দেশ টেলিভিশন লিমিটেড, কর্ণফুলী মিডিয়া পয়েন্ট, ৪২, শহীদ সাংবাদিক সেলিনা পারভীন সড়ক, মালিবাগ, ঢাকা-১২১৭, বাংলাদেশ।
টেলিফোন: +৮৮ (০২) ৮৩৩২৯৫৮, ৮৩৩২৯২২ ফ্যাক্স: +৮৮ (০২) ৮৩৩২৯৮১ মেইল: [email protected]

বিচারিক দক্ষতা কিংবা সততা দিয়ে কোনো বিচারক জনপ্রিয় হয়েছেন এমন গল্প পাওয়া কঠিন। এ পেশায় জনপ্রিয়তা পাওয়া বা ‘হিরো’ হওয়ার সুযোগই নেই। কিন্তু, ন্যায়বিচার। পক্ষপাতহীনতা। প্রতিকূল পরিবেশেও ন্যায় নীতির ওপর অটল ও অবিচল থাকা। এই ধরনের মহৎ গুণগুলোর প্রতি মানুষ চরমভাবে আকৃষ্ট। তেমনি একজন বিচারক ছিলেন চাঁপাইনবাবগঞ্জের সিনিয়র জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট মো. হুমায়ুন কবীর।
‘বোল্ড স্পিরিট’ (উদ্যমী) এই বিচারক মানবিক মানুষ হিসেবেও সব মহলে আলোচিত। সম্প্রতি তাকে বদলি করে ঠাকুরগাঁও আদালতের জেলা লিগ্যাল এইড অফিসার হিসেবে পদায়ন করা হয়েছে। গত ৩ সেপ্টেম্বর ছিল চাঁপাইনবাবগঞ্জ আদালতে তার শেষ কর্মদিবস।
আইনজীবীরা বলছেন, দীর্ঘ সাড়ে তিন বছরে চাঁপাইনবাবগঞ্জের মানুষকে তিনি ন্যায় বিচার দেয়ার চেষ্টা করেছেন। শুনানি চলাকালে একজন নিরপেক্ষ রেফারির ভূমিকা পালন করেছেন। আদালতে উপস্থাপন হওয়া তথ্য-প্রমাণের সত্যতা যাচাইয়ে বিভিন্ন দপ্তরে ছুটে গেছেন। বিকল্প বিরোধ নিষ্পত্তির জন্য অসংখ্যবার তিনি প্রশংসিত হয়েছেন। সামাজিক ও পারিবারিক ঝামেলার সমাধান করেছেন খাস কামরায় বসে। এসব তথ্য নিজের সোস্যাল মিডিয়ায় শেয়ার করতেন। একারণে সাধারণ মানুষের কাছেও ব্যাপক জনপ্রিয়তা পান তিনি।
জানা গেছে, ২০২৩ সালে মে মাসে একটি হত্যা মামলায় এক শীর্ষ সন্ত্রাসীর ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমুলক জবানবন্দি রেকর্ড করেছিলেন বিচারক হুমায়ুন কবীর। এর ফলে এক জনপ্রতিনিধি আইনের আওতায় আসে, বিভাগীয় জবাবদিহিতায় আসে পুলিশের এক ডিআইজি। ওই জবানবন্দি চাঁপাইনবাবগঞ্জের চিত্র বদলে দেয়। এছাড়া জীবন বীমা কোম্পানি খুলে প্রতারণার ঘটনায় ক্ষমতাসীন দলের স্বাস্থ্যমন্ত্রী ডা. জাহিদ মালেকের বোন রূবিনা হামিদকে সাজা দিয়েছিলেন। প্রতারণার আরেক মামলায় পুলিশের অতিরিক্ত ডিআইজির ভাই রেজাউল ইসলামকেও সাজা দিয়েছিলেন। হত্যা মামলার সালিশ করায় ক্ষমতাসীন দলের সংসদ সদস্য ডাঃ সামিল উদ্দীন আহমেদ শিমুলকেও আদালতে তলব করেছিলেন তিনি। আদালতের কাঠগড়ায় দাঁড় করান চাঁপাইনবাবগঞ্জ সদর আসনের সংস সদস্য আব্দুল ওদুদকেও। যদিও ছাত্র-জনতার অভূত্থানের মধ্যদিয়ে বিদায় নেয়া আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত থেকে ন্যায় বিচার করা কঠিন ছিল। প্রতিটি বিচার তার জন্য ছিল চ্যালেঞ্জিং। এসব কারণে চরম বৈষম্যের শিকার হন, আমলী আদালত থেকে তাকে সরিয়ে দেয়া হয়।

আদালত সংশ্লিষ্টরা বলছেন, শিবগঞ্জে সভামঞ্চে এক বীর মুক্তিযোদ্ধাকে লাঞ্ছিতের ঘটনায় আওয়ামী লীগ নেতার বিরুদ্ধে স্বপ্রণোদিত হয়ে তদন্তের নির্দেশ দেন সিনিয়র জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট হুমায়ুন কবীর। ক্ষমতাসীন দলের নেতার বিরুদ্ধে এমন আদেশ সব মহলে ব্যাপক আলোচিত হয়। কেননা নিম্ন আদালতে এমন ঘটনা খুবই কম ঘটে।
এছাড়াও মাদক মামলায় ১৫ জনের বিরুদ্ধে অভিযোগ প্রমাণের জন্য ডোপ টেস্টের নির্দেশ দেন বিচারক মো. হুমায়ুন কবীর। তবে ডোপ টেস্টের সেই রিপোর্ট পর্যালোচনায় সন্দেহ সৃষ্টি হলে একই দিন আসামিদের নিয়ে ২৫০ শয্যার চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলা হাসপাতালে ছুটে যান বিচারক। সেখানে গিয়ে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের অবহেলা আর আসামিদের ডোপ টেস্টের জন্য দেওয়া প্র¯্রাবের (ইউরিন) বদলে পানি পূর্ণ করে ল্যাবে জমা দেওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত হন। পরে আদালতে ফিরে আসামিদের ছয় মাস থেকে তিন বছর পর্যন্ত বিভিন্ন মেয়াদে কারাদ- দেন তিনি। ঘটনাটি তার ফেসবুকে তুলে ধরেন। মো. হুমায়ুন কবীর জানিয়েছিলেন, এ ঘটনটি ফেসবুকে তুলে ধরার মাধ্যমে পদে পদে অসংগতি আর আদালতের এজলাসে বসে সঠিক রায় দেওয়া কত কঠিন সেটি বোঝানোর চেষ্টা করেছি।
জানা গেছে, গোমস্তাপুরের একটি মসজিদ নিয়ে ঝামেলার বিরোধ নিষ্পত্তি করেন খাস কামরায় বসে। ওই মসজিদটিতে বাদী-বিবাদীরা এখন এক হয়ে নামাজ আদায় করছেন।
নুর মোহাম্মদ নামে স্থানীয় এক সাংবাদিক বলেন, মসজিদটি নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে দুই পক্ষের মধ্যে বিরোধ চলছিল। বিচারক হুমায়ুন কবীর উভয়পক্ষকে নিয়ে বসে সমাধান করে দেন। নিজে এসে মসজিদের তালা খুলে উভয়পক্ষকে নিয়ে নামাজ আদায় করেন। বিচারকের সেই ভুমিকা মনে রাখবে গোমস্তাপুরের মানুষ।
এছাড়াও চারিদিকে যখন প্রতারণার ভয়াবহ জাল বিস্তৃত; এমন সময়ে বিনোদনের মাধ্যমে সচেতনতা সৃষ্টি করতে নির্মাণ করা হয় গম্ভীরা। সিনিয়র জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট হুমায়ুন কবীরের পরিকল্পনা ও নির্দেশনায় গম্ভীরাটি নির্মাণ করা হয়। সাধারণ মানুষকে সচেতন করতে এমন অভিনব উদ্যোগ এলাকায় ব্যাপক সাড়া ফেলে। জনসচেতনতায় এমন উদ্যোগের কারণে ব্যাপক প্রশংশিত হন তিনি। বিচারক মো. হুমায়ুন কবীর জানিয়েছিলেন- মামলা সমাধানের উপায় নয়, সচেতনতায় পারে মানুষকে সঠিক পথ দেখাতে। তাই চাঁপাইনবাবগঞ্জের ঐতিহ্যবাহী লোকসঙ্গীত গম্ভীরার মাধ্যমে মানুষকে সচেতন করতে এমন উদ্যোগ।
একটি মামলার বর্ণনা দিয়ে আইনজীবী মো. নূরে আলম সিদ্দিকি আসাদ বলেন, চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলার ১০০ জন নারী-পুরুষ সানলাইফ ইনস্যুরেন্সের বীমা করেন। এসব বীমার মেয়াদপূর্তি হয় ৪-৫ বছর আগেই। তারপরও গ্রাহকরা বীমা দাবির টাকা পাচ্ছিলেন না।
এরপর ২০২১ সালে প্রতিষ্ঠানটির চেয়ারম্যান সাবেক স্বাস্থ্যমন্ত্রীর বোনকে প্রধান আসামি করে মামলা করা হয়। আসামিরা অনেক প্রভাবশালী হওয়ায় মামলাটিতে প্রভাব খাটানোর চেষ্টা করে। মামলাটির বিচারকজ শুরু হলে তারা প্রতিনিধির মাধ্যমে গ্রাহকদের ১১ লাখ ৫৯ হাজার টাকার চেক পাঠান। এতে অদালতের বিচারক মো. হুমায়ুন কবীর গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিলেন। তিনি বিচারিক দায়িত্বের বাইরে এসে মানবিক ভূমিকা রেখেছেন এ জন্য অসহায় গ্রাহকরা তাদের পাওনা টাকা বুঝে পান।
আইনজীবী রাসেল আহমেদ রনি বলেন, সিনিয়র জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট মো. হুমায়ুন কবীর একজন প্রজ্ঞাবান বিচারকের পাশাপাশি মানবিক মনের একজন মানুষ। তার মানবিকতা ও ন্যায় বিচারের দৃষ্টান্ত অবশ্যই প্রশংসার যোগ্য। সার্বিক অর্থনৈতিক বাস্তবতায় জুনিয়র আইনজীবীরা যেন আইন পেশায় টিকে থাকতে পারে সে দিকেও খেয়াল রেখেছিলেন। তিনি আইনজীবীদের পাশাপাশি সাধারণ মানুষের কাছেও প্রিয় ছিলেন।
বিদায়ী সিনিয়র জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট মো. হুমায়ুন কবীর বলেন, সাড়ে তিন বছরের বেশি সময় চাঁপাইনবাবগঞ্জ আদালতে কাজ করেছি, তাই আজ ছেড়ে যেতে কষ্ট হচ্ছে। এটা খুবই স্বাভাবিক।
কে