায় পাসপোর্টের জন্য। টাকা নাই বিধায় পাসপোর্ট নিতে পারছি না।
পুলিশের ভয়ে কথা বলতে চান না শাকিলের স্ত্রী। তবে তার এলাকার অনেকেই বলেন, কয়েকদিন পরপরই তাকে আটক করে। সর্বশেষ পুলিশকে টাকা দিতে তার অটোরিকশা বিক্রি করতে হয়েছে।
সব অভিযোগ অস্বীকার করে অভিযুক্ত বেতার অপারেটর শামছুল হক বলেন, ওসি স্যার বাইরে মামলার কাজে পাঠালে যেতে তো হবেই। বদলি হয়েছি তবে ওসি স্যার না ছাড়ার কারণে অন্যত্র যোগদান করা হয়নি।
জেলা পুলিশের কর্মকর্তারা জানান, থানার ভেতরে এ ধরনের কর্মকাণ্ড প্রশাসনিক নিয়মবিরোধী। একজন অপারেটরের মাঠে গিয়ে আসামি বা মামলার কাজে যুক্ত হওয়ার কোনো এখতিয়ার নেই। এটি পুলিশের ভাবমূর্তি ক্ষুন্ন করছে।
জেলা বেতারের ওসি এএসআই শফিক বলেন, শামছুলকে বদলি করা হয়েছে হেডকোয়ার্টার্স থেকে। তাকে ছাড়পত্র দেওয়ার জন্য বলা হয়েছে। তার বিরুদ্ধে উঠা অভিযোগের বিষয়ে কিছুই জানি না।
বাসাইল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) জালাল উদ্দিন বলেন, থানার অন্য কোনো বেতার অপারেটর নাই। অন্য অপারেটরকে মেশিনসহ অপারেটনের সমস্ত কিছু বুঝিয়ে দিয়ে তাকে থানা ত্যাগ করতে হবে। তাকে ছাড়পত্র দেওয়ার কিছু নেই কারণ সেতো আমার থাকার কেউ না। শামছুল থানার কেউ না হলে তাকে কেন মামলা বা অন্য বিষয়ে মাঠে পাঠানো হয় এমন প্রশ্নে ওসি জালাল বলেন, সে থানার কেউ না হলেও পুলিশের টেলিকম শাখার সদস্য, সুতরাং সে পুলিশ। থানায় লোকবল বা পুলিশের সংকটের কারণে তাকে বাইরে পাঠানো হয়।
এফএইচ/