দেশ টেলিভিশন লিমিটেড, কর্ণফুলী মিডিয়া পয়েন্ট, ৪২, শহীদ সাংবাদিক সেলিনা পারভীন সড়ক, মালিবাগ, ঢাকা-১২১৭, বাংলাদেশ।
টেলিফোন: +৮৮ (০২) ৮৩৩২৯৫৮, ৮৩৩২৯২২ ফ্যাক্স: +৮৮ (০২) ৮৩৩২৯৮১ মেইল: [email protected]

কুমিল্লার মুরাদনগর উপজেলার ২২টি ইউনিয়নের ৩০৮টি গ্রামের মধ্যে দিয়ে প্রবাহিত গোমতী নদী, তিতাস নদী, বুড়ি নদী, আর্সি নদী, অদের খাল, কার্জনখাল, মিরের খাল, মরিচা খাল ও জলাশয়ে ছিল ভরপুর। এসব নদী খাল ও জলাশয় মানচিত্রে আছে। নদী, খাল-বিল জলাশয় বিলীন হয়ে গেছে। খালগুলো খণ্ড খণ্ড বাঁধ দিয়ে ভরাট করে ফেলেছে যে যার বাড়ির সামনে।
জাতীয় নদী রক্ষা কমিশনের ওয়েবসাইটে নদী দখলদারদের সর্বশেষ তালিকা বলছে, এ দেশের ৬৪ জেলার মধ্যে সবচেয়ে বেশি নদী, খাল- বিল দখল হয়েছে কুমিল্লা জেলার মুরাদনগর উপজেলায় । সারাদেশে দখলদারের সংখ্যা ৩৯ হাজার আর কুমিল্লায় পৌনে তিন হাজার।
পানি উন্নয়ন বোর্ডের জরিপ বলছে, মুরাদনগরে ছোট-বড় মিলে ক,খ ও গ ক্যাটাগরিতে খাল দখল হয়েছে ১৭১টি । ওই সব নদী খাল বিলে আষাঢ় ও শ্রাবণ মাসে নদী-নালা-খাল-বিল পানিতে ভরে যেত। চৈত্র-বৈশাখ মাসে খাল-বিলের পানি শুকিয়ে গেলেও নদীতে পানি থাকতো। ভারি বর্ষা হলে পানিতে নদী-নালা, খালবিল পানিতে তলিয়ে যেত। সর্বত্রই ছিল নৌকার বিচরণ। নৌকা ছাড়া মালামাল বাহনের কথা ভাবাই যেত না। নৌকার ছিল ভিন্ন ভিন্ন নাম ডিঙ্গি, ডোঙা, কোষা, সাম্পান, গয়না, ময়ূরপঙ্খী,পানসী ও ছুঁইওয়ালা। নৌকায় কম খরচে মালামাল আনা নেওয়া হত। বর্ষাকালে জেলে নৌকা দিয়ে মাছ ধরে জীবিকা নির্বাহ করতো।
স্থানীয় মৎস্যজীবীরা এজমালি জলাভূমির ওপর নির্ভর করতেন। ১৯৯০ সালের পর থেকে জলাভূমির ওপর অত্যাচার বাড়তে থাকে । যেই বিলের আকার একশ বিঘার ছিল। লুট হয়ে এখন তা পঞ্চাশ বিঘাতে এসে ঠেকেছে। খণ্ড খণ্ড বাঁধে দখলে হয়েছে বিলের সঙ্গে থাকা জলাশয়। বিলের পানিতে শাপলা, নৌকা, মাঝি মাল্লা এখন নতুন প্রজন্মের কাছে ইতিহাস।
সূত্রে জানা যায়, কোম্পানীগঞ্জ বাজারের সঙ্গে সংযোগ খাল ছিল ‘মিরের খাল’ ও নগরপাড় মৌজার সাবেক ৩০৪ দাগের একটি খাল। এই দুটি খাল দিয়ে নৌকা চলতো। নারায়ণগঞ্জ, নরসিংদী, ব্রাহ্মণবাড়িয়া ও ভৈরব থেকে মানুষ নৌকায় এই বাজারে আসা-যাওয়া করতো। স্থানীয় প্রভাবশালী ব্যক্তিরা বিভিন্ন রাজনৈতিক ছত্রছায়ায় খাল দখল করে বাসা-বাড়ি, দোকান পাট নির্মাণ করে রেখেছেন। যার ফলে বৃষ্টি হলেই তলিয়ে যায় বাজার ও রাস্তাঘাট। সৃষ্টি হয় জলজট।
একসময় গোমতীর শাখা ছিল ‘বুড়ি নদী’। এই নদী নিয়ে স্থানীয়দের রয়েছে অনেক সুখ ও দুঃখের গল্প। বুড়ি নদী গুঞ্জর গ্রাম থেকে শুরু হয়ে দেবিদ্বার উপজেলা রসুলপুর গ্রাম হয়ে মুরাদনগর উপজেলার টনকী গ্রাম ও আন্দিকোট ইউনিয়ন হয়ে নবীনগর লঞ্চঘাট সংলগ্ন তিতাসে গিয়ে পতিত হয়েছে। বিশাল এই নদীটি দখল-দূষণে প্রায় মৃত।
‘আর্সি নদী’ বুড়ি নদীর শাখা থেকে যার উৎপত্তি । নদীটি দেবিদ্বার উপজেলার বড়শালঘর গ্রাম থেকে মুরাদনগরের মেটঘর গ্রাম দিয়ে ব্রাক্ষণবাড়িয়া জেলার বাঞ্ছারামপুর উপজেলা তিতাস নদীতে গিয়ে মিশেছে।
কৃষকরা জানান, আর্সি নদীর মুরাদনগরের বিভিন্ন আন্দিকোট গুচ্ছ গ্রামের পাশে দুটি বাঁধ দিয়ে দখল হয়ে গেছে। যার ফলে তারা সময় মতো জমিনে পানি দিতে ও সরাতে পারেন না। নদীটির বিভিন্ন জায়গায় বাঁধ দেওয়ার ফলে এখন আর নৌকা চলে না।
উপজেলার জেলেরা বলেন, খাল-বিল, নদী-নালা উদ্ধারে সরকারের জোরালো ভূমিকা দরকার। এগুলো কোনো ব্যক্তির মালিকানা নয়, প্রাকৃতিক সম্পদ। খালগুলো দখল হয়ে যাওয়ায় আমরা কোথাও জাল ফেলতে পারি না। জেলেরা যেন প্রাকৃতিক জলাভূমিতে মাছ ধরে জীবিকা নির্বাহ করতে পারেন এই ব্যবস্থা করতে হবে।
উপজেলার স্থানীয় কৃষক মিজান মিয়া বলেন, আলীর চর গ্রামে দুটি খাল তারের শরীফ ও মরহুমের খাল দখল হয়ে গেছে এগুলো খনন করা প্রয়োজন।
খামার গ্রাম থেকে কাউছার আলম বলেন, বাঙ্গরা পূর্ব ইউনিয়নের খামার গ্রাম পশ্চিম পাড়ার খালটি দখলে বন্ধ হয়ে গেছে।
মিজান সরকার, মিজা শহিদুল হাসান বলেন, রগুরামপুর গ্রাম যাত্রাপুর গ্রামের পূবপাড়া হয়ে যাত্রাপুর পশ্চিম পাড়া মিজাবাড়ীর হয়ে কামাল্লা বিলে যায় খালটি দখল করে রেখেছেন প্রভাবশালীরা।
কামাল সরকার বলেন, মধ্যনগর মসজিদের সামনের খালসহ এলকার প্রায় সব খাল ভরাট করা হয়ে গেছে। যার কারণে জায়গায় জায়গায় পানি আটকিয়ে থাকে । কৃষিজমি চাষাবাদ ব্যাহত হচ্ছে। শ্রীকাইল ইউনিয়নের পিঁপড়িয়া মৌজার বিএস ৮২৫ দাগের পিঁপড়িয়া থেকে স্বল্পা খালটিও দখলে চলে গেছে ,বন্যা নিয়ন্ত্রণ ও কৃষির জরুরি প্রয়োজনে খালটি পুনখনন করতে আইনি সহায়তা চেয়েছেন এলাকাবাসী।
হেলাল উদ্দিন সরকার জানান, পাহাড়পুর ইউনিয়নের ৬ নম্বর ওয়ার্ডেও ভিটি পাঁচপুকুরিয়া গ্রামের মাদরাসা খাল দখল হয়ে গেছে।
আবু মুছা জানান, ১৫ নম্বর নবীপুর পশ্চিম ইউনিয়নের মিরের খাল দখল হয়েছে। এই খাল দখলের ফলে জায়গায় জায়গায় পানি জমে থাকে। এতে রাস্তাঘাট খুব অল্প সময়ে নষ্ট হয়ে যায়। গিয়াস উদ্দিন বলেন, মুরাদনগর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের পেছনে বিশাল বড় খাল ছিল। এই খাল দিয়ে নৌকায় করে রামচন্দ্রপুর বাজার, নবীনগর উপজেলা, হোমনা উপজেলার সঙ্গে জড়িত ছিল। সেই খালটি সম্পূর্ণ ভরাট হয়ে যায়।
কৃষি ও পরিবেশ ফাউন্ডেশনের চেয়ারম্যান অ্যাডভোকেট আবুল কালাম আজাদ উজ্বল বলেন, সরকারি খাল-বিল দখল করে যারা অবৈধ স্থাপনা তৈরি করছে তাদের বিরুদ্ধে জরুরি ভিত্তিতে ব্যবস্থা গ্রহণ করে খালগুলো দখলমুক্ত করা প্রয়োজন। ইউনিয়ন ভূমি অফিসগুলো নজরদারি বাড়িয়ে কাজ করলে কৃষি ও পরিবেশ রক্ষায় খাল-বিল এতো দখল হতো না।
মুরাদনগর উপজেলা কৃষি অফিসার পাভেল খান পাপ্পু বলেন, খাল দখল নিয়ে আমরা উদ্বিগ্ন। এর সংখ্যা যাই হোক না কেন, এলাকায় একটি খালও যদি ভরাট হয়ে যায় তাহলে পানিপ্রবাহ বাধাগ্রস্ত হবে। আর পানির প্রবাহ না থাকলে কৃষিজমি কমে যাবে। এছাড়া খাল দখলের কারণে জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হয়ে কৃষি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। কৃষিকে বাঁচিয়ে রাখতে দখল হওয়া খাল নিয়ে কোন সুনির্দিষ্ট অভিযোগ আসলে সংশ্লিষ্ট দপ্তরের সঙ্গে আমরা এক হয়ে সহযোগিতা করব।
মুরাদনগর উপজেলা নিবাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মোহাম্মদ আলাউদ্দীন ভূইয়া জনী বলেন, আমি এখানে নতুন যোগদান করেছি। কোথায় কী কারণে খাল দখল হয়েছে তা আমার জানা নেই। তাই কোন মন্তব্য করতে পারছি না। খোঁজখবর নিচ্ছি। সরকারি নদী, খাল দখল করার কোনো সুযোগ নেই।
জেবি