দেশ টেলিভিশন লিমিটেড, কর্ণফুলী মিডিয়া পয়েন্ট, ৪২, শহীদ সাংবাদিক সেলিনা পারভীন সড়ক, মালিবাগ, ঢাকা-১২১৭, বাংলাদেশ।
টেলিফোন: +৮৮ (০২) ৮৩৩২৯৫৮, ৮৩৩২৯২২ ফ্যাক্স: +৮৮ (০২) ৮৩৩২৯৮১ মেইল: [email protected]

১৬ ই ডিসেম্বর বিজয় দিবসকে সামনে রেখে ফুলের দাম বৃদ্ধি পাওয়ায় স্বস্তি ফিরেছে ফুল চাষি ও ব্যবসায়ীদের মধ্যে। ঝিনাইদহের কয়েকটি লাভজনক চাষের মধ্যে অন্যতম হল ফুল চাষ। যা ঝিনাইদহ জেলা থেকে বছরে প্রাই ২০০ কোটি টাকার উপরে বিক্রয় হয়ে থাকে। চলতি বছরে রাজনৈতিক অস্থিরতার কারণে দেশব্যাপী দফায়-দফায় হরতাল-অবরোধের কারণে ফুল চাষিরা হতাশাগ্রস্ত হয়ে পড়েছিলেন। একদিকে ফুলের চাহিদা যেমন কমছিল অন্যদিকে পরিবহন খরচ দ্বিগুন হওয়ায় পুরোপুরি লোকসানে রুপ নেয় ফুল চাষ ও ব্যবসা। হরতাল আর অবরোধের কারণে কৃষকসহ ব্যবসায়ীদের লোকসান গুনতে হচ্ছিল দিনের পর দিন।
ঝিনাইদহ সদর উপজেলার গান্না গ্রামের কৃষক নজরুল জোয়ারদার। তিনি এবার ৩০ শতক জমিতে ২০ হাজার টাকা লগ্নি করে গাঁদা ফুল লাগিয়েছিলেন। আশা ছিল লাভের মুখ দেখবেন। দফায়-দফায় হরতাল অবরোধের কারণে লোকসানে ছিলেন তিনি। ফুল পচনশীল হওয়ায় পরবর্তী ফলন বাঁচাতে তিনি ও তার ছেলে দুজনে মিলে ফুল তুলে ফেলে দিতে বধ্য হয়েছিলেন। তিনি হতাশাই ভুগছিলেন। প্রান্তিক এই কৃষকের এ বছর ফুলের ফলন ভালো হয়েছিল কিন্তু দেশের রাজনীতি তাকে হতাশায় ফেলে দিয়েছিল। তবে হঠাৎ করেই ছয়দিনের ব্যবধানে তার পুরো দুশ্চিন্তা দূর হয়ে গেছে। ছয় দিন আগে এক ঝুপা ফুল বিক্রয় করেছেন ৪০-৫০ টাকা সেই ফুল সপ্তাহ ঘুরতেই ২৫০ থেকে ৪৫০ টাকা পর্যন্ত বিক্রয় করছেন। এতে করে বিগত দিনের লোকসান কাটিয়ে উঠতে পারবেন বলে মনে করেন তিনি।
সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, সকালে ভোরের সূর্য ওঠার আগেই কৃষকেরা তাদের উৎপাদিত ফুল গান্না ফুল বাজারে নিয়ে আসছে। এক ঘণ্টার ব্যবধানে সব ফুল বিক্রি শেষ। এরপর ব্যবসায়ীরা সেগুলোকে প্রক্রিয়ার মাধ্যমে ঢাকা, চট্টগ্রামসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে পাঠানোর জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছেন।
কৃষক ও স্থানীয় ব্যবসায়ীদের থেকে জানা যায়, এক সপ্তাহ আগে যে গাঁদা ফুল বিক্রি হয়েছিল ৪০-৫০ টাকা ঝুপা। সেই ফুলের দাম বৃদ্ধি পেয়ে বিক্রয় হচ্ছে ২৫০ থেকে ৪০০ টাকা ঝুপা। এভাবে অন্যান্য ফুলের দামও বৃদ্ধি পেয়েছে। এতে সাধারণ কৃষক ও ব্যবসায়ীরা কিছুটা হলেও লোকসান কাটিয়ে উঠতে পারবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
কৃষকেরা বলছে, সনাতন ধর্মালম্বীদের দীর্ঘদিন পর বিবাহ বেড়েছে। এছাড়া বিজয় দিবস ও বিভিন্ন অনুষ্ঠানের আমেজ শুরু হয়েছে। যার কারণে হঠাৎ করেই ফুলের দাম বৃদ্ধি পেয়েছে। এছাড়া নভেম্বরের শেষ দিকে হঠাৎ বৃষ্টির কারণে ক্ষেতেই বেশির ভাগ ফুল নষ্ট হয়ে যায়। যার ফলে উৎপাদনও কমে যায়। একদিকে ফুলের উৎপাদন কম অন্যদিকে বিজয় দিবসকে ঘিরে ফুলের চাহিদা বৃদ্ধি এ কারণে ফুলের বাজার বৃদ্ধি পেয়েছে।
দেশের সবচেয়ে বড় গাঁদা ফুলের বাজার গান্না ফুল বাজার। গান্না ফুল ব্যবসায়ী সমিতির সাধারণ সম্পাদক নজরুল ইসলাম বলেন, আমি ফুল চাষি ও গান্না ফুল বাজারে ব্যবসা করি। আগে ঢাকায় এক গাড়ি ফুল পৌঁছাতে খরচ হতো ১৮-২০ হাজার টাকা। সেখানে রাজনৈতিক অস্থিরতায় বর্তমানে ব্যবসায়ীদের গুণতে হচ্ছে ৩০-৩২ হাজার টাকা। তারপরও গাড়ি পাওয়া যাচ্ছে না।
অবরোধের কারণে গাঁদা ফুল প্রতি ঝোপা (১০ চোইন) বিক্রি হয়েছে ৪০ থেকে ৫০ টাকা দরে। রিতিমত ধস নেমেছিল ফুল ব্যবসায়। বিজয় দিবসকে ঘিরে ছয় দিনে পুরো ফুল বাজারে আগুন। ছয় দিনে এক বিঘা জমি থেকে ১ লাখ ৫০ হাজার টাকার ফুল বিক্রি করেছি। এখনও মাঠে ফুল রয়েছে। বিগত দিনে যে লোকসান হয়েছে তা কাটিয়ে উঠতে পারব।
পাইকারি ফুল ব্যবসায়ী সোহাগ হোসেন জানান, শুধু কৃষকই না অবরোধের কারণে লোকসানের সম্মুখীন হচ্ছে ফুল ব্যবসায়ীরাও। ১৬ই ডিসেম্বর ও সনাতন ধর্মাবলম্বীদের বিয়ের লগ্ন চলায় ব্যবসা বেড়েছে। এতে করে ঝিনাইদহের আশপাশের জেলাসহ ঢাকা, চট্টগ্রাম, রাজশাহী, সিলেটসহ বিভিন্ন জায়গায় ফুল যাচ্ছে। গান্না বাজার থেকে প্রতিদিন দেড় থেকে দুই কোটি টাকার ফুল ক্রয়-বিক্রয় হচ্ছে। তবে চাহিদার বিপরীতে যোগান কিছুটা কম।
ঝিনাইদহ গান্না বাজার ফুল ব্যবসায়ী সমাবায় সমিতির সভাপতি ও ফুল চাষী মো. জামির হোসেন বলেন, এক সপ্তহ আগেও দেশে রাজনৈতিক অস্থিরতা, দফায়-দফায় হরতাল অবরোধের কারণে ফুলের বাজার অনেক কম ছিল। আবার গাড়ি ভাড়াও বেশি ছিল। কৃষক এবং ব্যবসায়ীরা হতাশায় ভুগছিল। যেখানে গত এক সপ্তাহ আগেও জারবারা ফুল বিক্রয় হয়েছিল ৮-১০ টাকা, রজনীগন্ধা ৩-৪ টাকা, গোলাপ ৬-৭ টাকা, গাঁদা প্রকার ভেদে ৪০, ৫০, ৮০, ১০০ টাকা বিক্রি হয়েছে। সেখানে বিজয় দিবস উপলক্ষে এবং হিন্দুদের বিয়ের লগ্ন আসায় ফুলের চাহিদা ব্যপক বৃদ্ধি পেয়েছে। গাড়ি ভাড়া বেশি হলেও বর্তমানে পাইকারি বাজারে গাঁদা ফুল বিক্রি হচ্ছে ৩০০ থেকে ৪৫০ টাকা ঝুপা, জারবারা ২০-২৫ টাকা, রজনীগন্ধা ৮-১০ টাকা, চন্দ্রমল্লিকা ৩-৪টাকা, গোলাপ ১৫ থেকে ২০ টাকা বিক্রি হচ্ছে। যা গত সপ্তাহের চেয়ে কয়েক গুন বেশি।
ঝিনাইদহ কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক আজগর আলী জানান, জেলায় ২৫৪ হেক্টর জমিতে ফুলের আবাদ হয়েছে। ঝিনাইদহ সদর উপজেলা, কালীগঞ্চ, কোটচাঁদপুর, মহেশপুর ও হরিণাকুন্ডু উপজেলাতে বেশি ফুল চাষ হয়। বর্তমানে গাঁদা ফুলের চাষ সব থেকে বেশি। এর পাশাপাশি জারবেরা, চন্দ্রমল্লিকা, রজনীগন্ধা ও গোলাপের চাষও ব্যপক হারে বেড়েছে।
এ বছর ফুলের চাষও অনেক ভালো হয়েছে। হরতাল ও বৃষ্টির কারণে ফুল চাষিরা কিছুটা ক্ষতিগ্রস্ত হলেও বিজয় দিবসকে ঘিরে এক সপ্তাহে যে বাজার পেয়েছে কৃষক তা পূর্বের লোকসান কাটিয়ে উঠবে। এই জেলা থেকে আরও উন্নত ও মানসম্মত ফুল চাষে কৃষিবিভাগের পক্ষ থেকে নিয়মিত কৃষকদের নানা পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে।
জেবি