দেশ টেলিভিশন লিমিটেড, কর্ণফুলী মিডিয়া পয়েন্ট, ৪২, শহীদ সাংবাদিক সেলিনা পারভীন সড়ক, মালিবাগ, ঢাকা-১২১৭, বাংলাদেশ।
টেলিফোন: +৮৮ (০২) ৮৩৩২৯৫৮, ৮৩৩২৯২২ ফ্যাক্স: +৮৮ (০২) ৮৩৩২৯৮১ মেইল: [email protected]

২০১৬ সালে শৃঙ্খলা ভঙ্গের দায়ে নৌ-বাহিনীর অফিস সহায়ক পদ থেকে চাকরি হারিয়ে মহিদুল ইসলাম নামের এক যুবক হয়ে উঠেন ভয়াবহ প্রতারক। একটি নয়, দুটি নয় একে একে প্রতারণার মাধ্যমে ১৩টি বিয়ে করেন। বিয়ে করেই শ্বশুড়বাড়ির লোকজনকে প্রলোভন দেখিয়ে ধাপে ধাপে হাতিয়ে নেন প্রায় অর্ধকোটি টাকা। গত শুক্রবার গোয়েন্দা পুলিশ এমন এক প্রতারককে গ্রেপ্তার করলে বেরিয়ে আসে চাঞ্চল্যকর তথ্য।
ভুক্তভোগীরা জানান, নৌ-বাহিনীর সদস্য পরিচয়ে প্রথমে বিয়ে তারপর বিভিন্ন লোভনীয় প্রলোভন দেখিয়ে পরিবারের কাছ থেকে টাকা হাতিয়ে নেওয়ায় ছিল গ্রেপ্তারকৃত মহিদুল ইসলাম ওরফে মইদুলের উদ্দেশ্য। প্রত্যেক পরিবার থেকে কমপক্ষে ৩ লাখ টাকা থেকে শুরু করে ১০ লাখ টাকা পর্যন্ত হাতিয়ে নিয়েছেন। এবার তিনি ১৪তম বিয়ের প্রস্তুতি নিতে গিয়ে ভুক্তভোগী এক নারীর অভিযোগে গোয়েন্দা পুলিশের হাতে গ্রেপ্তার হন। মইদুলের গ্রেপ্তারের খবরে শনিবার ময়মনসিংহ জেলা গোয়েন্দা কার্যালয়ে এসে হাজির হন প্রতারিত ছয় স্ত্রী ও তাদের পরিবার।
অনার্স সম্পন্ন করা প্রতারণার শিকার এক নারী বলেন, তাদের বাড়ির পাশের এক ঘটকের মাধ্যমে মইদুল প্রথমে বিয়ের প্রস্তাব পাঠায়। পরিবারের লোকজন প্রথমে রাজি না হলেও তার জুড়ালো সুপারিশে একমাস পর রাজি হয়ে যায়। কারণ ছিল ছেলে নৌ-বাহিনীতে চাকরি করে। সে তখন তার পোশাক পড়া ছবিও পাঠায়। নদী ভাঙনে বাড়িঘর ভেঙে যাওয়াসহ তার বাবা-মা মারা যাওয়ায় সে তার চাচাতো ভাই পরিচয়ে একজনকে নিয়ে গেলে ২০২৩ সালের ১০ সেপ্টেম্বর বিয়ে সম্পন্ন হয়।
বিয়ের পরপরেই সে আশুলিয়ায় জমি কিনছে বলে পরিবারের কাছ থেকে চার লাখ টাকা নিয়ে যায়। দুই মাস পনের দিন পরপর বাড়িতে যাতায়াত ছিল তার। এরপর থেকে সে খুব একটা আসতো না। এরপর অসুখ ও নতুন বাসায় ফার্নিচার কিনবে বলে আরও দুই লাখ টাকা নেয় আমার পরিবারের কাছ থেকে।
তিনি আরও বলেন, হঠাৎ একদিন আমাদের পাশ্ববর্তী ইউনিয়নে এমন পাত্রের কাছে একটি মেয়ের বিয়ে হয়েছে সে বিষয়টি শুনে তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করে জানতে মইদুল সেখানেও বিয়ে করেছে। পরে খোঁজ খবর নিতে মানিকগঞ্জে তার বাড়িতে যাই। সেখানে গিয়ে তার মাকে পাই। কিন্তু সে চাকরি করে না সেটা নিশ্চিত হই। আজকে ডিবি অফিসে এসে জানতে পারি সে ১৩টি বিয়ে করেছে। এখন যা হওয়ার তাই হয়েছে। আমাদের দাবি তার কঠিন বিচার হোক। যেন আর কোনো মেয়ের জীবন এভাবে নষ্ট না হয়।
আরেক ভুক্তভোগী নারী বলেন, বাবা-মায়ের তিন মেয়ের মধ্যে আমি সবার ছোট। বাকি দুই বোনের সরকারি চাকরীজীবী ছেলের সঙ্গে বিয়ে হয়েছে। তাই বাবা-মা আমাকে সরকারি চাকরি করে এমন ছেলে মইদুলের কাছে বিয়ে দিয়েছে। বাবা-মাকে ম্যানেজ করে তাড়াহুড়া করে মইদুল আমাকে বিয়ে করে। বিয়ের পর জমি কিনছে বলে বাবার কাছ থেকে দুই লাখ টাকা ধার নেয় সে। এরপর আমার এক আত্মীয়কে চাকরি দেওয়ার কথা বলে আরও কয়েক লাখ টাকা নেয়। মোট আট লাখ টাকা সে নেয়। পরে যোগাযোগ বন্ধ করে দেয়। ডিবি অফিস থেকে তাকে গ্রেপ্তারের বিষয়টি অবগত করলে আমরা এসে জানতে পারি সে সব মিলিয়ে ১৩টি বিয়ে করেছে। তার কাছ থেকে টাকা উদ্ধারসহ যেন কঠিন বিচার হয় এটাই আমাদের দাবি।
সুখের আশায় প্রতারকের সঙ্গে সন্তানদের বিয়ে দিয়ে এখন নিঃস্ব হয়ে অনুশোচনায় ভুগছেন জন্মদাতা এক পিতা। তিনি বলেন, মেয়ে বিয়ে দিয়ে যে প্রতারণার শিকার হব তা ভাবতে পারেনি। নিজেকে আজকে খুব অসহায় মনে হচ্ছে। আমার মেয়েটা অনেকটা প্রতিবন্ধী। সে মেয়েটার কপাল এমন হবে ভাবতে পারেনি। লোভের মধ্যে পড়ে মেয়েটার জীবনটা আমি শেষ করে দিলাম। মইদুল আমার কাছ থেকে কিছু টাকা নেওয়ার পরে আর যোগাযোগ রাখেনি। অসহায় পিতা হিসেবে আমার একটাই দাবি সে যেন কোনোভাবে পার না পায়।
ময়মনসিংহ জেলা পুলিশ সুপার মাছুম আহাম্মেদ ভূঞা বলেন, এক ভুক্তভোগী নারী ও তার পরিবারের অভিযোগের প্রেক্ষিতে জেলা গোয়েন্দা পুলিশ অভিযানে নামে। প্রযুক্তির সহায়তায় গত শুক্রবার রাতে গাজিপুর জেলার চন্দ্রা এলাকায় অভিযান চালিয়ে প্রতারক মহিদুল ইসলামকে এবং ঘটক সহযোগী কুদ্দুস আলীকে তারাকান্দা থেকে গ্রেপ্তার করা হয়। এছাড়াও তার কাছ থেকে প্রতারণা করার কিছু ছবি এবং আইডি কার্ড উদ্ধার করা হয়। তাদের বিরুদ্ধে প্রতারণার মামলা করা হয়েছে।
প্রতারক মহিদুল ইসলাম মানিকগঞ্জ জেলার দৌলতপুর থানার মোহাম্মদ আলীর আলীর ছেলে। বিগত কয়েক বছরে প্রতারণা করে ময়মনসিংহে ৬টি, মানিকগঞ্জ ও টাঙ্গাইলে ৩টি করে এছাড়া কিশোরগঞ্জে ১টি বিয়ে করেন। বিয়ে করে পরিবারের কাছ থেকে লোভনীয় প্রলোভন দেখিয়ে ৫০ লাখ টাকার মতো হাতিয়ে নিয়েছে।
তিনি আরও বলেন, সার্বিক বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে আরও গভীরে গিয়ে তদন্ত করা হচ্ছে। নিজ সন্তানদের বিয়ের ব্যাপারে পরিবারকে আরও সচেতন হওয়ার পরামর্শ দেন পুলিশ সুপার।
জেবি