দেশ টেলিভিশন লিমিটেড, কর্ণফুলী মিডিয়া পয়েন্ট, ৪২, শহীদ সাংবাদিক সেলিনা পারভীন সড়ক, মালিবাগ, ঢাকা-১২১৭, বাংলাদেশ।
টেলিফোন: +৮৮ (০২) ৮৩৩২৯৫৮, ৮৩৩২৯২২ ফ্যাক্স: +৮৮ (০২) ৮৩৩২৯৮১ মেইল: [email protected]

নওগাঁর ধামইরহাটে জমি নিয়ে বিরোধের জেরে বসতবাড়ি ভাঙচুর, ভাড়াটিয়াদের মারধর করে মাঝরাতে উচ্ছেদ, মালামাল নিয়ে যাওয়া ও গাছপালা কেটে ফেলার অভিযোগ উঠেছে বিএনপি ও এর সহযোগী সংগঠনের কয়েকজন নেতার বিরুদ্ধে। ঘটনার ১২ দিন পেরিয়ে গেলেও থানায় মামলা হয়নি বলে অভিযোগ করেছেন ভুক্তভোগীরা। তাঁদের দাবি, থানায় লিখিত অভিযোগ দেওয়ার পরও পুলিশ মামলা নেয়নি। তবে ধামইরহাট থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. মিন্টু রহমান বলেছেন, এ ঘটনায় কোনো ধরনের রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ বা বাহ্যিক চাপ নেই। বিষয়টি আদালতের রায় ও আইনি জটিলতার সঙ্গে সম্পর্কিত।
জমি নিয়ে বিরোধের কেন্দ্রে থাকা একটি দলিলের গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন তুলে ২০২১ সালের ৪ নভেম্বর সংশ্লিষ্ট নামজারি বাতিল করেছিলেন ধামইরহাটের তৎকালীন সহকারী কমিশনার (ভূমি) শিব্বির আহমেদ। ওই আদেশে দলিলের প্রথম ও শেষ পৃষ্ঠায় সাবরেজিস্ট্রারের স্বাক্ষরের গরমিল এবং একাধিক স্থানে মহাদেবপুর ও পত্নীতলা সাবরেজিস্ট্রি অফিসের সিল থাকার কথা উল্লেখ করা হয়। দলিলটির সার্টিফায়েড কপি চাওয়া হলেও তা দেখাতে পারেননি সংশ্লিষ্ট পক্ষের একজন—আদেশে এমন তথ্য রয়েছে।
গতকাল সরেজমিনে ধামইরহাট পৌরসভার ২ নম্বর ওয়ার্ডের দক্ষিণ ফার্সিপাড়া এলাকায় গিয়ে বাড়িটির দরজা, জানালা, দেয়াল ও আসবাবপত্র ভাঙচুরের চিহ্ন দেখা যায়।
ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, গত ১ অক্টোবর দিবাগত রাত দেড়টার দিকে দলবদ্ধ হয়ে তাঁদের বাড়িতে হামলা চালানো হয়। পাঁচটি ইটের ঘর ভাঙচুর করে ভাড়াটিয়াদের মারধর করে বের করে দেওয়া হয়। ঘটনার পরও ভাড়াটিয়াদের কয়েকজন ওই ভাঙা বাড়িতে বসবাস করছেন।
এ ঘটনায় সোলায়মান আলী (২৭) বাদী হয়ে তোজাম্মেল হক, ইব্রাহিম হোসেন, আব্দুল হামিদ, ইসা, মেহেরুল হাসান মেবু ও মতিবুলের নাম উল্লেখ করে অজ্ঞাতনামা আরও ৫০ থেকে ৬০ জনের বিরুদ্ধে থানায় লিখিত অভিযোগ দিয়েছেন। তাঁদের মধ্যে ইব্রাহিম হোসেন ধামইরহাট উপজেলা শ্রমিক দলের সভাপতি, মেহেরুল হাসান মেবু একই সংগঠনের সাধারণ সম্পাদক এবং আব্দুল হামিদ উপজেলা রিকশা ও অটোরিকশা শ্রমিক দলের সভাপতি বলে জানা গেছে।

ধামইরহাট উপজেলা ভূমি অফিসের ২০২১ সালের ৪ নভেম্বরের আদেশ অনুযায়ী, ২০২০-২১ সালের ২০/১৩-২০২০-২১ নম্বর মিস মামলার শুনানি শেষে ১৩৫৫/১/২০১৯-২০ নম্বর নামজারি বাতিল করা হয়।
আদেশে বলা হয়, আব্দুল কুদ্দুস ও শরীফ উদ্দিন আমাইতাড়া মৌজার আরএস ১১৩ নম্বর খতিয়ানের রেকর্ডীয় মালিক হাজেরা বিবির কাছ থেকে ১৩৫৮/৯৭ নম্বর দলিলে এবং ময়েন উদ্দিন মণ্ডলের কাছ থেকে ২৫৭০/৯৭ নম্বর দলিলে জমি কেনেন। দুই দলিলে তাঁদের মোট ১ দশমিক ০২ একর জমি কেনার তথ্য উল্লেখ রয়েছে।
অন্যদিকে বিবাদীপক্ষের দাখিল করা হাজেরা বিবির কাছ থেকে প্রাপ্ত ৩৫৮/১৯৭৪ নম্বর দলিলের প্রথম পৃষ্ঠার সঙ্গে শেষ পৃষ্ঠায় সাবরেজিস্ট্রারের স্বাক্ষরের গরমিল পাওয়া যায় বলে আদেশে উল্লেখ করা হয়। দলিলটির বিভিন্ন স্থানে মহাদেবপুর ও পত্নীতলা সাবরেজিস্ট্রি অফিসের সিলও ছিল। দলিলটি সন্দেহজনক মনে হওয়ায় তোজাম্মেল মণ্ডলকে এর সার্টিফায়েড কপি দেখাতে বলা হয়েছিল। কিন্তু তিনি তা দেখাতে পারেননি।
আদেশে আরও বলা হয়, ইউনিয়ন ভূমি সহকারী কর্মকর্তার প্রতিবেদনে নালিশি তফসিলভুক্ত জমি আবেদনকারীদের ভোগদখলে থাকার তথ্য পাওয়া গেছে। এসব বিষয় পর্যালোচনা করে তৎকালীন এসিল্যান্ড শিব্বির আহমেদ নামজারি বাতিলের নির্দেশ দেন।
সোলায়মান আলীর অভিযোগ, জমিজমা নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে অভিযুক্তদের সঙ্গে তাঁদের বিরোধ চলছে। এর জের ধরে ১ অক্টোবর রাতে অভিযুক্তরা দলবদ্ধ হয়ে বাড়িতে প্রবেশ করেন। এ সময় তাঁকে মারধর করা হয়। তাঁকে রক্ষা করতে এগিয়ে এলে তাঁর বড়মা গুলছিয়ারা বেগমকেও মারধর করা হয়। একপর্যায়ে ধারালো কুড়ালের আঘাতে গুলছিয়ারার ডান পায়ের বৃদ্ধাঙ্গুলিতে আঘাত লাগে বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে। তবে তাঁর আঘাত গুরুতর নয় বলে জানা গেছে।

সোলায়মানের ভাষ্য, তাকে কুড়াল দিয়ে আঘাতের চেষ্টা করা হলে তিনি সরে যান। এতে আঘাতটি তাঁর ডিসকভার ১২৫ সিসি মোটরসাইকেলের জ্বালানি ট্যাংকে লাগে। এ ছাড়া বাড়ির পাঁচটি ইটের ঘর ও আসবাবপত্র ভাঙচুর করা হয়। শয়নকক্ষে খাটের তোশকের নিচে রাখা ২০ হাজার টাকা, একটি গ্যাস সিলিন্ডার, পাঁচটি সিলিং ফ্যান, একটি পানির মোটর, টিউবওয়েলের মাথাসহ বিভিন্ন মালামাল নিয়ে যাওয়ার অভিযোগও করেছেন তিনি।
বাড়ির বৈদ্যুতিক মিটার ভাঙচুরের পাশাপাশি প্রায় ১২০টি কলাগাছ, দুটি আমগাছ, দুটি কাঁঠালগাছ, চারটি আমলকীগাছ ও পাঁচটি আতাফলগাছ কেটে ফেলার অভিযোগ রয়েছে। এসব ঘটনায় কয়েক লাখ টাকার ক্ষতি হয়েছে বলে দাবি সোলায়মানের।
বাড়ির ভাড়াটিয়া দুলাল হোসেন বলেন, প্রায় ছয় বছর ধরে তাঁরা সেখানে ভাড়া থাকেন। নিয়মিত ভাড়া পরিশোধ করেই বসবাস করছিলেন। ঘটনার রাতের বর্ণনা দিয়ে তিনি বলেন, ‘হঠাৎ রাতের বেলা ৫০-৬০ জনের মতো লোক এসে বিদ্যুতের সংযোগ বন্ধ করে দেয়। এরপর বাড়ি ভাঙচুর শুরু করে। মাঝরাতে আমাদের বাসা থেকে বের করে দেয়, মারধরও করে। টাকা-পয়সা, মোবাইল ফোন, হাঁড়ি-পাতিল, খাট-বিছানা ও টেলিভিশনসহ সবকিছু ভাঙচুর করেছে। এতে আমাদের লক্ষাধিক টাকার ক্ষতি হয়েছে।’
দুলাল আরও বলেন, ‘১ অক্টোবরের পর থেকে ১২ দিন ধরে এই ভাঙা বাড়িতেই থাকছি। দরজা-জানালা নেই, এমনকি টয়লেটও ভেঙে ফেলেছে। এ অবস্থায় মানুষ এখানে কীভাবে থাকবে?’
প্রতিবেশী আরিফুল ইসলাম বলেন, জন্মের পর থেকেই তিনি জমিজমা সোলায়মানদের দখলে দেখে আসছেন। বাড়ির সামনের বাগানের গাছগুলোও তাঁদের লাগানো। তাঁর অভিযোগ, ১ অক্টোবর মাঝরাতে তোজাম্মেল, ইব্রাহিম, হামিদ, মেবু, লতিফ ও সিরাজুলসহ শতাধিক লোক এসে বাড়ির ভাড়াটিয়াসহ সবাইকে মারধর করে বের করে দেন এবং বাড়িঘর ভাঙচুর করেন।
সোলায়মান আলী জানান, ঘটনার পর তিনি ও গুলছিয়ারা বেগম ধামইরহাট উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে চিকিৎসা নেন। পরে থানায় লিখিত অভিযোগ করেন। তবে ঘটনার প্রায় ১২ দিন পেরিয়ে গেলেও মামলা হয়নি বলে তাঁর অভিযোগ।
মামলা না হওয়ার বিষয়ে জানতে চাইলে ধামইরহাট থানার ওসি মো. মিন্টু রহমান বলেন, এ ঘটনায় কোনো ধরনের রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ বা বাহ্যিক চাপ নেই। বিষয়টি মূলত আইনি জটিলতা এবং আদালতের রায়ের সঙ্গে সম্পর্কিত।
ওসি বলেন, ‘বিজ্ঞ আদালতের সুনির্দিষ্ট পর্যবেক্ষণ ও রায় রয়েছে। সেই রায়ের মাধ্যমেই সংশ্লিষ্ট পক্ষকে ওই জমিতে বা জায়গায় প্রতিষ্ঠিত করা হয়েছে। আদালতের সিদ্ধান্তের বাইরে গিয়ে পুলিশের পক্ষে আলাদা কোনো পদক্ষেপ নেওয়ার সুযোগ নেই।’
তিনি আরও বলেন, ‘পুলিশ এখানে নতুন করে কোনো বিচার বা সিদ্ধান্ত দেয়নি। বিজ্ঞ আদালত উভয় পক্ষের যাবতীয় কাগজপত্র ও তথ্য-প্রমাণ পর্যালোচনা করেই রায় দিয়েছেন। আদালতের সেই রায়ের আলোকেই সবকিছু পরিচালিত হচ্ছে।’
তবে বাড়িঘর ভাঙচুর, মারধর ও মালামাল নিয়ে যাওয়ার অভিযোগে থানায় দেওয়া লিখিত অভিযোগের বিষয়ে কী পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে, সে বিষয়ে ওসির বক্তব্যে বিস্তারিত জানা যায়নি।
অভিযোগের বিষয়ে বক্তব্য জানতে ধামইরহাট উপজেলা শ্রমিক দলের সভাপতি ইব্রাহিম হোসেন ও সাধারণ সম্পাদক মেহেরুল হাসান মেবুকে একাধিকবার ফোন করা হয়। তাঁদের খুদে বার্তাও পাঠানো হয়। তবে কোনো সাড়া পাওয়া যায়নি।

উপজেলা রিকশা ও অটোরিকশা শ্রমিক দলের সভাপতি আব্দুল হামিদ দাবি করেন, বাড়িঘরের দখল তাঁদের রয়েছে এবং প্রতিপক্ষের লোকজন তাঁদের বাড়িঘর ভাঙচুর করেছেন।
বাড়িটির সকল ভাড়াটিয়া, এলাকাবাসী, দোকানদার ও স্থানীয় লোকজন বলছেন ওই বাসা বাড়ি এবং জমা জমি কখনোই আপনাদের দখলে ছিল না, আপনারা জোর করে দখলের চেষ্টা করছেন এমন প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন, তাঁরা সবাই প্রতিপক্ষের লোকজন। এ কারণে এমন কথা বলছেন।
স্থানীয় সংসদ সদস্য প্রকৌশলী এনামুল হক বলেন, ঘটনার পরদিন তিনি বিষয়টি জানতে পারেন। এরপর একজন প্রতিনিধিকে ঘটনাস্থলে পাঠান এবং পরে নিজেও ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেন।
তিনি বলেন, ‘আমি প্রশাসনকে বলেছি, ধামইরহাটে এমন ঘটনা আগে কখনো ঘটেনি। আপনারা তদন্ত সাপেক্ষে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেন।’ তবে প্রশাসন এখন পর্যন্ত কী ব্যবস্থা নিয়েছে, তা তিনি জানেন না বলে জানান।
ঘটনার পর থেকে বাড়িটির ভাঙা অংশে বসবাস করতে বাধ্য হচ্ছেন ভাড়াটিয়ারা। তাঁদের নিরাপত্তা ও ক্ষয়ক্ষতি নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। ভুক্তভোগীরা ঘটনার নিরপেক্ষ তদন্ত, দায়ীদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা এবং নিজেদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছেন।
কে