দেশ টেলিভিশন লিমিটেড, কর্ণফুলী মিডিয়া পয়েন্ট, ৪২, শহীদ সাংবাদিক সেলিনা পারভীন সড়ক, মালিবাগ, ঢাকা-১২১৭, বাংলাদেশ।
টেলিফোন: +৮৮ (০২) ৮৩৩২৯৫৮, ৮৩৩২৯২২ ফ্যাক্স: +৮৮ (০২) ৮৩৩২৯৮১ মেইল: [email protected]

ইলিশ আহরণে ২২ দিনের নিষেধাজ্ঞায় কর্মহীন হয়ে পড়েছেন ঝালকাঠির ৭ হাজার ৪৯৪ জন জেলে। তাদের মধ্যে সরকারি পুনর্বাসন সহায়তা হিসেবে ২৫ কেজি করে চাল পেয়েছেন ৪ হাজার ২০০ জন। ফলে এ দফায় সহায়তা থেকে বাদ পড়েছেন ৩ হাজার ২৯৪ জন জেলে। মাছ ধরতে না পারায় আয় বন্ধ, অন্যদিকে ঋণের কিস্তি ও সংসারের খরচ সব মিলিয়ে চরম দুশ্চিন্তায় দিন কাটছে তাদের।
জেলেদের অভিযোগ, চলতি মৌসুমে সুগন্ধা ও বিষখালী নদীতে কাঙ্ক্ষিত ইলিশ না পাওয়ায় নিষেধাজ্ঞা শুরুর আগেই তাদের আয় কমে গিয়েছিল। এর মধ্যে ২২ দিনের নিষেধাজ্ঞা জীবিকায় আরও সংকট তৈরি করেছে। এ অবস্থায় নিষেধাজ্ঞার সময়ে ঋণের কিস্তি আদায় বন্ধ রাখা এবং সরকারি পুনর্বাসন সহায়তার আওতা বাড়ানোর দাবি জানিয়েছেন তারা।
ইলিশের প্রধান প্রজনন মৌসুমে মা ইলিশকে নির্বিঘ্নে ডিম ছাড়ার সুযোগ দিতে গত ৮ অক্টোবর থেকে টানা ২২ দিন নদী ও সাগরে মাছ ধরায় নিষেধাজ্ঞা দিয়েছে সরকার। এ সময়ে ইলিশ আহরণের পাশাপাশি পরিবহন, মজুত, বাজারজাত ও বিক্রিও নিষিদ্ধ। এ নিষেধাজ্ঞার আওতায় রয়েছে ঝালকাঠির সুগন্ধা ও বিষখালী নদী।
সরকারি নির্দেশনা মেনে নৌকা ও মাছ ধরার সরঞ্জাম নিয়ে ঘাটে ফিরেছেন জেলেরা। নদীতে নেই নৌকার ব্যস্ততা, জাল ফেলার দৃশ্য কিংবা মাছ ধরার কর্মচাঞ্চল্য। তবে মাছ ধরা বন্ধ থাকলেও থেমে নেই সংসারের খরচ। প্রতিদিনের খাবার, সন্তানদের পড়াশোনা, চিকিৎসাসহ অন্যান্য প্রয়োজন মেটাতে হচ্ছে ধারদেনা করে। এর সঙ্গে রয়েছে নৌকা মেরামত ও জাল কেনার জন্য নেওয়া ঋণের কিস্তি পরিশোধের চাপ।
ঝালকাঠি সদর উপজেলার জেলে পাড়ার শিখা রানী বলেন, ‘সরকার ২৫ কেজি চাল দিয়েছে, কিন্তু আর কোনো সহায়তা দেয়নি। ২২ দিন শুধু চাল দিয়ে কীভাবে সংসার চলবে? ভাত রান্না করলেই তো হয় না, সঙ্গে তরকারি রান্না করতে তেল, ডাল, আলু ও অন্যান্য জিনিসপত্র লাগে। সরকার যদি চালের পাশাপাশি এসব নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যও দিত, তাহলে আমাদের অনেক সুবিধা হতো। মাছ ধরা বন্ধ, তার মধ্যে আবার পূজা। এই পূজায় নিজেদের জন্য কিছু কেনা তো দূরের কথা, বাচ্চাদেরও কিছু কিনে দিতে পারিনি। ভালো-মন্দ রান্না করে সন্তানদের খাওয়াতেও পারিনি।
আরেক জেলে মো. করিম বলেন, সরকার আমাদের এই ২২ দিনের জন্য জেলে বন্দী করে রাখার মতো অবস্থায় ফেলেছে। মাছ ধরতে পারছি না, কোনো কাজও করতে পারছি না। এই সময়টুকুর জন্য সরকার যদি আমাদের বিকল্প কোনো কাজের ব্যবস্থা করে দিত, তাহলে আমরা কাজ করে সংসার চালাতে পারতাম। শুধু চালের ওপর নির্ভর করে ২২ দিন চলা আমাদের মতো জেলেদের জন্য খুবই কঠিন।
রাজাপুর উপজেলার বড়ইয়া ইউনিয়নের বিষখালী নদীতে মাছ শিকার করা জেলে মো. আফজাল বলেন, এই অবরোধে সরকার ২৫ কেজি করে চাল দিয়েছে। কিন্তু আমার পরিবারে সদস্য সাতজন। প্রতিদিন প্রায় পাঁচ কেজি চাল রান্না করতে হয়। এই ২৫ কেজি চাল দিয়ে কয়দিনই বা চলবে? বাকি দিনগুলো কীভাবে সংসার চালাব, সেটাই এখন চিন্তার বিষয়। তার ওপর চালের সঙ্গে সংসারের আরও অনেক প্রয়োজনীয় জিনিস লাগে। শুধু চাল তো আর চিবিয়ে খাওয়া যায় না। তেল, ডাল, লবণ, সবজি সবই কিনতে হয়। আবার ঋণের কিস্তিও আছে। অবরোধের সময় আমাদের আয় বন্ধ থাকে, তাই সরকারের পক্ষ থেকে অন্তত এই সময়টুকু ঋণের কিস্তি আদায় বন্ধ রাখার ব্যবস্থা করা হোক।
জেলে মো. রেজাউল বলেন, অবরোধ শুরুর আগ থেকেই নদীতে মাছ ছিল না। মাছ না পাওয়ায় তখন থেকেই আমাদের রোজগার কমে গিয়েছিল। অনেক দিন ঠিকমতো মাছ ধরতে পারিনি। এখন আবার ২২ দিনের অবরোধ। ফলে পুরোপুরি বেকার হয়ে পড়েছি। সংসারে প্রতিদিন খরচ আছে, কিন্তু আয় করার কোনো পথ নেই। তার ওপর ঋণের কিস্তি পরিশোধের চাপ রয়েছে। এই অবস্থায় কীভাবে সংসার চালাব, কীভাবে কিস্তি দেব তা নিয়ে খুব দুশ্চিন্তায় আছি।
জেলেদের ভাষ্য, ২২ দিনের নিষেধাজ্ঞা ইলিশের প্রজননের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হলেও এ সময়ে তাঁদের জীবিকা পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যায়। সরকারি সহায়তার পরিমাণ ও আওতা না বাড়ালে অনেক জেলেকেই ধারদেনা করে সংসার চালাতে হয়। বিশেষ করে সরকারি চালের তালিকায় স্থান না পাওয়া জেলেদের দুর্ভোগ আরও বেশি।
জেলা মৎস্য বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, ঝালকাঠিতে মোট ৭ হাজার ৪৯৪ জন জেলের মধ্যে ৪ হাজার ২০০ জনকে ২৫ কেজি করে চাল দেওয়া হয়েছে। সে হিসাবে, এ দফায় ৩ হাজার ২৯৪ জন জেলে সরকারি সহায়তার বাইরে রয়েছেন। নিষেধাজ্ঞার সময়ে আয় বন্ধ থাকায় পুনর্বাসন সহায়তা বাড়ানোর পাশাপাশি ঋণের কিস্তি পরিশোধে সাময়িক ছাড়ের দাবি জানিয়েছেন জেলেরা।
জেলা মৎস্য কর্মকর্তা মো. এনামুল হক বলেন, আমরা ঝালকাঠির ৭ হাজার ৪৯৪ জন জেলের জন্য বরাদ্দের চাহিদা দিয়েছিলাম। কিন্তু বরাদ্দ পেয়েছি ৪ হাজার ২০০ জনের জন্য। শুধু ঝালকাঠি নয়, সব জেলাতেই শতভাগ জেলেকে এবার সহায়তা দেওয়া সম্ভব হয়নি। বরাদ্দ না পাওয়ায় আমরা শতভাগ জেলেকে ২৫ কেজি করে চাল দিতে পারিনি। আগামীতে আমরা আবারও শতভাগ জেলের জন্য বরাদ্দ চাইব। আশা করি, পরবর্তী সময়ে শতভাগ বরাদ্দ পাওয়া যাবে। তখন আর কোনো জেলে সহায়তা থেকে বাদ পড়বেন না।
তিনি আরও বলেন, প্রজনন মৌসুমে মা ইলিশের নির্বিঘ্নে ডিম ছাড়ার পরিবেশ নিশ্চিত করতে জেলা প্রশাসন ও মৎস্য বিভাগ দিন-রাত অভিযান পরিচালনা করছে। নিষেধাজ্ঞা যথাযথভাবে মেনে চললে আগামী মৌসুমে ইলিশের উৎপাদন বাড়বে। আর ইলিশের উৎপাদন বাড়লে সবচেয়ে বেশি লাভবান হবেন জেলেরাই। তাই দীর্ঘমেয়াদি সুফলের জন্য সবাইকে নিষেধাজ্ঞা মেনে চলতে হবে।
সরকারি নিষেধাজ্ঞা বাস্তবায়নের পাশাপাশি এ সময়ে জেলেদের জীবন-জীবিকা সচল রাখতে পর্যাপ্ত পুনর্বাসন সহায়তা নিশ্চিত করা জরুরি বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। তাদের মতে, ইলিশের প্রজনন রক্ষায় মাছ ধরা বন্ধ রাখার পাশাপাশি জেলেদের পরিবার কীভাবে চলবে, সে বিষয়টিও গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা প্রয়োজন।
যে আই