দেশ টেলিভিশন লিমিটেড, কর্ণফুলী মিডিয়া পয়েন্ট, ৪২, শহীদ সাংবাদিক সেলিনা পারভীন সড়ক, মালিবাগ, ঢাকা-১২১৭, বাংলাদেশ।
টেলিফোন: +৮৮ (০২) ৮৩৩২৯৫৮, ৮৩৩২৯২২ ফ্যাক্স: +৮৮ (০২) ৮৩৩২৯৮১ মেইল: [email protected]

প্রেমিকার বিয়ের দিনে প্রেমিক সৈয়দ মাসুম বিল্লাহ (২০) নামের এক যুবকের মরদেহ উদ্ধার করেছেন পুলিশ। তবে নিহতের পরিবারের দাবি, এটি পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড। নিহতের শরীরে বিভিন্ন স্থানে আঘাতের পাশাপাশি বাম হাতের একটি আঙুলের নখও ওঠানো অবস্থায় পাওয়া গেছে।
শুক্রবার (১ আগস্ট) সকাল ১১টার পর গোপালগঞ্জ ও নড়াইলের সীমান্তবর্তী কাশিয়ানী এলাকার মধুমতি সেতু থেকে অচেতন অবস্থায় মাসুমকে উদ্ধার করেন অটোরিকশাচালক সুজন।
পরে তাকে উদ্ধার করে নড়াইলের লোহাগড়া উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে যান। প্রাথমিক চিকিৎসা শেষে আশঙ্কাজনক অবস্থায় ঢাকায় নেওয়ার প্রস্তুতিকালে দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে তার মৃত্যু হয়।
নিহত সৈয়দ মাসুম বিল্লাহ লোহাগড়া উপজেলার শালনগর ইউনিয়নের মাকড়াইল (মধ্য পাড়া) গ্রামের মৃত সৈয়দ রকিবুল ইসলামের ছেলে।
জানা যায়, নড়াইলের লোহাগড়া উপজেলার লাহুড়িয়া ইউনিয়নের সরশুনা গ্রামের শিমুল সরদারের মেয়ে অষ্টম শ্রেণি পড়ুয়া মাদরাসা শিক্ষার্থী সাথী খাতুনের সঙ্গে প্রেমের সম্পর্ক ছিলো মাসুমের। পারিবারিকভাবে তাদের সম্পর্ক মেনে না নেওয়ায় তাদের সম্পর্কে ভাটা পড়ে। এর মাঝে বুধবার (৩০ জুলাই) মাসুম এলাকা ছেড়ে ঢাকায় কাজের সন্ধানে বড় বোনের বাসায় গিয়ে ওঠেন। শুক্রবার সকাল ৬টার পর প্রেমিকার বিয়ের খবরে ঢাকার উত্তর বাড্ডা থেকে লোহাগড়ার উদ্দেশ্যে রওনা করেন। সকাল ৯ টার দিকে চাচাতো ভাই তরিকুল তার মুঠোফোনে কল করে জানতে পারেন মাসুমের অবস্থান লোহাগড়ায়। তরিকুল তাকে অনুরোধ করেন বাড়িতে ফেরার জন্য। এরপর থেকে পরিবারের সঙ্গে আর কোনো যোগাযোগ হয়নি মাসুমের।
বেলা ১১টার পর গোপালগঞ্জ ও নড়াইলের সীমান্তবর্তী কাশিয়ানী এলাকার মধুমতি সেতু থেকে অচেতন অবস্থায় মাসুমকে উদ্ধার করেন অটোরিকশাচালক সুজন। পরে তাকে উদ্ধার করে লোহাগড়া উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে যান। তার কাছে থাকা মোবাইল ফোনটি ভেঙে যাওয়া নিজের মোবাইলে মাসুমের সিম ব্যবহার করে তার পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে যোগাযোগ করেন অটোরিকশাচালক। প্রাথমিক চিকিৎসা শেষে স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স থেকে আশঙ্কাজনক অবস্থায় ঢাকায় নেওয়ার প্রস্তুতিকালে দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে মাসুমের মৃত্যু হয়। পরে লোহাগড়া থানায় খবর দিলে পুলিশ মরদেহটি হেফাজতে নেয়।
এরপর থেকে মাসুমের রহস্যজনক মৃত্যুতে এলাকায় চঞ্চলের সৃষ্টি হয়, দুর্ঘটনাজনিত মৃত্যু নাকি তাকে পরিকল্পিতভাবে হত্যা করা হয়েছে। এদিকে, সুরতহাল শেষে রাত পৌনে ১২টায় সদর হাসপাতাল মর্গে পৌঁছায় নিহতের মরদেহ।
অটোরিকশাচালক সুজন বলেন, ‘গোপালগঞ্জের ভাটিয়াপাড়া মোড় থেকে যাত্রী নিয়ে নড়াইলের লোহাগড়ার দিকে যাচ্ছিলাম। মধুমতি সেতুতে উঠতেই দেখি পাশের বড় লেনে (বড় গাড়ি চলাচলের রাস্তা) ভুট (উপুড়) হয়ে একজন পড়ে আছে। আমরা কাছে গিয়ে দেখি বেঁচে আছে। আমার গাড়িতে থাকা যাত্রীদের সাহায্য নিয়ে তাকে উঠাই। পরে লোহাগড়া স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে যাই। তার পকেটে থাকা ফোন বের করে আমার ফোনে সিম ভরে আহতের পরিবারের লোকজনকে জানাই। তার আত্মীয়রা আসার পর আমি হাসপাতাল থেকে চলে আসি। পরে শুনি সে (মাসুম) মারা গেছে।’
ঘটনাস্থলে দুর্ঘটনার কোনো আলামত দেখতে পেয়েছেন কি না- এমন প্রশ্নে সুজন আরও বলেন, ‘সেখানে দুর্ঘটনার কোনো ছিটেফোঁটা আমরা দেখিনি। জিজ্ঞেস করছিলাম, আশপাশের কেউ ও দুর্ঘটনার কথা শোনেনি। তার শরীরের অবস্থা দেখে মনে হচ্ছে সম্ভবত তাকে কেউ হয়তো গাড়ি থেকে ফেলে দিয়েছে।’
নিহত মাসুমের বোন জামাই হাচিবুল ইসলাম বলেন, ‘মাসুমের সঙ্গে পাশের গ্রামের সাথীর সম্পর্কের বিষয়টা আমরা পারিবারিকভাবেই জানতাম। সাথীর পরিবার যেহেতু মেনে নিচ্ছে না, আমরা তাকে সবাই বুঝাইছি। আগে সে জাহাজে চাকরি করতো, তবে দীর্ঘদিন সে আর জাহাজে যায়নি। পারিবারিক সমস্যার কথা বোঝানোতে সে আবার জাহাজে চাকরিতে যেতে রাজি হয়। বুধবার আমার ঢাকার বাসায় যায়, পরদিন আমাদের বলে একসঙ্গে শুক্রবার ঘুরতে যাবে। কিন্তু বৃহস্পতিবার রাতে সে হুট করে বলে সকালে বাড়ি যাবো। তাকে জিজ্ঞেস করলে বলে, সাথীর বিয়ে হয়ে যাচ্ছে সে কারণে। তাকে আমরা আবার বোঝাই। কিন্তু সে শুক্রবার ভোরে ঢাকা থেকে রওনা করে। আমিও সঙ্গে সঙ্গে বাড়িতে কল করে জানাই।’
নিহত মাসুমের ছোট চাচা শরিফুল ইসলাম বলেন, ‘আমাদের গ্রামের (মাকড়াইল বিল পাড়া) সাইফুল মোল্যার কাছে সাথীর চাচা লতিফ সরদার সকাল ১০ টার দিকে ফোন করে জানান, মাসুম ঝামেলা করতেছে। তার ছেলে-পেলেরা মাসুমকে পেলে অবস্থা খারাপ হবে। আমরা খবর পাই মানিকগঞ্জ বাজারের এক পার্লারে সাথীর সঙ্গে মাসুম দেখা করে কথা বলছে। সাথীর চাচা ফোন করে হুমকি দেওয়াতে আমরা মাসুমকে খুঁজতে বের হই, কিন্তু তার ফোন বন্ধ ছিলো। পরে হাসপাতাল থেকে একজন ফোন করে। বড় গাড়িতে এক্সিডেন্ট করলে তো হাত-পা অক্ষত থাকবে না। তার মাথাসহ শরীরের বিভিন্ন স্থানে আঘাতের চিহ্ন, তার বাম হাতের একটা আঙুলের নখও উপড়ে ফেলা হয়েছে। পরিকল্পিতভাবে সাথীর পরিবার তাকে হত্যা করছে।’
এ ঘটনায় অভিযুক্ত মাসুমের প্রেমিকা সাথী খাতুন বা তার পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করেও বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
লোহাগড়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. শরিফুল ইসলাম বলেন, ‘আমরা মাসুম বিল্লাহকে মৃত অবস্থায় লোহাগড়া উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স থেকে থানায় নিয়ে আসি। স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স থেকে প্রাথমিকভাবে জানা গেছে, তিনি দুর্ঘটনায় নিহত হন। মরদেহ ময়নাতদন্তের জন্য নড়াইল সদর হাসপাতাল মর্গে পাঠানো হয়েছে। ময়নাতদন্তের প্রতিবেদন পেলে মৃত্যুর আসল কারণ জানা যাবে। এ ঘটনায় যথাযথ আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’
/অ