দেশ টেলিভিশন লিমিটেড, কর্ণফুলী মিডিয়া পয়েন্ট, ৪২, শহীদ সাংবাদিক সেলিনা পারভীন সড়ক, মালিবাগ, ঢাকা-১২১৭, বাংলাদেশ।
টেলিফোন: +৮৮ (০২) ৮৩৩২৯৫৮, ৮৩৩২৯২২ ফ্যাক্স: +৮৮ (০২) ৮৩৩২৯৮১ মেইল: [email protected]

মধ্য রাত। চারপাশে ঘন কুয়াশা। লঞ্চ-ফেরি চলাচল বন্ধ। নিরবতা ফেরি ঘাটগুলোতে। ফেরি ঘাটে অবস্থিত বেশির ভাগ দোকান-হোটেল বন্ধ। ফেরি ঘাটে দাঁড়ানো গাড়ির সংখ্যা ৩-৪টি। পল্টুনে ২টি রোরো ফেরি প্রায় ৩০টি পণ্যবাহী ট্রাক ও যাত্রীবাহী বাস নিয়ে নোঙ্গর করে আছে। দুই-একটি দোকানে আলো জ্বলছে। তবে ঘন কুয়াশার কারণে আলো নিবু নিবু মনে হচ্ছে। ঘন কুয়াশায় চারদিকে সব অস্পষ্ট। পাশে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষও দেখা যাচ্ছে না। অপ্রয়োজনীয় মানুষ বাইরে নেই।
এরই মধ্যে দক্ষিণ-পশ্চিঞ্চলের প্রবেশদ্বার খ্যাত রাজবাড়ীর দৌলতদিয়ার ৭ নম্বর ফেরিঘাটের পাশে একটি দোকানের সামনে আলো জ্বলছে। এগিয়ে গিয়ে দেখা যায় ষাটোর্ধ্ব এক নারী। পিঠা বানিয়ে বিক্রি করছেন।
পিঠা দোকান ঘিরে বিভিন্ন বয়সী ৪-৫ জন মানুষ। কেউ পিঠা খাচ্ছে এবং কেউ খাওয়ার জন্য দাঁড়িয়ে আছে। তবে পাশে একটি ছোট্ট পিরিতে বসে পিঠা খাচ্ছেন পরিপাটি এক ব্যক্তি। পিঠাওয়ালী বৃদ্ধ মহিলার দিকে এগিয়ে যেতে দেখা যায় গোয়ালন্দ উপজেলা নির্বাহী অফিসার জ্যোতি বিকাশ চন্দ্র। বৃদ্ধ মহিলার পাশে বসে পিঠা খাচ্ছেন। তখনও এই বৃদ্ধ মহিলা জানেন বা চেনেন না তার পাশে বসে কে পিঠা খাচ্ছেন। তবে পিঠাওয়ালী বৃদ্ধ মহিলা খুশি কারণ একসঙ্গে অনেক পিঠা বিক্রি হচ্ছে। আবার ভয়ও পাচ্ছেন। কারণ পিঠা খেয়ে টাকা দেবে কিনা?
উপজেলা নির্বাহী অফিসার এবং তার সঙ্গীয় ৪-৫জন ও স্থানীয় বয়স্ক ব্যক্তিদের মিলে ১০-১২ জন হয়েছে। মধ্য রাতে ঘন কুয়াশায় চারদিক। এমন সময় পদ্মা নদীর পারে পথ পিঠা উৎসব জমে উঠেছে। পিঠা উৎসবে মধ্যমনি গোয়ালন্দ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা জ্যোতি বিকাশ চন্দ্র। সবাই তীব্র শীতে পিঠা বানানোর পাশে কেউ দাঁড়িয়ে আবার কেউ বসে। নানা রকম ভর্তা ও বাটা দিয়ে পিঠা খাওয়া উৎসব জমে উঠেছে। উপস্থিত সকলে অগণিত পিঠা খাচ্ছেন। পাশাপাশি সকলে পাল্লা ধরে স্মৃতিচারণ করছেন। গল্পের কোনো কমতি নেই। কারণ তখনও কেউ ইউএনও সাহেবকে চিনতে পারেনি।
খাওয়ার একপর্যায়ে পিঠাওয়ালীর সঙ্গে কথা হয়। আঁচল দিয়ে মুখ ঢেকে তিনি বলেন, প্রয়োজনের তাগিদে ফেরি ঘাটে পিঠা বিক্রি করতে হচ্ছে। এই বয়সে শীতের মধ্যে এখানে থাকার কথা নয়। লেপের নিচে থাকার কথা। কিন্ত পেটের যন্ত্রনায় পিঠা বিক্রি করে চলতে হচ্ছে।
এই বৃদ্ধ নারী বলেন, মাঠ ভরা জমি ছিল, গোলা ভরা ধান ছিল। গোয়াল ভরা ভরা গরু ছিল। পদ্মা নদীর ভাঙনের কারণে এখন আমার কিছু নেই। শীতে রাতে পিঠা বিক্রি করে চলতে হয়। অভাবের কারণে একটি কম্বল কিনতে পারি না।
প্রায় দুই ঘণ্টাব্যাপী মধ্য রাতে পিঠা উৎসবে রাজবাড়ী জেলার গোয়ালন্দ উপজেলা নির্বাহী অফিসার উপস্থিত স্থানীয় সকলের সঙ্গে এভাবেই মতবিনিময় করলেন। শুনলেন সকলের দুঃখের কথা। উপস্থিত মতবিনিময়ে শেষ পর্যায়েও কেউ বুঝতে পারেনি তারা কার সঙ্গে কথা বলছেন। এরও কিছু কারণ ছিল। কারণ নির্বাচনি বদলি হয়ে তিনি গোয়ালন্দ উপজেলায় যোগদান করেছেন। সাধারণ মানুষের সঙ্গে পরিচয় হওয়ার সময়-সুযোগ পায়নি।
দেখতে দেখতে ঘড়ির কাঁটায় দুটা বেজে গেল। চারপারে নিরবতা আরও বেশি হচ্ছে। ঠিক তখন গোয়ালন্দ উপজেলা নির্বাহী অফিসার আনসার ও অফিস সহকারীর দিয়ে গাড়ি থেকে কম্বল নিয়ে সকলের মধ্যে বিতরণ করলেন এবং তার পরিচয় দিলেন।
বৃদ্ধ পিঠাওয়ালীকে দুই হাজার টাকা দিয়ে ২০০ দুধ পিঠার অর্ডার দিলেন। নিজের মোবাইল নাম্বার দিয়ে চলে গেলেন। উপস্থিত সকলে গাড়ির দিকে তাকিয়ে রইলেন। চলে যাওয়ার পূর্বের সকলের উদ্দ্যেশে তিনি বলেন, যেকোনো প্রয়োজনের আমার অফিসে চলে আসবেন। তবে কারও সহযোগিতা নিয়ে নয়। আমি আপনাদের সেবায় সার্বক্ষণিক নিয়োজিত। আমি আপনাদের কর্মচারী। আমার অফিসে আসার জন্য কোনো অনুমতির প্রয়োজন নেই।
জেবি