দেশ টেলিভিশন লিমিটেড, কর্ণফুলী মিডিয়া পয়েন্ট, ৪২, শহীদ সাংবাদিক সেলিনা পারভীন সড়ক, মালিবাগ, ঢাকা-১২১৭, বাংলাদেশ।
টেলিফোন: +৮৮ (০২) ৮৩৩২৯৫৮, ৮৩৩২৯২২ ফ্যাক্স: +৮৮ (০২) ৮৩৩২৯৮১ মেইল: [email protected]

এ যেন সিনেমার আয়ানাবাজির গল্প! রাজশাহীর যুগ্ম মহানগর দায়রা জজের প্রথম আদালতে একটি মামলায় এক বছরের সাজাপ্রাপ্ত আসামির পরিবর্তে ভাড়ায় জেল খাটছে আরেক যুবক। মাসে চার হাজার টাকা ও দ্রুত জামিনে বের করে আনার প্রতিশ্রুতি দিয়ে মাদকাসক্ত দিনমজুর এই যুবককে আদালতে হাজিরের ব্যবস্থা করে মূল আসামি। এরপর আড়াই মাস ধরে কারাগারে আছে ওই যুবক।
সম্প্রতি চাঁপাইনবাবগঞ্জ যুগ্ম দায়রা জজ আদালত-২-এ অন্য আরেকটি মামলায় হাজির করলে প্রকাশ্যে আসে পুরো ঘটনা। এমন অমানবিক ঘটনায় হতভম্ব হয়ে যান বিচারক। পুরো ঘটনার বিবরণ জবানবন্দিতে রেকর্ড করেন বিচারক। ভাড়ায় জেল খাটা ওই যুবকের নাম মো. মিঠন (৩২)।
তিনি শিবগঞ্জ উপজেলার কানসাট ইউনিয়নের বিশ্বনাথপুর গ্রামের রেজাউল করিমের ছেলে। আর সাজাপ্রাপ্ত আসামির নাম মো. সেতাউর রহমান (৩৯)। তিনি একই উপজেলার বিশ্বনাথপুর এলাকার সেরাজুল ইসলামের ছেলে। মেসার্স চাঁদ ব্রেড অ্যান্ড বেকারি নামের একটি ব্যবসায়ী প্রতিষ্ঠানের মালিক তিনি।
মামলার বাদী আইনজীবী আবদুল মালেক বলেন, আমি সেতাউর রহমানের বিরুদ্ধে ৭৫ হাজার টাকার একটি চেকের মামলা করি। দীর্ঘসময় ধরে ট্রায়াল শেষে আদালত সেতাউর রহমানকে এক বছরের সাজা ও চেকে বর্ণিত টাকা অর্থদণ্ড প্রদান করেন। কিন্তু অর্ধেক টাকা জমা দিয়ে জেলা ও দায়রা জজ আদালতে আপিল করে সে। তাতে হাইকোর্ট তার সাজা কমিয়ে ১৫ দিন করে এবং তিন মাসের মধ্যে টাকা পরিশোধের সময় দেয়। বাকি টাকা সে আমাকে চলতি মাসেই পরিশোধ করেছে। তাই আমি আদালতে পিটিশন দাখিল করেছি।
কিন্তু সম্প্রতি আদালতে আসামিকে হাজির করলে দেখা যায়, সেতাউর রহমানের বদলে মো. মিঠন নামের একজনকে হাজির করা হয়েছে। আদালতের কাছে পুরো ঘটনা স্বীকার করেছে মিঠন। অন্যদিকে সেতাউর প্রকাশ্যেই ঘুরে বেড়াচ্ছে।
রাজশাহী আদালতে সেতাউর রহমানের আরেকটি চেকের মামলার বাদী সাজেদুর রহমান বলেন, ৭০ লাখ টাকার চেকের মামলায় সেতাউর রহমানকে এক বছরের সাজা প্রদান করেন আদালত। কিন্তু আদালতের কাছে গত বছরের ২৭ অক্টোবর সে আত্মসমর্পণ না করে মিঠন নামের একজনকে হাজির করে। পরে জানা যায়, সেতাউরের বদলে সাজা খাটছে মিঠন। এতে আমাদের সন্দেহ হলে চাঁপাইনবাবগঞ্জ আদালতে এসে জানতে পারি সেতাউরের বদলি হিসেবে মিঠন নামের একজন সাজা খাটছে।
এ বিষয়ে আদালতে মিঠনের সঙ্গে কথা হয় এই প্রতিবেদকের। তিনি বলেন, আমি নেশা করতাম। তাই ভালো হওয়ার জন্য সাবেক মেম্বার সেতাউরের কাছে গেলে সে আমাকে বলে তুই কিছু দিন জেলে থেকে আয়। এই কথা বলে সে আমাকে রাজশাহীতে নিয়ে গিয়ে শেষবারের মতো নেশা করিয়ে বলে, তুই শুধু আমার নাম ও আমার বাবার নাম বলবি। তুই জেলে কিছু দিন থাকলে ভালো হয়ে যাবি। আর খুব তাড়াতাড়ি তোকে জেল থেকে ছাড়িয়ে এনে একটি রিকশা কিনে দেব। তোর ও তোর পরিবারের খরচ আমি চালাব।
মিঠন আরও বলেন, দুই মাস ২৫ দিন ধরে জেলে আছি। আমার পিসিতে মাত্র ছয় হাজার টাকা দিয়েছে। সেতাউর কিছু দিন আগে আমাকে দেখতে গেলে তাকে বলি আমাকে জেল থেকে ছাড়াচ্ছ না কেন? তখন সে বলে তুই এখন এসব বললে সারাজীবন জেলে থাকবি। আর আমার কিছুই হবে না। নিজের ইচ্ছের কথা জানিয়ে মিঠন বলেন, এখন সব জানাজানি হয়ে গেছে। আমি ভুল করেছি। নেশার ঘোরে কী বলেছি আমি নিজেই জানি না। এখন আমি মুক্তি চাই। সরকারের কাছে এটাই আমার চাওয়া।
মিঠনের স্ত্রী আশা খাতুন বলেন, আমার স্বামী মাদকাসক্ত। তাকে ভুল বুঝিয়ে অর্থের লোভ দেখিয়ে জেলে পাঠিয়েছে। খুব তাড়াতাড়ি জেল থেকে বের করে আনার কথা বললেও এখনও আমার স্বামী জেলে। তিন সন্তান নিয়ে আমি খুব কষ্টে আছি। এই কয়েক মাসে আমাকে সেতাউর মাত্র চার হাজার টাকা দিয়েছে। অথচ আমার স্বামী বলেছিল প্রতি মাসেই চার হাজার টাকা দেবে। এদিকে সাজাপ্রাপ্ত মূল আসামি সেতাউর রহমানের মোবাইল ফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি ফোন না ধরায় তার মন্তব্য পাওয়া যায়নি।
বাংলাদেশ মানবাধিকার বাস্তবায়ন সংস্থা চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলার সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট মোয়াজ্জেম হোসেন মেহেদী বলেন, একজন আসামির সাজা আরেকজন অর্থের বিনিময়ে ভোগ করছে। এটা মানবাধিকারের চরম লঙ্ঘন। এখানে সবাইকে সতর্ক হওয়া উচিত। যেহেতু সেতাউরের বদলে সাজা ভোগ করছে মো. মিঠন, সেহেতুে উভয়েই সমান অপরাধী।
আরএ