দেশ টেলিভিশন লিমিটেড, কর্ণফুলী মিডিয়া পয়েন্ট, ৪২, শহীদ সাংবাদিক সেলিনা পারভীন সড়ক, মালিবাগ, ঢাকা-১২১৭, বাংলাদেশ।
টেলিফোন: +৮৮ (০২) ৮৩৩২৯৫৮, ৮৩৩২৯২২ ফ্যাক্স: +৮৮ (০২) ৮৩৩২৯৮১ মেইল: [email protected]

আগুনে দগ্ধ আমার নাতি ৪ বছরের সোয়াইদ খান হাসপাতালের বিছানায় শুয়ে চিৎকার করে কাঁদছে, আর বাবা-মাকে খুঁজছে, ‘আমার বাবা কোথায়? মা কোথায়?’ আমি বাবা-মায়ের কাছে যাবো। কিন্তু সে তো জানে না, তার মা আর দুনিয়াতে নেই। এ কথাগুলো বলে চোখের জল ফেলেন শারমিন আক্তারের মা রাশিদা বেগম।
বৃহস্পতিবার (২০ ফেব্রুয়ারি) বিকেলে আশুলিয়ায় গ্যাস সিলিন্ডার বিস্ফোরণে নিহত শারমিনের মা দেশ টিভিকে এসব কথা বলেন।
তিনি আরও বলেন, ‘দুর্ঘটনার পর থেকেই আমি হাসপাতালে ছিলাম। আমার নাতির কষ্ট আর সহ্য হয় না। আগুনে পুড়ে যাওয়া (দগ্ধ) ৩ মাসের নাতনি সুরাইয়া, ওর দিকে তো তাকাতেই পারি না। আল্লাহ তাদের দুইজনের বাবা-মাকে নিয়ে গেছেন, এখন ওদের দেখার কেউ নেই। আল্লাহ যেন ওদের বাঁচিয়ে রাখেন।’
নিহত শারমিন আক্তার (২৫) শরীয়তপুরের পালেরচর ইউনিয়নের ৮নং ওয়ার্ডের হাজী খোরশেদ আকন কান্দি গ্রামের আবদুল আলী শিকদারের মেয়ে। শারমিনের ছোট বোন সুমা আক্তার জানান, জাতীয় বার্ন অ্যান্ড প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটের আইসিইউতে চিকিৎসাধীন অবস্থায় বুধবার সন্ধ্যায় শারমিন মারা যান।
এর আগে শনিবার দিবাগত রাত ৩টায় মারা যায় শারমিনের ননদ শিউলী আক্তার (৩২)। রোববার দুপুর ২টায় শারমিনের স্বামী সুমন খান (৩০) মারা যান। এখনও হাসপাতালে চিকিৎসাধীন আছেন আরও আটজন।
তিনি বলেন, ‘আমাদের পরিবারে আমরা চার বোন ও এক ভাই। শারমিন ছিল তৃতীয় সন্তান। সাড়ে ৫ বছর আগে সুমনের সঙ্গে বিয়ে হয়। সুমনের বাড়ি মুন্সীগঞ্জের বিক্রমপুরে। তারা সাভারে ভাড়া থাকতেন। সুমন গ্রাফিক্স ডিজাইনার ছিলেন, বাসা থেকেই কাজ করতেন। গত ঈদে আমার বোন বাড়িতে এসেছিল। গর্ভবতী থাকার কারণে এক বছর বাড়িতে আসতে পারেনি। এই ঈদে আমার বোন বাড়িতে আসার কথা ছিল, কিন্তু তার আগেই সে পৃথিবী ছেড়ে চলে গেল। শারমিনের ছেলে সোয়াইদ খান (৪) এবং মেয়ে সুরাইয়া (৩ মাস) এখন তাদের একমাত্র ভরসা।’
সুমা আক্তার আরও বলেন, তাদের পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি তার বাবা। যিনি কৃষিকাজ করে সংসার চালান। শারমিন, সুমন ও দুই শিশুর চিকিৎসা খরচ তার বাবা বহন করেছেন। এখন বেঁচে যাওয়া দুই শিশুর ওষুধপত্র তাকে বহন করতে হচ্ছে। চিকিৎসার কাজে ব্যবহৃত প্রয়োজন সব বাইরে থেকে কিনতে হয়। কৃষিকাজ করে এর চিকিৎসা এবার চালানো তার জন্য কষ্টসাধ্য হয়ে যাচ্ছে।
শারমিনের মৃত্যুর বিষয়টি নিশ্চিত করে বার্ন ইনস্টিটিউটের আবাসিক সার্জন ডা. শাওন বিন রহমান জানান, শারমিনের শরীরের ৪২ শতাংশ দগ্ধ হয়েছিল এবং শ্বাসনালীও পুড়ে গিয়েছিল। তিনি আইসিইউতে চিকিৎসাধীন ছিলেন এবং সেখানে বুধবার সন্ধ্যায় মারা যান।
উল্লেখ্য, সুমন তার স্ত্রী ও দুই সন্তান নিয়ে ওই বাড়ির দ্বিতীয় তলায় ভাড়া থাকতেন। শবে বরাত উপলক্ষে তাদের বাড়িতে আত্মীয়-স্বজন বেড়াতে এসেছিলেন। রাতের খাবারের জন্য চুলা জ্বালানোই ছিল বিস্ফোরণের কারণ। গ্যাস সিলিন্ডার বিস্ফোরিত হয়ে আগুন ধরে গেলে নারী ও শিশুসহ ১১ জন দগ্ধ হন। দগ্ধদের সবাইকে জাতীয় বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটে ভর্তি করা হয়।
দগ্ধরা হলেন- সূর্য বেগম (৫০), তার ছেলে সোহেল (৩৮), সুমন রহমান ও তার মেয়ে শিউলী আক্তার (৩২), শারমিন আক্তার (২৫), তার ছেলে সোয়াইদ (৪) ও মেয়ে সুরাইয়া (৩ মাস), শিউলীর স্বামী মনির হোসেন (৪০), দুই ছেলে ছামির মাহমুদ ছাকিন (১৫) ও মাহাদী (৭) ও সুমনের ফুফু জহুরা বেগম (৭০)।
শারমিনের মৃতদেহ বৃহস্পতিবার সকালে শরীয়তপুরে নিয়ে আসা হয়। পরে দুপুরে বাদ জোহর সদর উপজেলার নশাসন ইউনিয়নের মাঝিরহাট এলাকায় দাফন করা হয়। পূর্বের দিন সুমন রহমান খানকে দাফন করা হয়। সরেজমিনে শুক্রবার সকালে গিয়ে শারমিনের বাড়িতে দেখা যায়, এক হৃদয়বিদারক পরিস্থিতি। শারমিনের মা শারমিনের ছোট বোন সোমাকে ধরে কাঁদছেন। আর প্রতিবেশীরা এসে তাদের স্বান্তনা দিচ্ছেন।
আরএ