দেশ টেলিভিশন লিমিটেড, কর্ণফুলী মিডিয়া পয়েন্ট, ৪২, শহীদ সাংবাদিক সেলিনা পারভীন সড়ক, মালিবাগ, ঢাকা-১২১৭, বাংলাদেশ।
টেলিফোন: +৮৮ (০২) ৮৩৩২৯৫৮, ৮৩৩২৯২২ ফ্যাক্স: +৮৮ (০২) ৮৩৩২৯৮১ মেইল: [email protected]

মেয়েকে পড়াশোনা করিয়ে নিজের পায়ে দাঁড় করানোই ছিল বাবা-মায়ের স্বপ্ন। বাবা চেয়েছিলেন, মেয়ে হবেন প্রকৌশলী। মেধাবী গার্গী চ্যাটার্জীও এগিয়ে যাচ্ছিলেন সেই স্বপ্ন পূরণের পথে। প্রাথমিক শিক্ষা সমাপনী, জুনিয়র স্কুল সার্টিফিকেট (জেএসসি) ও মাধ্যমিক স্কুল সার্টিফিকেট (এসএসসি) তিন পরীক্ষাতেই পেয়েছিলেন জিপিএ-৫। স্কুলে তার রোল নম্বর থাকত প্রথম পাঁচজনের মধ্যে।
কিন্তু কৈশোরেই বাবাকে হারিয়ে থমকে যায় তার স্বপ্নযাত্রা। অর্থাভাবে বাধাগ্রস্ত হয় পড়াশোনা। এরপর উচ্চশিক্ষার স্বপ্ন নিয়ে এগিয়ে যাওয়ার সময় ধরা পড়ে জটিল রোগ অ্যাঙ্কিলোজিং স্পন্ডিলাইটিস। ধীরে ধীরে বাড়তে থাকে শরীরের ব্যথা, কমতে থাকে চলাফেরার সক্ষমতা। যে মেয়েটি একসময় প্রকৌশলী হওয়ার স্বপ্ন দেখতেন, সেই গার্গীকে এখন অল্প হাঁটতেও নিতে হয় লাঠির সাহায্য। কখনো নির্ভর করতে হয় হুইলচেয়ারের ওপর।
তবু থেমে থাকেননি তিনি। অসুস্থতার মধ্যেও আইন বিষয়ে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর শেষ করেছেন ভালো ফল নিয়ে। কিন্তু স্বাভাবিক জীবনে ফেরার লড়াইয়ে এখন তার সবচেয়ে বড় বাধা অর্থসংকট। উন্নত চিকিৎসার জন্য ভারতের চেন্নাইয়ে যেতে চান গার্গী। অস্ত্রোপচার, পরবর্তী পুনর্বাসন ও আনুষঙ্গিক খরচ মিলিয়ে প্রয়োজন প্রায় ৪০ লাখ টাকা। পরিবারের পক্ষে এই বিপুল অর্থ জোগাড় করা কঠিন হয়ে পড়েছে।
২০১৬ সালে পিরোজপুর সরকারি বালিকা উচ্চবিদ্যালয় থেকে এসএসসি পাস করেন গার্গী। এরপর উচ্চমাধ্যমিকে পড়তে ঢাকায় যান। প্রথমে মাইলস্টোন কলেজে ভর্তি হলেও পরে রাজউক উত্তরা মডেল কলেজে পড়াশোনা শুরু করেন। স্বপ্ন ছিল, ভালো ফল করে প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়বেন।
কিন্তু ২০১৭ সালের ১৬ মার্চ হৃদ্রোগে তার বাবা দীপক কুমার চ্যাটার্জীর মৃত্যু হয়। তিনি স্ট্যাম্প ভেন্ডার ও শিক্ষানবিশ আইনজীবী হিসেবে কাজ করতেন। বাবার মৃত্যুর পর সংসার চালানো এবং মেয়ের পড়াশোনার খরচ জোগানো কঠিন হয়ে পড়ে।
গার্গীর মা পূর্ণিমা চ্যাটার্জী স্বরূপকাঠির গ্রামের জমি কম দামে বিক্রি করেন। সেই অর্থও একসময় শেষ হয়ে যায়। অর্থাভাবে ঢাকায় থেকে পড়াশোনা চালিয়ে যেতে পারেননি গার্গী। ফিরে আসেন পিরোজপুরে। পরে পিরোজপুর মহিলা কলেজের মাধ্যমে এইচএসসি পরীক্ষায় অংশ নিয়ে ২০১৮ সালে জিপিএ-৪.১৭ পান। পছন্দের প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির সুযোগ না পাওয়ায় পূরণ হয়নি প্রকৌশলী হওয়ার স্বপ্ন।
তবে বাবার আরেকটি স্বপ্ন ছিল মেয়ে যেন নিজের পায়ে দাঁড়াতে পারেন। সেই লক্ষ্যেই ইস্টার্ন ইউনিভার্সিটির আইন বিভাগে ভর্তি হন গার্গী। পড়াশোনার খরচ চালাতে টিউশনি করেছেন, কোচিংয়ে পড়িয়েছেন, করেছেন খণ্ডকালীন চাকরিও। ২০২০-২১ সালের দিকে শুরু করেন ঘরে তৈরি গয়নার ব্যবসা।
কিন্তু জীবনের কঠিন সময় যেন তখনো বাকি ছিল।
আইন বিষয়ে স্নাতকের শেষ বর্ষে পড়ার সময় গার্গীর শরীরে ধরা পড়ে অ্যাঙ্কিলোজিং স্পন্ডিলাইটিস। এটি দীর্ঘমেয়াদি প্রদাহজনিত রোগ, যা মেরুদণ্ড ও বিভিন্ন সন্ধিতে প্রভাব ফেলতে পারে। ধীরে ধীরে বাড়তে থাকে ব্যথা। হাত-পা নাড়ানো, ঘাড় সোজা রাখা ও হাঁটাচলায় দেখা দেয় সমস্যা। একপর্যায়ে বন্ধ করতে হয় গয়নার ব্যবসা।
তবে অসুস্থতার কাছে হার মানেননি গার্গী। শারীরিক কষ্ট নিয়েই এলএলবি শেষ করেন ৩.৮৬ সিজিপিএ নিয়ে। এলএলএমে পান ৩.৮৮ সিজিপিএ। এরপর বাংলাদেশ ইউনিভার্সিটি অব প্রফেশনালসে (বিইউপি) মাস্টার্স ইন পিস, কনফ্লিক্ট অ্যান্ড হিউম্যান রাইটস স্টাডিজে ভর্তি হন।
তত দিনে তার শারীরিক অবস্থা আরও খারাপ হয়েছে। হুইলচেয়ারে করে বিশ্ববিদ্যালয়ে যেতে হতো তাঁকে। সে সময় বন্ধু নিজাম, শ্রীবতি ও রনক বিভিন্নভাবে সহযোগিতা করেছেন।
বর্তমানে গার্গীর রোগ জটিল পর্যায়ে রয়েছে। বাংলাদেশ মেডিকেল ইউনিভার্সিটির রিউমাটোলজিস্ট অধ্যাপক ডা. আবু শাহীনের তত্ত্বাবধানে চলছে তাঁর চিকিৎসা। পরিবারের ভাষ্য, তাঁর স্যাক্রোইলিয়াক (এসআই) জয়েন্ট, হিপ জয়েন্ট ও মেরুদণ্ডের কোমরের অংশের বিভিন্ন স্থানে জোড়া লেগে গেছে। অল্প হাঁটতেও লাঠির প্রয়োজন হয়। কখনো ব্যবহার করতে হয় হুইলচেয়ার।
দীর্ঘদিন অ্যাডালিমুম্যাব ও ইটানারসেপ্ট ইনজেকশন নিয়েছেন গার্গী। পরিবারের সদস্যদের দাবি, শুরুতে কিছুটা উপকার মিললেও পরে এসব চিকিৎসার কার্যকারিতা কমে আসে। দীর্ঘ চিকিৎসার মধ্যে দেখা দিয়েছে বিভিন্ন শারীরিক জটিলতাও।
এখন চিকিৎসকের পরামর্শে হিপ জয়েন্ট প্রতিস্থাপনের প্রস্তুতি চলছে। এরপর প্রদাহ নিয়ন্ত্রণে গোলিমুম্যাব ব্যবহারের পরিকল্পনা রয়েছে। নতুন চিকিৎসা শুরুর আগে প্রয়োজনীয় টিকা ও পরীক্ষা-নিরীক্ষা করানোর কথাও জানিয়েছে পরিবার।
বাবাকে হারানো, আর্থিক সংকট, পড়াশোনা ও অসুস্থতার কঠিন সময়ে গার্গীর পাশে রয়েছেন তাঁর জীবনসঙ্গী নিলয় ভৌমিক। চট্টগ্রাম প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় (চুয়েট) থেকে যন্ত্রকৌশলে পড়াশোনা শেষ করেছেন তিনি। ইচ্ছা ছিল বিদেশে গিয়ে পিএইচডি করার। কিন্তু গার্গীর চিকিৎসার কথা বিবেচনা করে সেই পরিকল্পনা থেকে সরে আসেন নিলয়।
স্ত্রীর চিকিৎসা ও অন্যান্য খরচে প্রতি মাসে প্রায় ৭০ থেকে ৮০ হাজার টাকা ব্যয় হয় বলে জানান তিনি। এই ব্যয় সামলাতে প্রাইভেট পড়ানো, কোচিংয়ে শিক্ষকতা এবং বিশ্ববিদ্যালয় ও কলেজে অতিথি শিক্ষক হিসেবে কাজ করেছেন। একপর্যায়ে ঋণেও জড়িয়ে পড়েন। চলতি বছরের জুনে বাংলাদেশ কমার্স ব্যাংকের প্রবেশনারি অফিসার পদে চাকরি পান নিলয়। তবে চাকরি পাওয়ার পরও আগের দেনা ও স্ত্রীর চিকিৎসার ব্যয় সামলাতে হিমশিম খেতে হচ্ছে তাঁকে।
নিলয় বলেন, ‘যখন আমি আমার প্রিয় মানুষকে সারাক্ষণ একটা অদৃশ্য যুদ্ধে লড়তে দেখি, দিন-রাত ব্যথার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে হাসতে দেখি, আর সবচেয়ে দুঃখের বিষয় হলো—এই ব্যথায় আমি ভাগ বসাতে পারি না, তখন নিজেকে অসহায় মনে হয়।’
তবে গার্গীর লড়াই তাকে নতুন করে আত্মবিশ্বাসী করে তোলে বলেও জানান নিলয়। এত সংগ্রামের পর একদিন সুদিন আসবে এমন আশাই তার।
উন্নত চিকিৎসার জন্য ভারতের চেন্নাইয়ের অ্যাপোলো হাসপাতালে যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে গার্গীর পরিবার। সেখানে চিকিৎসক ডা. মদন মোহন রেড্ডির অ্যাপয়েন্টমেন্ট নেওয়া হয়েছে এবং প্রয়োজনীয় নিবন্ধনও সম্পন্ন হয়েছে বলে জানিয়েছে পরিবার।
পরিবারের হিসাব অনুযায়ী, রোবোটিক পদ্ধতিতে হিপ জয়েন্ট প্রতিস্থাপনে প্রায় ২১ লাখ টাকা খরচ হতে পারে। রোগ নির্ণয়, হাসপাতাল ও অস্ত্রোপচারের অন্যান্য খরচে লাগতে পারে আরও প্রায় ১০ লাখ টাকা। এরপর প্রায় ছয় সপ্তাহের পুনর্বাসন, থাকা ও যাতায়াতসহ মোট ব্যয় দাঁড়াতে পারে প্রায় ৪০ লাখ টাকা বা তারও বেশি।
এর আগে গার্গীর চিকিৎসায় পরিবারের ৩৫ লাখ টাকার বেশি খরচ হয়েছে। সঞ্চয়, ধারদেনা ও বিভিন্নভাবে অর্থ জোগাড় করে এত দিন চিকিৎসা চালানো গেলেও নতুন করে এত টাকা জোগাড় করা কঠিন হয়ে পড়েছে।
গার্গীর মা পূর্ণিমা চ্যাটার্জী বলেন, ‘আমার মেয়েটা বড় অসুস্থ। মেয়েটার দিকে তাকিয়ে আবার নিজেরই কষ্ট হয়। ওর সারা শরীরে ব্যথা। কীভাবে ওর ব্যথা নির্মূল করব? আমার মেয়েটাকে আগের মতো দেখতে চাই। হাসুক, খেলুক।’
তিনি আরও বলেন, ‘আমি সব সময় ভালো একজন মানুষ হতে চেয়েছি। তেমন কোনো ইচ্ছে ছিল না জীবনে। ভেবেছিলাম বড় হয়ে পৃথিবী ঘুরে দেখব। তবে চার বছর এই রোগের সঙ্গে যুদ্ধ করে নতুন ভোর দেখতে পাওয়াই বড় প্রাপ্তি।’
গার্গীর চিকিৎসক অধ্যাপক ডা. আবু শাহীন বলেন, ‘গার্গী অত্যন্ত সাহসী একজন মেয়ে। ও অ্যাঙ্কিলোজিং স্পন্ডিলাইটিস রোগে আক্রান্ত। চার বছর ধরে আমার কাছে চিকিৎসা নিচ্ছে। স্বাভাবিক জীবনে ফিরে যেতে হলে গার্গীর দেশের বাইরে সার্জারি করানো প্রয়োজন। চেন্নাইয়ের অ্যাপোলো, সিএমসি ভেলোর কিংবা আইএসআইসি, নয়াদিল্লিতে চিকিৎসা করানো যেতে পারে। সার্জারি ও পরবর্তী পুনর্বাসনসহ ৩৫ থেকে ৪০ লাখ টাকা প্রয়োজন হবে।’
একসময় প্রকৌশলী হওয়ার স্বপ্ন দেখা গার্গী প্রতিকূলতার সঙ্গে লড়াই করে উচ্চশিক্ষা শেষ করেছেন। এখন তার স্বপ্ন, ব্যথামুক্ত হয়ে আবার স্বাভাবিক জীবনে ফেরা। সেই স্বপ্ন পূরণে প্রয়োজন পরিবারের সামর্থ্যের বাইরে থাকা বিপুল অর্থ।
গার্গী ও তার পরিবারের পক্ষ থেকে চিকিৎসার জন্য সামর্থ্যবান ব্যক্তি ও বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের সহযোগিতা চাওয়া হয়েছে।
চিকিৎসায় সহযোগিতা পাঠানোর তথ্য
হিসাবধারী: গার্গী চ্যাটার্জী
ব্যাংক: সোনালী ব্যাংক, পাঁচলাইশ শাখা
হিসাব নম্বর: ১০১৫৭০১০১২৫৭৬
বিকাশ/নগদ: ০১৭৮৪১৮৮৭৬০ (নিলয়)
যে আই