দেশ টেলিভিশন লিমিটেড, কর্ণফুলী মিডিয়া পয়েন্ট, ৪২, শহীদ সাংবাদিক সেলিনা পারভীন সড়ক, মালিবাগ, ঢাকা-১২১৭, বাংলাদেশ।
টেলিফোন: +৮৮ (০২) ৮৩৩২৯৫৮, ৮৩৩২৯২২ ফ্যাক্স: +৮৮ (০২) ৮৩৩২৯৮১ মেইল: [email protected]

রেলের শহর রাজবাড়ী। রেল ঘিরে গড়ে উঠেছে শহর। রেল বাদ দিয়ে রাজবাড়ী শহর কল্পনা করাও অসম্ভব। তবে অযন্ত্রে-অবহেলায় রেলস্টেশনগুলো আজ বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। বন্ধ হয়ে গেছে প্রাচীনতম রেলস্টেশন গোয়ালন্দ বাজার।
সেই রেলের শহর হিসেবে পরিচিত রেলমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পেয়েছেন রাজবাড়ী-২ সংসদীয় আসনের সংসদ সদস্য জিল্লুল হাকিম।
রাজবাড়ী জেলাবাসীর দীর্ঘদিনের অপেক্ষার পালা শেষ। রাজবাড়ীবাসীর প্রাণের দাবি রেলমন্ত্রী জিল্লুল হাকিমের হাতের ছোঁয়ায় জৌলুস ফিরে পাবে ব্রিটিশ আমলের প্রতিষ্ঠিত রেলের যৌবন। ইতিহাস ঘেঁটে এবং শতবর্ষী বয়সীদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, ঊনবিংশ শতাব্দিতে ইংল্যান্ডের বিভিন্ন রেল কোম্পানী ভারতবর্ষে শুধু অর্থনৈতিক কাজের রেলপথ চালু করে। তখন থেকে রেলকে ঘিরে রাজবাড়ী শহর গড়ে উঠেছে। যোগাযোগ ও ব্যবসা-বাণিজ্যের জন্য এ অঞ্চল বেশ গুরুত্বপূর্ণ হওয়ায় বর্তমান রাজবাড়ী জেলা শহরে রাজা সূর্যকুমারের কাচারির পাশে রাজবাড়ী রেলপথ ও স্টেশন নির্মিত হয়।
১৬৬৬ খ্রিস্টাব্দে নবাব শায়েস্তা খান ঢাকায় সুবাদার নিযুক্ত হয়ে আসেন। সেই সময় এই অঞ্চলে পর্তুগীজ জলদস্যুদের দমনের জন্যে তিনি সংগ্রাম শাহকে নাওয়ারা প্রধান করে পাঠান। তিনি জেলার বানিবহতে স্থায়ীভাবে বসবাস করতেন এবং লালগোলা নামক স্থানে দুর্গ নির্মাণ করেন। লালগোলা দুর্গ রাজবাড়ী শহরের কয়েক কিলোমিটার উত্তরে। বর্তমান লালগোলা একটি পরিচিত এলাকা। সংগ্রাম শাহ্ ও তার পরিবার পরবর্তীতে বানিবহের নাওয়ারা চৌধুরী হিসেবে পরিচিত হয়ে ওঠেন। এল.এন.মিশ্র পুস্তকে উল্লেখ করেন যে, রাজা সংগ্রাম শাহের রাজ দরবার বা রাজকাচারী ও প্রধান নিয়ন্ত্রণকারী অফিস বর্তমান রাজবাড়ী এলাকাকে কাগজ-কলমে রাজবাড়ী লিখতেন
রাজবাড়ী রেল স্টেশনটি ১৮৯০ সালে স্থাপিত হয়। ঐতিহাসিক আনন্দনাথ রায় ফরিদপুরের ইতিহাস পুস্তকে বানিবহের বর্ণনায় লিখেছেন নাওয়ারা চৌধুরীগণ পাঁচথুপি থেকে প্রায় ৩০০ বছর পূর্বে বানিবহে এসে বসবাস শুরু করেন। বানিবহ তখন ছিল জনাকীর্ণ স্থান। বিদ্যাবাগিশ পাড়া, আচার্য পাড়া, ভট্টাচার্য পাড়া, শেনহাটিপাড়া, বসুপাড়া, বেনেপাড়া, নুনেপাড়া নিয়ে ছিল বানিবহ এলাকা। নাওয়ারা চৌধুরীগণের বাড়ি স্বদেশীদের কাছে রাজবাড়ী নামে অভিহিত ছিল।
রাজবাড়ী রেলস্টেশন নামকরণ করা হয় ১৮৯০ সালে। বিভিন্ন তথ্য হতে জানা যায় যে, রাজবাড়ী রেলস্টেশনের নামকরণ রাজা সূর্য কুমারের নামানুসারে করার দাবি তোলা হয়। তখন বানিবহের জমিদাররা প্রবল আপত্তি তোলেন। কারণ বর্তমানে যে স্থানটিতে রাজবাড়ী রেলস্টেশন অবস্থিত এ জমির মালিকানা ছিল বানিবহের জমিদারদের। তাদের প্রতিবাদের কারণে স্টেশনের নাম রাজবাড়ী করা হয়।
১৮৮২ সালে অর্থাৎ আজ থেকে আরও ১৬১ বছর আগে ব্রিটিশ ভারত কলকাতাসহ পূর্বাঞ্চল বঙ্গ ও আসাম অঞ্চলে প্রশাসনিক, সামরিক, বাণিজ্যিক সম্প্রসারণ ও যোগাযোগে উন্নতি করতে রেল প্রচলন করা হয়েছিল। সেই বছরের ২৯ সেপ্টেম্বর ইস্টার্ন বেঙ্গল রেলওয়ে কলকাতা থেকে রাণাঘাট পর্যন্ত প্রাথমিকভাবে রেলপথ উদ্বোধন করে। পরবর্তীতে এই লাইন বর্ধিত করে ১৫ নভেম্বর ১৮৬২ সালে দর্শনা থেকে কুষ্টিয়ার জগতী পর্যন্ত ৫৩.১১ কিমি ব্রডগেজ রেললাইনের একটি শাখা উন্মোচন করা হয়। সেখান থেকে পদ্মার পাড় পর্যন্ত অর্থাৎ পদ্মা-যমুনার মিলনস্থল (সংযোগস্থল) অবস্থিত অভ্যন্তরীণ নদীবন্দর গোয়ালন্দ ঘাট পর্যন্ত ৭৫ কিমি দীর্ঘ রেললাইন উদ্বোধন করা হয় ১ জানুয়ারি ১৮৭১ সালে।
বিভিন্ন সূত্রে জানা যায়, তৎকালীন ব্রিটিশ শাসন আমলে কলকাতা ও পূর্ববঙ্গ (ঢাকা-নারায়নগঞ্জ) অঞ্চলে বাণিজ্যিক প্রসারের স্বার্থে এই রেলপথ অন্যতম বিশেষ ও শ্রেষ্ঠ মাধ্যম হিসেবে গণ্য করা হত। গোয়ালন্দ ঘাট থেকে রাজবাড়ী হয়ে দর্শনা রানাঘাট এই একটি রেলপথ ব্যবহার করে পূর্ববঙ্গ অর্থাৎ ঢাকা অঞ্চলের ব্যবসায়ীরা কলকাতায় যাতায়াত করতেন বিভিন্ন কাঁচামাল ক্রয়ের জন্য। তখন অবশ্য বাংলার দক্ষিণ পশ্চিম অঞ্চলের বাসিন্দারা যাতায়াতের সুবিধা ও সময় সাশ্রয়ের কথা ভেবে ঢাকার চেয়ে কলকাতা বেশি প্রাধান্য দিতেন।
জানা যায়, তখন কলকাতা-গোয়ালন্দ ঘাট এই রুটে দুটি ট্রেন চলাচল করত। সেই ট্রেনের একটির নাম ছিল 'ঢাকা মেইল' অপরটির নাম ছিল 'ইস্ট বেঙ্গল এক্সপ্রেস'। গোয়ালন্দ ঘাট থেকে কলকাতা এই পুরো যাত্রার সময় ছিল সব মিলিয়ে ৮ ঘণ্টার মতো। এদিকে কলকাতা-দক্ষিণ-পশ্চিম বঙ্গের সঙ্গে ঢাকা-পূর্ববঙ্গে যাতাযাত সহজতর করতে ট্রেনের সময়ের সঙ্গে মিল রেখে গোয়ালন্দ ঘাটের সঙ্গে ঢাকা-নারায়ণগঞ্জসহ দেশের গুরুত্বপূর্ণ নদী বন্দরগুলোতে সরাসরি স্টিমারে যোগাযোগ অব্যাহত রাখা হয়।
সেই সময় গোয়ালন্দ ঘাট বাংলার জলপথের মধ্যে একটি অত্যন্ত শক্তিশালী কৌশলগত অবস্থান দখল করে নেওয়ার একটিমাত্র কারণ ছিল এই রেল যোগাযোগ ব্যবস্থা।
তখন শুধু বাণিজ্যিক স্বার্থেই নয়, জনগণের ধর্মীয় অনুভূতিকে সমন্বয়ে করে রেলকে জনপ্রিয় করার নানা উদ্যোগ গ্রহণ করে রেল কর্তৃপক্ষ। দিনাক সোহানী কবিরের লেখা ‘পূর্ববাংলার রেলওয়ের ইতিহাস ১৮৬২-১৯৪৭’ গ্রন্থ থেকে জানা যায়, ১৯২৭ সালে ১ অক্টোবর গোয়ালন্দ থেকে কলকাতা পর্যন্ত একটি বিশেষ ট্রেন চলাচলের ব্যবস্থা করা হয়। পূজা উপলক্ষে ছিল এই ব্যবস্থা। গোয়লন্দ থেকে কলকাতা পর্যন্ত ১২৮ মাইল দূরত্বের জন্য নামমাত্র ভাড়া নির্ধারণ করা হয়। মাথাপিছু চার টাকা মাত্র। এই বিশেষ ট্রেনটি চারটি স্টেশনে থামার ব্যবস্থা রাখা হয়।
উল্লেখ্য, এই রেলপথে মুসলিমদের স্বার্থে প্রতিবছর রাজবাড়ী থেকে ভারতের মেদিনীপুর পর্যন্ত এখনও একটি বিশেষ ট্রেন নিয়মিত চলাচল করে।
সেই ইতিহাস ঘিরে রাজবাড়ী জেলাবাসী পেয়েছে রেলমন্ত্রী। রেলমন্ত্রী পেয়ে ঘরে ঘরে আনন্দ বয়ে যাচ্ছে। সকলের প্রত্যাশা রেলমন্ত্রী রেলের শহর রাজবাড়ীর উন্নয়ন করবেন। বন্ধ স্টেশনগুলো উন্নয়ন করবেন। দখল মুক্ত করবেন রেলের নিজস্ব জায়গা-জমি ও শতশত আবাবিক ভবন এবং প্রতিষ্ঠান।
জেবি