দেশ টেলিভিশন লিমিটেড, কর্ণফুলী মিডিয়া পয়েন্ট, ৪২, শহীদ সাংবাদিক সেলিনা পারভীন সড়ক, মালিবাগ, ঢাকা-১২১৭, বাংলাদেশ।
টেলিফোন: +৮৮ (০২) ৮৩৩২৯৫৮, ৮৩৩২৯২২ ফ্যাক্স: +৮৮ (০২) ৮৩৩২৯৮১ মেইল: [email protected]

বৈঠার ছন্দ, কাঁসার ঘণ্টার ধ্বনি আর মাঝি-মাল্লাদের হেঁইও রবে মুখরিত মধুমতি নদী। নদীর বুকে রঙিন নৌকার প্রতিযোগিতা, দুই তীরে লাখো মানুষের উচ্ছ্বাস- সব মিলিয়ে উৎসবের নগরে পরিণত হয় মাগুরার মহম্মদপুর। প্রতিবছর এই নৌকাবাইচ ও গ্রামীণ মেলাকে ঘিরে রোববার (১ নভেম্বর) বিকেলে মধুমতি নদীর দুই পাড়ে নামে দর্শনার্থীদের ঢল।
মাগুরা ছাড়াও আশপাশের বিভিন্ন জেলা ও উপজেলা থেকে নানা বয়সী মানুষ নৌকাবাইচ দেখতে আসেন। দর্শনার্থীদের উপস্থিতিতে নদীর দুই তীর পরিণত হয় জনসমুদ্রে। কেউ পরিবারের সদস্যদের নিয়ে, কেউ বন্ধুদের সঙ্গে, আবার কেউ দূরদূরান্ত থেকে ছুটে আসেন বাংলার ঐতিহ্যবাহী এ প্রতিযোগিতা উপভোগ করতে।
স্থানীয়দের উদ্যোগে আয়োজিত এ নৌকাবাইচকে কেন্দ্র করে দুই দিন আগে থেকেই মধুমতি নদীর দুই পাড়ে বসে গ্রামীণ মেলা। মেলায় গৃহস্থালির নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য, খাবার, মিষ্টি, শিশুদের খেলনা ও বিভিন্ন সামগ্রীর দোকান বসে। মেলা ঘিরে স্থানীয় বাসিন্দাদের পাশাপাশি দূরদূরান্ত থেকে আসা মানুষের মধ্যেও দেখা যায় ব্যাপক উৎসাহ-উদ্দীপনা।
বিকেলে নৌকাবাইচ শুরু হলে নদীর বুকে তৈরি হয় প্রতিযোগিতার উত্তেজনা। মাঝি-মাল্লাদের সমন্বিত বৈঠার টানে দ্রুতগতিতে এগিয়ে চলে রংবেরঙের নৌকাগুলো। কাঁসার ঘণ্টার শব্দ আর মাঝিদের হেঁইও রবে মুখর হয়ে ওঠে নদীর দুই পাড়। এক নৌকাকে পেছনে ফেলে অন্য নৌকার এগিয়ে যাওয়ার দৃশ্য দর্শকদের উল্লাস ও করতালিতে আরও প্রাণবন্ত হয়ে ওঠে।
আয়োজকদের ভাষ্য, মহম্মদপুরের মধুমতি নদীর এ নৌকাবাইচ ঐতিহ্য বহন করছে। প্রতিবছর এ আয়োজনকে ঘিরে স্থানীয় জনপদে উৎসবের আমেজ ছড়িয়ে পড়ে। নদীকেন্দ্রিক বাংলার লোকজ সংস্কৃতি ও গ্রামীণ ঐতিহ্য ধরে রাখার পাশাপাশি এ আয়োজন মানুষের মধ্যে সম্প্রীতি ও মিলনমেলার পরিবেশ তৈরি করে।
অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন সংস্কৃতিমন্ত্রী ও মাগুরা -২ সংসদ সদস্য অ্যাডভোকেট নিতাই রায় চৌধুরী। তিনি মেলার উদ্বোধন করেন। পুলিশ সুপার মোল্লা আজাদ হোসেন, জেলা পরিষদের প্রশাসক আলী আহমেদ, মহম্মদপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা বেদবতী মিস্ত্রীসহ স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তিরা।

পরিবারের সদস্যদের নিয়ে মেলায় এসেছেন সাগরিকা। তিনি বলেন, প্রতিবছরই এ মেলা হয়। পরিবারের সবাইকে নিয়ে ঘুরতে এসেছি। নৌকাবাইচ ও মেলা দুটোই খুব উপভোগ করছি। কেনাকাটাও করছি। আমাদের প্রত্যাশা, প্রতিবছরই যেন এ আয়োজন অব্যাহত থাকে।
নৌকাবাইচ ও মেলা কমিটির সভাপতি অধ্যক্ষ মৈমুর আলী মৃধা বলেন, অনেক দিন পর মহম্মদপুরবাসী এমন আনন্দ-উৎসবের মধ্য দিয়ে নৌকাবাইচ উপভোগ করছেন। নদীর দুই পাড়ে মানুষের ব্যাপক উপস্থিতি এবং তাদের আনন্দ-উচ্ছ্বাস দেখে ভালো লাগছে।
দূরদূরান্ত থেকে আসা দর্শনার্থী হুসাইন আলী বলেন, নৌকাবাইচ দেখতে আমার খুব ভালো লাগে। এখানে এসে অনেক আনন্দ উপভোগ করছি। এত মানুষের সমাগম দেখে সত্যিই ভালো লাগছে।
প্রতিযোগিতায় অংশ নিতে খুলনার কয়রা থেকে এসেছেন আলী আকবর। তিনি বলেন, আমি প্রতিবছরই এ প্রতিযোগিতায় অংশ নিতে আসি। গত বছরগুলোতে প্রথম পুরস্কার পেয়েছি। মহম্মদপুরের মধুমতি নদীর নৌকাবাইচ দর্শকদের কাছে বেশ জনপ্রিয়। এবারও প্রথম পুরস্কার জয়ের আশা নিয়ে এসেছি।
সংস্কৃতিমন্ত্রী ও মাগুরা-২ সংসদ সদস্য অ্যাডভোকেট নিতাই রায় চৌধুরী বলেন, গ্রামীণ মেলা ও ঐতিহ্যবাহী নৌকাবাইচ ধরে রাখার চেষ্টা। গ্রামবাংলার ঐতিহ্য, সংস্কৃতি ও লোকজ উৎসব আমাদের শেকড়ের পরিচয়। গ্রামীণ মেলা ও ঐতিহ্যবাহী নৌকাবাইচ শুধু বিনোদনের মাধ্যম নয়, এগুলো আমাদের ইতিহাস ও সংস্কৃতির অবিচ্ছেদ্য অংশ।
প্রতিযোগিতা শেষে বিজয়ীদের হাতে পুরস্কার তুলে দেওয়া হয়। আধুনিক বিনোদনের নানা মাধ্যমের মধ্যেও মধুমতি নদীর এ নৌকাবাইচে মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ লোকজ ঐতিহ্যের প্রতি তাঁদের আগ্রহেরই প্রতিফলন। স্থানীয়দের প্রত্যাশা, প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে বাংলার এ ঐতিহ্য টিকিয়ে রাখতে প্রতিবছরই এমন আয়োজন অব্যাহত থাকবে।
কেএম