দেশ টেলিভিশন লিমিটেড, কর্ণফুলী মিডিয়া পয়েন্ট, ৪২, শহীদ সাংবাদিক সেলিনা পারভীন সড়ক, মালিবাগ, ঢাকা-১২১৭, বাংলাদেশ।
টেলিফোন: +৮৮ (০২) ৮৩৩২৯৫৮, ৮৩৩২৯২২ ফ্যাক্স: +৮৮ (০২) ৮৩৩২৯৮১ মেইল: [email protected]

চাঁপাইনবাবগঞ্জে শীতকালীন সবজি, পেঁয়াজ, সরিষা ও ভুট্টা চাষের মৌসুমে সময়মতো প্রয়োজনীয় সার পাচ্ছেন না কৃষকেরা। সার সংকট ও বিতরণে অনিয়মের অভিযোগে তাদের মধ্যে ক্ষোভ ছড়িয়ে পড়েছে। বিভিন্ন স্থানে হট্টগোলের ঘটনাও ঘটেছে। ডিলার পয়েন্টগুলোতে কৃষকের ভিড় ও বিশৃঙ্খলা সামাল দিতে পুলিশ ও প্রশাসনের সদস্যদের হস্তক্ষেপ করতে হচ্ছে।
মঙ্গলবার (২৭ অক্টোবর) দুপুরে শিবগঞ্জ উপজেলার শাহবাজপুর ইউনিয়নের বন্ধন ট্রেডার্স নামের একটি ডিলার পয়েন্টে হাতাহাতির ঘটনা ঘটে।
কৃষকদের অভিযোগ, শীতকালীন সবজি, পেঁয়াজ, সরিষা ও ভুট্টা চাষের মৌসুমে বিভিন্ন ডিলার পয়েন্টে ঘুরেও সময়মতো সার পাওয়া যাচ্ছে না। শুধু এবারই নয়, প্রতিবছর এ মৌসুমে চাঁপাইনবাবগঞ্জে সারের চাহিদা বেড়ে যায়।
সরকারি হিসাবে দেশে পর্যাপ্ত সার মজুদ রয়েছে। তাহলে চাঁপাইনবাবগঞ্জে সংকট কেন? কৃষক, ডিলার ও সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে সংকটের তিনটি প্রধান কারণ জানা গেছে। এগুলো হলো চাহিদার তুলনায় বরাদ্দ কম, চাহিদা নির্ধারণ ও বিতরণ ব্যবস্থাপনায় ত্রুটি এবং কৃষকদের মধ্যে সচেতনতার অভাবে জমিতে প্রয়োজনের অতিরিক্ত সার প্রয়োগ।
কৃষি কর্মকর্তাদের দাবি, কৃষকেরা প্রয়োজনের তুলনায় বেশি সার ব্যবহার করছেন। এতে কৃষিজমির জন্য বরাদ্দ করা সারের ওপর বাড়তি চাপ তৈরি হচ্ছে।
অন্যদিকে ডিলারদের দাবি, আগামী নভেম্বর মাসে আলু, পেঁয়াজ ও শীতকালীন সবজি চাষের জন্য স্বাভাবিক সময়ের তুলনায় বেশি সার প্রয়োজন। ফসল চাষের প্রস্তুতি হিসেবে কৃষকদের আগাম সার সংগ্রহের প্রবণতাও বেড়েছে। এতে চাহিদার ওপর চাপ তৈরি হয়েছে। নভেম্বর মাসের বরাদ্দ আগেই দেওয়া হলেও তাতে সংকট কাটবে না বলে মনে করছেন ডিলাররা। তাদের মতে, সংকট মোকাবিলায় অতিরিক্ত বরাদ্দের পাশাপাশি যেসব এলাকায় সার উদ্বৃত্ত রয়েছে, সেখান থেকে ঘাটতি থাকা এলাকায় পুনর্বণ্টন করা প্রয়োজন।
চাঁপাইনবাবগঞ্জ সদরের বিসিআইসির এক ডিলার বলেন, তার ইউনিয়নে এ মৌসুমে অন্তত ১০০ মেট্রিক টন ডিএপি সারের প্রয়োজন। কিন্তু অক্টোবর ও নভেম্বর—এই দুই মাসে বরাদ্দ পেয়েছেন প্রায় ৬৫ মেট্রিক টন। এই পরিমাণ সার দিয়ে সব কৃষককে সন্তুষ্ট করা সম্ভব নয়। গত বছর শুধু নভেম্বর মাসেই তার বরাদ্দ ছিল ৬০ মেট্রিক টন।
ওই ডিলারের অভিযোগ, যেসব জেলায় সারের চাহিদা কম, সেসব এলাকার কিছু ডিলারের সার কালোবাজারে বিক্রি হয়েছে। তবে এবার কালোবাজারে সার পাওয়া যাচ্ছে না বলে দাবি করেন তিনি। সার পেতে রাজনৈতিক দলের নেতা ও জনপ্রতিনিধিরাও তার সঙ্গে যোগাযোগ করছেন বলে জানান এই ডিলার।
কৃষিনির্ভর চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলায় সব ধরনের সারের চাহিদার তুলনায় বরাদ্দ কম। এতে কৃষি উৎপাদনে প্রভাব পড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, প্রতি বছর সারের চাহিদা নির্ধারণ করা হয়। এ প্রক্রিয়ায় শিল্প মন্ত্রণালয়, কৃষি মন্ত্রণালয় ও বাংলাদেশ কেমিক্যাল ইন্ডাস্ট্রিজ করপোরেশন (বিসিআইসি) যুক্ত থাকে। চলতি অর্থবছরের চাহিদা ও বরাদ্দের তথ্য বিশ্লেষণে দেখা গেছে, সব ধরনের সারের ক্ষেত্রেই চাহিদার তুলনায় বরাদ্দ কম।
জেলায় বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন করপোরেশনের (বিএডিসি) ৩৮ জন এবং বিসিআইসির ৫৮ জন ডিলার কৃষক পর্যায়ে সার সরবরাহ করেন।
চলতি অর্থবছরে জেলায় ৪২ হাজার ৭৪৯ মেট্রিক টন ইউরিয়া সারের চাহিদার বিপরীতে বরাদ্দ অনুমোদন হয়েছে ৩৯ হাজার ১০৩ মেট্রিক টন। ৯ হাজার ৫৪০ মেট্রিক টন টিএসপি সারের চাহিদার বিপরীতে বরাদ্দ মিলেছে ৭ হাজার ৮৪০ মেট্রিক টন। এ ছাড়া ৪০ হাজার ৩৯৩ মেট্রিক টন ডিএপি সারের বিপরীতে বরাদ্দ ৩৪ হাজার ৫৮০ মেট্রিক টন এবং ২২ হাজার ১৯১ মেট্রিক টন এমওপি সারের বিপরীতে বরাদ্দ হয়েছে ১৯ হাজার ৮১৩ মেট্রিক টন।
সব মিলিয়ে জেলায় ১ লাখ ১৪ হাজার ৮৭৩ মেট্রিক টন সারের চাহিদার বিপরীতে বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে ১ লাখ ১ হাজার ৩৩৬ মেট্রিক টন। অর্থাৎ চাহিদার তুলনায় বরাদ্দ ঘাটতি ১৩ হাজার ৫৩৭ মেট্রিক টন।
গত অর্থবছরে চাহিদার তুলনায় সারের বরাদ্দ ঘাটতি আরও বেশি ছিল বলে জানা গেছে। স্থানীয় কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের দাবি, তারা চাহিদা পাঠালেও বরাদ্দ দেয় মন্ত্রণালয়। চাহিদা অনুযায়ী বরাদ্দ না পেলে তাদের কিছু করার থাকে না।
বিসিআইসির ডিলারদের সংগঠন বাংলাদেশ ফার্টিলাইজার অ্যাসোসিয়েশনের (বিএফএ) জেলা শাখার সভাপতি আকবর হোসেন বলেন, চাহিদার তুলনায় বরাদ্দ কম হওয়ায় কৃষকদের প্রয়োজন অনুযায়ী সার দেওয়া সম্ভব হচ্ছে না। বর্তমান বরাদ্দ দিয়ে কৃষকদের চাহিদা পূরণ করা কঠিন। প্রকৃত চাহিদা বিবেচনায় নিয়ে সারের বরাদ্দ বাড়ানো প্রয়োজন।
সার সংকটের পেছনে চাহিদা নির্ধারণের ত্রুটিকেও দায়ী করছেন কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের এক কর্মকর্তা। ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের রোষানলে পড়ার আশঙ্কায় তিনি নাম প্রকাশ করতে চাননি।
ওই কর্মকর্তা বলেন, উপজেলা পর্যায়ে কৃষি কর্মকর্তারা সারের চাহিদা নির্ধারণে যথাযথ পরিকল্পনা করেন না। মাঠপর্যায়ে যাচাই না করেই চাহিদাপত্র তৈরি করা হয় বলে অভিযোগ তার।
তিনি বলেন, বছরের শুরুতে সার ও বীজ ব্যবস্থাপনা কমিটি সারের চাহিদাপত্র সংগ্রহ করে। জেলায় সার ও বীজ মনিটরিং কমিটিও রয়েছে। উপজেলা থেকে কোন ধরনের কতটুকু সার প্রয়োজন, তা নির্ধারণ করে সেই অনুযায়ী বর্ষপঞ্জি সাজানো হয়। কিন্তু কমিটির সদস্যরা যথাযথভাবে যাচাই না করে গতানুগতিক চাহিদাপত্র জমা দেন।
ওই কর্মকর্তা আরও বলেন, চাঁপাইনবাবগঞ্জে সারা বছর আম, পেয়ারা, মাল্টাসহ বিভিন্ন মৌসুমি ফল ও ফসলের চাষ হয়। এসব ফসলের চাষ বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে সারের চাহিদাও বাড়ছে। জেলায় ৪৫টি ইউনিয়ন রয়েছে। সব এলাকায় একই ধরনের ফসল উৎপাদিত হয় না। অথচ সার বরাদ্দ ও বণ্টনের ক্ষেত্রে প্রায় একই ধরনের হিসাব অনুসরণ করা হয়। ফলে এলাকার প্রকৃত চাহিদার সঙ্গে বরাদ্দের অসংগতি তৈরি হচ্ছে।
তবে চাঁপাইনবাবগঞ্জে সারের সংকট নেই বলে দাবি করেছেন জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক মো. আতিকুল ইসলাম।
তিনি বলেন, চাহিদা অনুযায়ী সার বরাদ্দ পাওয়া গেছে। কৃষকেরা নিজেদের প্রয়োজনের পাশাপাশি পরবর্তী ফসলের জন্যও সার সংগ্রহ করছেন। সার পাওয়া যাবে না এমন আশঙ্কা থেকেই কৃষকদের মধ্যে তাড়াহুড়া তৈরি হয়েছে। এ কারণে কিছুটা বিশৃঙ্খলা দেখা দিয়েছে।
এদিকে চাঁপাইনবাবগঞ্জে সার সংকটের বিষয়ে জনপ্রশাসন ও খাদ্য মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী মো. আব্দুল বারী এমপি বলেন, দেশে সারের কোনো সংকট নেই। বর্তমানে পর্যাপ্ত সার মজুদ রয়েছে। চাহিদা জানানো হলে বরাদ্দ দেওয়া হবে। চাঁপাইনবাবগঞ্জে কেন সার সংকট তৈরি হয়েছে, তা খতিয়ে দেখা হবে বলে জানান তিনি।
যে আই