দেশ টেলিভিশন লিমিটেড, কর্ণফুলী মিডিয়া পয়েন্ট, ৪২, শহীদ সাংবাদিক সেলিনা পারভীন সড়ক, মালিবাগ, ঢাকা-১২১৭, বাংলাদেশ।
টেলিফোন: +৮৮ (০২) ৮৩৩২৯৫৮, ৮৩৩২৯২২ ফ্যাক্স: +৮৮ (০২) ৮৩৩২৯৮১ মেইল: [email protected]

জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রীকে যৌন হয়রানি ও হেনস্তার ঘটনায় দুই শিক্ষকের স্থায়ী বহিষ্কার দাবিতে শিক্ষার্থীদের আন্দোলন গড়াল ১২তম দিনে। অব্যাহত আন্দোলনে অভিযুক্ত দুই শিক্ষককে বাধ্যতামূলক ছুটিতে পাঠানোর সিদ্ধান্তের প্রতিবাদ ও স্থায়ী বহিষ্কারের দাবিতে বুধবার (১৩ মার্চ) ঘণ্টাব্যাপী ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়ক অবরোধ করে বিক্ষোভ করে শিক্ষার্থীরা। পরে ভিসি ওই অভিযুক্ত দুই শিক্ষককে স্থায়ী বহিষ্কারের আশ্বাস দিলে আন্দোলন তুলে নেয় শিক্ষার্থীরা।
বুধবার (১৩ মার্চ) সকাল ১১টায় আন্দোলনের অংশ হিসাবে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনিক ভবন, সোনালী ব্যাংকের শাখা, প্রক্টোরিয়াল বডির অফিসে তালা ঝুলিয়ে দেয় শিক্ষার্থীরা। এতে শিক্ষক ও কর্মকর্তারা তালাবদ্ধ হয়ে পড়ে। এরপর আন্দোলন চালিয়ে যেতে থাকে শিক্ষার্থীরা।
এদিকে, ওই দিন দুপুরের দিকে এক বিজ্ঞপ্তিতে সিন্ডিকেটের অনুমোদন সাপেক্ষে জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয়ের মানবসম্পদ ও ব্যবস্থাপনা বিভাগের প্রধান ও সহযোগী অধ্যাপক রেজুয়ান আহমেদ শুভ্র এবং একই বিভাগের সহকারী অধ্যাপক সাজন সাহাকে অনির্দিষ্টকালের জন্য বাধ্যতামূলক ছুটি দেওয়া হয়। একইসঙ্গে সহযোগী অধ্যাপক রেজুয়ান আহমেদ শুভ্রকে বিশ্ববিদ্যালয়ের মানবসম্পদ ও ব্যবস্থাপনা বিভাগের প্রধানের দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়।
এরপর দুপুরের দিকে দুই শিক্ষককে বাধ্যতামূলক ছুটিতে পাঠানোর খবর ছড়িয়ে পড়ে। এমন খবর ছড়িয়ে পড়লে বেলা দেড়টার দিকে মানবসম্পদ ও ব্যবস্থাপনা বিভাগের শিক্ষার্থীরা আরও ক্ষিপ্ত হয়ে দুই শিক্ষকের স্থায়ী বহিষ্কারের দাবিতে বিশ্ববিদ্যালয় ব্যবসা প্রশাসন অনুষদ, সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদ, কলা অনুষদ, বিজ্ঞান অনুষদ, ভিসির কক্ষে তালা ঝুলিয়ে দেয়। এতে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ও কর্মকর্তা অবরুদ্ধ হয়ে পড়ে।
পরে বিকেল সাড়ে তিনটার দিকে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান ফটকের সামনে ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়ক অবরোধ করে টায়ারে আগুন জ্বালিয়ে বিভিন্ন স্লোগান দিতে থাকে শিক্ষার্থীরা। এ সময় শিক্ষার্থীরা ঘণ্টাখানেক ঢাকা ময়মনসিংহ মহাসড়ক অবরোধ করে রাখে। ভিসিসহ প্রশাসনিক কর্তারা শিক্ষার্থীদের শান্ত করতে এলে সড়কে অবস্থানরত শিক্ষার্থীরা ভিসিকে উদ্দেশ্য করে ভুয়া ভুয়া বলে স্লোগান দেন। এ সময় শিক্ষকরা শিক্ষার্থীদের অনুরোধ করলে তাদের স্লোগান বন্ধ করে এবং ভিসির আশ্বাসে সড়ক থেকে সরে এসে আন্দোলন স্থগিত করেন।
এ বিষয়ে ভোক্তভোগী ছাত্রী বলেন, আমাদের আন্দোলন চলছে। আন্দোলনের অংশ হিসাবে বিশ্ববিদ্যালয়ের সব বিভাগে তালা দেওয়া হয়েছিল। ওই দুই শিক্ষককে স্থায়ী বহিষ্কার করা না হলে আমাদের আন্দোলন চলবে। সাময়িক ছুটিতে পাঠানো এটা কোনো শাস্তি নয়। সাজন সাহা আমাকে রাতে মেসেজ দিয়ে চা খেতে ডাকতো। নির্জন জায়গায় দেখা করতে বলতো। অঙ্ক বুঝাতে ব্যক্তিগত চেম্বারে ডাকা, শাড়ি পরে দেখা করতে বলা, ইনবক্সে অশ্লীল ছবি চাওয়া, ম্যাসেঞ্জারে অন্তরঙ্গ ভিডিও লিংক শেয়ার করত।
এ সব বিষয়ে বিভাগীয় প্রধান রেজুয়ান আহমেদ শুভ্র স্যার তাকে শেল্টার দিতো। তাই দুজনকেই স্থায়ী বহিষ্কার করতে হবে। শুধু আমি সাজন সাহার যৌন হয়রানির শিকার আরও অনেকেই আছে। লজ্জায় কেউ মুখ খুলতে চাচ্ছে না।
এ বিষয়ে অভিযুক্ত সাজন সাহার নাম্বারে একাধিকবার কল করলেও সেটি বন্ধ দেখায়। তবে, মানবসম্পদ ও ব্যবস্থাপনা বিভাগের প্রধান সহযোগী অধ্যাপক রেজুয়ান আহমেদ শুভ্র বলেন, দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি ও বাধ্যতামূলক ছুটির চিঠি পেয়েছি। তদন্ত কমিটি আমাকে ডেকেছে, আমি তাদের সঙ্গে কথা বলছি। পরে আপনার সঙ্গে কথা বলব বলে ফোন রেখে দেন।
বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর সঞ্জয় কুমার মুখার্জী বলেন, বিশ্ববিদ্যালয়ের সোনালী ব্যাংকের শাখাসহ সকল বিভাগে তালা দিয়েছিল শিক্ষার্থীরা। এতে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনিক কর্মকর্তা ও শিক্ষকরা অবরুদ্ধ হয়ে পড়ে। পরে শিক্ষার্থীরা ভিসির আশ্বাসে আন্দোলন থেকে সরে এসে সকল বিভাগের তালা খুলে দেয়।
বিশ্ববিদ্যালয়ের রেজিস্ট্রার কৃষিবিদ ড. হুমায়ন কবীর বলেন, আমিও তদন্ত কমিটির একজন সদস্য। যৌন হয়রানির ঘটনায় তদন্ত কমিটির কাজ চলছে। সেই সঙ্গে বিশ্ববিদ্যালয়ের সুষ্ঠু পরিবেশ নিশ্চিত করতে আমরা কাজ করছি।
এ বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য (ভিসি) অধ্যাপক ড. সৌমিত্র শেখর বলেন, অভিযুক্ত দুই শিক্ষককে স্থায়ী বহিষ্কারের কথা বলে আন্দোলন থেকে তাদের সরানো হয়েছে। আগামীকাল সিন্ডিকেটের জরুরি সভা ডাকা হয়েছে। সভায় শিক্ষার্থীদের দাবির বিষয়ে আলোচনার হবে। সেই সিদ্ধান্তের আলোকে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
এ বিষয়ে ত্রিশাল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. কামাল হোসেন বলেন, অবরোধের খবর পেয়ে ঘটনাস্থলে আসি। আন্দোলনের ঘণ্টাখানেক পরে শিক্ষকদের আশ্বাসে শিক্ষার্থীরা মহাসড়ক থেকে সরে আসে। পরে যান চলাচল স্বাভাবিক হয়।
বিশ্ববিদ্যালয় সূত্র জানায়, অনৈতিক প্রস্তাবে রাজি না হওয়ায় এক ছাত্রীকে অনুপস্থিত দেখিয়ে পরীক্ষায় জরিমানা আদায়, নম্বর কম দেওয়া ও থিসিস পেপার আটকে যৌন হয়রানি করার অভিযোগ উঠে মানবসম্পদ ও ব্যাবস্থাপনা বিভাগের সহকারী অধ্যাপক সাজন সাহার বিরুদ্ধে। এ ঘটনার বিচার দাবিতে গত কয়েক দিন ধরে আন্দোলন শুরু করে অভিযুক্ত শিক্ষকের বিচার দাবি করে ওই বিভাগের ১৩তম ব্যাচের শিক্ষার্থীরা। এ ঘটনায় বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন ট্রেজারার ড. আতাউর রহমানকে প্রধান করে ৫ মার্চ তিন সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করে। কিন্তু এই কমিটি গঠনের একদিন পর ৬ মার্চ আন্দোলনকারীরা মানবসম্পদ ব্যবস্থাপনা বিভাগের ফটকে তালা ঝুলিয়ে দেয়। এ সময় তারা ওই বিভাগের শিক্ষকদের নেমপ্লেট ভাঙচুর করে ও বিভাগীয় প্রধান রেজুয়ান আহমেদ শুভ্রকে যৌন হয়রানির ঘটনায় প্রশ্রয় দেওয়ার অভিযোগ তুলে তাকেও তদন্তের আওতায় আনার দাবি জানায়। পরে দাবি মেনে তদন্ত কমিটি পুর্নগঠন করে রেজুয়ান আহমেদ শুভ্রকেও তদন্তের আওতায় নেয় বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন।
জেবি