দেশ টেলিভিশন লিমিটেড, কর্ণফুলী মিডিয়া পয়েন্ট, ৪২, শহীদ সাংবাদিক সেলিনা পারভীন সড়ক, মালিবাগ, ঢাকা-১২১৭, বাংলাদেশ।
টেলিফোন: +৮৮ (০২) ৮৩৩২৯৫৮, ৮৩৩২৯২২ ফ্যাক্স: +৮৮ (০২) ৮৩৩২৯৮১ মেইল: [email protected]

২২ দিনের নিষেধাজ্ঞা শেষে নদীতে মাছ ধরতে নেমে আশানুরূপ ইলিশ না পেয়ে হতাশ হয়ে ফিরছেন পিরোজপুরের কয়েক হাজার জেলে। জেলার কঁচা, সন্ধ্যা, বলেশ্বর ও কালীগঙ্গা নদীতে প্রত্যাশিত মাছ না পাওয়ায় পরিবার-পরিজন নিয়ে দুশ্চিন্তায় পড়েছেন তাঁরা।
এদিকে নিষেধাজ্ঞার সময় সরকারি সহায়তার চাল কম পাওয়ার অভিযোগও করেছেন কয়েকজন জেলে। তবে জেলা মৎস্য বিভাগ বলছে, বরাদ্দ অনুযায়ী প্রত্যেক জেলেকে ২৫ কেজি করে চাল দেওয়া হয়েছে।
শুক্রবার (৩০ অক্টোবর) দুপুরে পিরোজপুরের জিয়ানগর উপজেলার পাড়েরহাট ইউনিয়নের উমেদপুর গ্রামের জেলেপল্লিতে গিয়ে দেখা যায়, ২২ দিনের নিষেধাজ্ঞা শেষে নদী থেকে মাছ ধরে ফিরছেন জেলেরা। বৃহস্পতিবার (২৯ অক্টোবর) মধ্যরাত থেকে মাছ ধরতে নেমে কেউ কেউ এক-দুটি ইলিশ পেয়েছেন, আবার কেউ পেয়েছেন এক-দুটি পোয়া মাছ। অনেক জেলে মাছ বিক্রি করে জ্বালানি তেলের খরচও তুলতে পারেননি বলে দাবি করেছেন।
পাড়েরহাট এলাকার জেলে সুমন সিকদার (৪০) বলেন, ‘দীর্ঘ ২২ দিন মাছ ধরার নিষেধাজ্ঞা পালন করেছি। এ সময় মাত্র ২০ কেজি চাল পেয়েছি। পরিবারের ছয়জন সদস্য নিয়ে এই চাল দিয়ে সংসার চালানো খুবই কষ্ট হয়েছে। নিষেধাজ্ঞা শেষে বৃহস্পতিবার রাতে মাছ ধরতে গিয়ে মাত্র ৩০০ গ্রাম ওজনের একটি ইলিশ পেয়েছি।’
একই এলাকার জেলে রফিক শেখ (৪৫) জানান, নিষেধাজ্ঞার সময় ধারদেনা করে সংসার চালিয়েছেন। কিন্তু নিষেধাজ্ঞা শেষে নদীতে মাছ না পেয়ে তাঁর দুশ্চিন্তা আরও বেড়েছে। সংসারের খরচ মেটানো ও ঋণ পরিশোধ কীভাবে করবেন, তা নিয়ে উদ্বিগ্ন তিনি।
পিরোজপুরের কাউখালী উপজেলার শিয়ালকাঠি গ্রামের জেলে সুবল দত্ত (৪০) বলেন, ‘অনেক আশা নিয়ে নদীতে মাছ ধরতে গিয়েছিলাম। কিন্তু তেলের খরচই ওঠেনি। সমিতি থেকে ঋণ নিয়ে সংসার চালিয়েছি। এখন কিস্তি কীভাবে পরিশোধ করব, তা নিয়ে চিন্তায় আছি।’
পিরোজপুর অষ্টম চীন মৈত্রী সেতু-সংলগ্ন এলাকার খুচরা মাছ ব্যবসায়ী আরমান মোল্লা (৫৩) বলেন, ‘গত ২২ দিন আমরা নদী ও সাগরের মাছ বিক্রি করতে পারিনি। আজ সকালে অল্প কিছু মাছ এসেছে। জেলেরা বলছেন, তাঁরা মাছ পাচ্ছেন না। মাছ নাকি লোনা পানিতে নেমে গেছে। ক্রেতারা এসে মাছ না পেয়ে মন খারাপ করে চলে যাচ্ছেন। আমাদের ব্যবসা-বাণিজ্যও মন্দা যাচ্ছে। পরিবার নিয়ে বেঁচে থাকতে হলে ব্যবসা পরিবর্তন করতে হবে।’
নিষেধাজ্ঞার সময় সরকারি সহায়তার চাল নিয়েও অভিযোগ করেছেন জেলেরা। তাঁদের দাবি, ২৫ কেজি করে চাল দেওয়ার কথা থাকলেও কেউ ১৮ কেজি, কেউ ১৯ থেকে ২২ কেজি পর্যন্ত পেয়েছেন। পরিবারের সদস্যসংখ্যা বেশি হওয়ায় বরাদ্দের চাল দিয়ে সংসার চালানো কঠিন হয়ে পড়েছে বলেও জানান তাঁরা।
পাড়েরহাট এলাকার জেলে হাবিব শিকদার (৭০) বলেন, ‘আমাগো ২২ কেজি চাল দেওয়া হয়েছে। স্যারেরা আমাগো কইছে, উপজেলা থেকে চাল আনতে খরচ লাগে। এজন্য আমাগো ২২ কেজি চাল দেছে। মোরা এতেই খুশী।’
একই এলাকার মুরাদ খান (৪২) বলেন, ‘ইউনিয়ন পরিষদ থেকে চাল এনে মেপে দেখেছি ২০ কেজি। আমরা শুনেছি ২৫ কেজি চাল দেওয়ার কথা, এখন তা ২০ কেজি হয়ে গেছে। এই কয়টা চাল দিয়ে ছয়জনের সংসার কীভাবে চালিয়েছি, আল্লাহই ভালো জানেন।’
নদীতে মাছ কম পাওয়ার বিষয়ে পিরোজপুর সদর উপজেলার চিথলিয়া এলাকার জেলে সালাম মৃধা (৫৮) বলেন, ‘খালে ও নদীতে নেট জাল দিয়ে মাছ শিকার করা হয়। এই জালের ফাঁদে ছোট মাছও ধরা পড়ে। এ কারণে মাছ বড় হতে পারে না। আবার মাছের সংখ্যাও কমে যাচ্ছে। এই নেট জালের ব্যবহার বন্ধ করা গেলে খাল ও নদীতে ইলিশসহ অন্যান্য মাছ পর্যাপ্ত পাওয়া যাবে বলে তিনি দাবি করেন।’
তবে জেলা মৎস্য কর্মকর্তা সঞ্জীব সন্নামত বলেন, ২২ দিনের নিষেধাজ্ঞা শুরুর পর জেলার ২০ হাজার ৯৪৫ জন জেলেকে ২৫ কেজি করে মোট ৫০৩ মেট্রিক টন চাল দেওয়া হয়েছে।
নদীতে মাছ না পাওয়ার বিষয়ে তিনি বলেন, ইলিশ দ্রুতগতির সামুদ্রিক মাছ। নিষেধাজ্ঞা শেষে দক্ষিণাঞ্চলের নদ-নদী থেকে ইলিশ উজানের দিকে যাচ্ছে। কিছুদিন পর জেলেরা আশানুরূপ মাছ পেতে পারেন বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি।
এদিকে নদীতে মাছের প্রাপ্যতা বাড়াতে নিষিদ্ধ জালের ব্যবহার বন্ধ, সরকারি সহায়তা সঠিকভাবে বিতরণ এবং জেলেদের জন্য সহায়তা বাড়ানোর দাবি জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।
এমএস/