দেশ টেলিভিশন লিমিটেড, কর্ণফুলী মিডিয়া পয়েন্ট, ৪২, শহীদ সাংবাদিক সেলিনা পারভীন সড়ক, মালিবাগ, ঢাকা-১২১৭, বাংলাদেশ।
টেলিফোন: +৮৮ (০২) ৮৩৩২৯৫৮, ৮৩৩২৯২২ ফ্যাক্স: +৮৮ (০২) ৮৩৩২৯৮১ মেইল: [email protected]

মানিকগঞ্জের শিবালয় উপজেলার তেওতা ইউনিয়নে মা ইলিশ সংরক্ষণ কর্মসূচির আওতায় জেলেদের জন্য বরাদ্দ করা চাল বিতরণে অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। উপকারভোগীদের ২৫ কেজির পরিবর্তে ২২ কেজি করে চাল দেওয়ার অভিযোগের বিষয়ে তথ্য সংগ্রহ করতে গিয়ে হেনস্তার শিকার হয়েছেন দুই গণমাধ্যমকর্মী। এ ঘটনায় তেওতা ইউনিয়ন পরিষদের প্রশাসক মো. মাহবুবুর রহমানের বিরুদ্ধে অসহযোগিতা ও সাংবাদিকদের সঙ্গে অশোভন আচরণের অভিযোগ উঠেছে।
বুধবার (২১ অক্টোবর) বিকেলে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মনিষা রানী কর্মকার জানান, এ বিষয়ে লিখিত অভিযোগ না পেলেও তিনি ঘটনাটি সম্পর্কে জানতে পেরেছেন। সুবিধাভোগীদের চাল কম দেওয়ার কোনো সুযোগ নেই উল্লেখ করে তিনি বলেন, সাংবাদিকদের সঙ্গে অশোভন আচরণের অভিযোগও খতিয়ে দেখে প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
এর আগে গত ১৫ অক্টোবর দুপুরে তেওতা ইউনিয়ন পরিষদে চাল বিতরণের সময় এ ঘটনা ঘটে। হেনস্তার শিকার দুই সাংবাদিক হলেন মাইটিভির শিবালয় প্রতিনিধি লিটন আহম্মেদ ও দেশ রূপান্তরের শিবালয় প্রতিনিধি ইমরান নাজির। এ ঘটনায় স্থানীয় সাংবাদিকদের মধ্যে ক্ষোভ বিরাজ করছে।
ভুক্তভোগী সাংবাদিকদের অভিযোগ, জেলেদের চাল ওজনে কম দেওয়ার খবর পেয়ে তাঁরা তেওতা ইউনিয়ন পরিষদে যান। সেখানে কয়েকজন উপকারভোগীর সঙ্গে কথা বলার সময় চাল বিতরণ বন্ধ রাখা হয়। পরে চাল কম দেওয়ার অভিযোগের বিষয়ে প্রশাসক মো. মাহবুবুর রহমানের কাছে জানতে চাইলে তিনি তাঁদের কাছে অ্যাক্রিডিটেশন কার্ড দেখতে চান। সাংবাদিকেরা নিজেদের পরিচয়পত্র দেখালেও অ্যাক্রিডিটেশন কার্ড না থাকায় তিনি তথ্য দিতে বা কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি বলে অভিযোগ তাঁদের।
সাংবাদিকদের আরও অভিযোগ, চাল বিতরণ ও অ্যাক্রিডিটেশন কার্ড নিয়ে প্রশ্ন করার একপর্যায়ে মাহবুবুর রহমান উত্তেজিত হয়ে উপস্থিত ইউপি সদস্য ও কর্মচারীদের সাংবাদিকদের ভিডিও ধারণের নির্দেশ দেন। এতে তাঁরা বিব্রতকর পরিস্থিতির মুখে পড়েন।
মাইটিভির প্রতিনিধি লিটন আহম্মেদ বলেন, উপকারভোগীদের ২৫ কেজি করে চাল দেওয়ার কথা থাকলেও ২২ কেজি করে দেওয়া হচ্ছিল। স্থানীয়রা বিষয়টি জানালে তাঁরা ইউনিয়ন পরিষদে যান। সেখানে একাধিক উপকারভোগীর চাল মেপে ২২ কেজি পাওয়া যায়। বিষয়টি জানতে চাইলে প্রশাসক প্রথমেই অ্যাক্রিডিটেশন কার্ড দেখতে চান। পরিচয়পত্র দেখানোর পরও তিনি উত্তেজিত হয়ে উপস্থিত সবাইকে তাঁদের ভিডিও ধারণের নির্দেশ দেন এবং হেনস্তা করেন বলে অভিযোগ করেন লিটন।
চাল কম পাওয়ার অভিযোগ করেছেন উপকারভোগীরাও। আলোকদিয়া গ্রামের জেলে মো. ইউনুছ আলী মোল্লা বলেন, তিন বছর ধরে তিনি জেলে কার্ডের আওতায় সরকারি চাল পাচ্ছেন। এবার তাঁর ২৫ কেজি চাল পাওয়ার কথা থাকলেও পেয়েছেন ২২ কেজি। চাল নেওয়ার সময় কম মনে হওয়ায় বিষয়টি জানালে তাঁকে বলা হয়, সঠিক পরিমাণেই চাল দেওয়া হয়েছে।
গান্ধাইর গ্রামের শামিন হালদারও একই অভিযোগ করেন। তিনি বলেন, ২৫ কেজি চাল দেওয়ার কথা থাকলেও তাঁকে ২২ কেজি দেওয়া হয়েছে। চাল কম মনে হওয়ায় বিষয়টি জানালে মেপে দেখতে বলা হয়। পরে মেপে ২২ কেজি পাওয়া যায়। তাঁর দাবি, আরও অনেকেই কম চাল পেয়েছেন।
নাম ও পরিচয় প্রকাশ না করার শর্তে স্থানীয় এক বিএনপি নেতা জানান, চাল কম দেওয়ার অভিযোগ শুনে তিনি ইউনিয়ন পরিষদে যান। চাল বিতরণে নিয়োজিত কর্মীদের সঙ্গে কথা বলে জানতে পারেন, ইউপি সদস্যদের কথায় চাল কম দেওয়া হয়েছে বলে তাঁরা জানিয়েছেন।
ওই নেতার দাবি, তেওতা ইউনিয়নে মাছ শিকার ও ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত প্রকৃত মানুষের সংখ্যা আনুমানিক ৫০০ থেকে ৬০০। দ্রুত যাচাই-বাছাই করে প্রকৃত জেলেদের তালিকা তৈরি করা না হলে ভুয়া তালিকার কারণে সরকারি বরাদ্দ অপচয়ের আশঙ্কা রয়েছে।
এ বিষয়ে উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা সাথী রানী নিয়োগী বলেন, উপজেলায় মোট ৪ হাজার ৭৩ জন সুবিধাভোগী জেলে রয়েছেন। এর মধ্যে তেওতা ইউনিয়নে তালিকাভুক্ত ১ হাজার ৬০০ জেলের মধ্যে ১ হাজার ৪০০ জনকে ২৫ কেজি করে চাল দেওয়া হচ্ছে। চাল বিতরণের সময় দায়িত্বপ্রাপ্ত ট্যাগ অফিসারের উপস্থিত থাকার কথা থাকলেও ওই দিন বিশেষ কারণে নির্ধারিত কর্মকর্তা উপস্থিত থাকতে পারেননি। এ কারণে নতুন ট্যাগ অফিসার নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। নির্ধারিত পরিমাণের চেয়ে কম চাল দেওয়ার কোনো সুযোগ নেই বলেও জানান তিনি।
অন্যদিকে, তেওতা ইউনিয়ন পরিষদের প্রশাসক মো. মাহবুবুর রহমান বলেন, কোনো জেলে কম চাল পেয়ে থাকলে তাঁকে ইউপি সদস্যদের উপস্থিতিতে ডেকে এনে বাকি চাল দিয়ে দেওয়া হবে। চাল কম দেওয়ার অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি কোন জেলের চাল কম হয়েছে, তা জানতে চান। তাঁর দাবি, নির্ধারিত পরিমাণের চেয়ে কম চাল দেওয়ার সুযোগ নেই।
সাংবাদিকদের সঙ্গে এ ধরনের আচরণের ঘটনায় ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন মানিকগঞ্জ প্রেস ক্লাবের সভাপতি জাহাঙ্গীর আলম বিশ্বাস। তিনি বলেন, পেশাদার সাংবাদিকেরা দায়িত্ব পালন করতে গেলে সংশ্লিষ্টদের সহযোগিতা করা উচিত। সহযোগিতা না করে তাঁদের বিব্রত করা স্বাভাবিক নয়। বিষয়টি নিয়ে জেলার বিভিন্ন সভায় সংশ্লিষ্ট ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সঙ্গে আলোচনা করা হবে।
জেলেদের বরাদ্দ করা চালের সঠিক পরিমাণ নিশ্চিত করা, অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্ত এবং সাংবাদিকদের সঙ্গে ঘটে যাওয়া ঘটনার যথাযথ অনুসন্ধানের দাবি জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।
যে আই