দেশ টেলিভিশন লিমিটেড, কর্ণফুলী মিডিয়া পয়েন্ট, ৪২, শহীদ সাংবাদিক সেলিনা পারভীন সড়ক, মালিবাগ, ঢাকা-১২১৭, বাংলাদেশ।
টেলিফোন: +৮৮ (০২) ৮৩৩২৯৫৮, ৮৩৩২৯২২ ফ্যাক্স: +৮৮ (০২) ৮৩৩২৯৮১ মেইল: [email protected]

দক্ষিণাঞ্চলের গুরুত্বপূর্ণ জেলা ঝালকাঠির প্রধান যোগাযোগকেন্দ্র পৌর বাস টার্মিনাল। প্রতিদিন জেলার বিভিন্ন প্রান্তসহ দেশের নানা অঞ্চলের হাজারো মানুষ এই টার্মিনাল ব্যবহার করেন। অথচ নির্মাণের প্রায় তিন যুগ পেরিয়ে গেলেও আধুনিকতার ছোঁয়া লাগেনি টার্মিনালটিতে। দীর্ঘদিনের অবহেলা ও রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে টার্মিনালজুড়ে সৃষ্টি হয়েছে অসংখ্য খানাখন্দ। সামান্য বৃষ্টিতেই জমে যায় কাদা-পানি। কোথাও কোথাও বড় বড় গর্ত তৈরি হয়ে পড়ে মরণফাঁদে। এতে প্রতিনিয়ত ছোটখাটো দুর্ঘটনার শিকার হচ্ছেন যাত্রী ও পরিবহন শ্রমিকরা।
যাত্রীদের জন্য নির্মিত অপেক্ষমাণ কক্ষটিও বর্তমানে শ্রমিক ইউনিয়নের কার্যালয় হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে। নেই আধুনিক গণশৌচাগার, বিশুদ্ধ পানির ব্যবস্থা কিংবা প্রয়োজনীয় অন্যান্য নাগরিক সুবিধা। ফলে নারী, শিশু, বয়স্ক ও অসুস্থ যাত্রীদের দুর্ভোগ সবচেয়ে বেশি।
বর্ষা এলে টার্মিনালের চিত্র আরও ভয়াবহ হয়ে ওঠে। সামান্য বৃষ্টিতেই পুরো এলাকা কাদা-পানিতে তলিয়ে যায়। স্থানীয় কিশোর-তরুণদের কেউ কেউ তখন ওই কাদাপানিতে খেলায় মেতে ওঠেন। দেখে মনে হয়, এটি কোনো গ্রামের মাঠ। অথচ এটি প্রথম শ্রেণির ঝালকাঠি পৌরসভার প্রধান বাস টার্মিনাল। আবার শুষ্ক মৌসুমে ধুলাবালিতে ঢেকে যায় পুরো এলাকা।
টার্মিনালে প্রবেশ ও বের হওয়ার পথের অবস্থাও নাজুক। ভাঙাচোরা সড়ক ও খানাখন্দের কারণে বাস চলাচলে বিঘ্ন ঘটে। বাসে ওঠা-নামার সময় প্রায়ই ছোটখাটো দুর্ঘটনার শিকার হন যাত্রীরা। ভেতরে সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনার অভাবে সৃষ্টি হয় যানজট ও বিশৃঙ্খলা।
জানা গেছে, ১৯৮৮ সালে তৎকালীন খুলনা বিভাগীয় উন্নয়ন বোর্ড ঝালকাঠি পৌর বাস টার্মিনালটি নির্মাণ করে। প্রায় এক একর জমির ওপর একতলা ভবনসহ নির্মিত টার্মিনালটির উদ্বোধন করেন তৎকালীন ঝালকাঠি জেলা প্রশাসক আলতাফ হোসেন।
উদ্বোধনের পর দীর্ঘ সময় পেরিয়ে গেলেও টার্মিনালটির উল্লেখযোগ্য কোনো সংস্কার, উন্নয়ন বা আধুনিকায়ন হয়নি। সময়ের সঙ্গে জেলার জনসংখ্যা ও যানবাহনের সংখ্যা বাড়লেও সে তুলনায় বাড়েনি টার্মিনালের অবকাঠামোগত সুবিধা। বর্তমানে পুরোনো ভবনটিও জরাজীর্ণ অবস্থায় রয়েছে।
একটি আধুনিক জেলা শহরের প্রধান যোগাযোগকেন্দ্রে যে ধরনের সুযোগ-সুবিধা থাকার কথা, তার ন্যূনতম অনেক কিছুই নেই এখানে।
ঝালকাঠি পৌর বাস টার্মিনাল থেকে বরিশাল, ভান্ডারিয়া, খুলনা, পিরোজপুর, মঠবাড়িয়া, পাথরঘাটা, বরগুনাসহ বিভিন্ন গন্তব্যে বাস চলাচল করে। অভ্যন্তরীণ আটটি রুটসহ দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চল ও ঢাকার সঙ্গে মোট ২২টি রুটে বাস চলাচল করে বলে জানা গেছে। এ ছাড়া চট্টগ্রাম, রাজশাহীসহ দূরপাল্লার বিভিন্ন রুটের বাসও এই টার্মিনাল ব্যবহার করে।
প্রতিদিন কয়েক হাজার যাত্রী টার্মিনালটি ব্যবহার করলেও তাদের জন্য নেই মানসম্মত অপেক্ষমাণ কক্ষ। রোদে পুড়ে, বৃষ্টিতে ভিজে ঘণ্টার পর ঘণ্টা বাসের অপেক্ষায় থাকতে হয়। নারী, শিশু, বয়স্ক ও অসুস্থ যাত্রীদের দুর্ভোগ আরও বেশি। প্রয়োজনীয় পয়োনিষ্কাশন ও স্বাস্থ্যসম্মত শৌচাগারের ব্যবস্থা না থাকায় যাত্রীদের পড়তে হয় চরম ভোগান্তিতে।
প্রথম শ্রেণির পৌরসভা ঝালকাঠির প্রধান বাস টার্মিনালের এমন বেহাল দশায় ক্ষোভ বাড়ছে স্থানীয়দের মধ্যে। দেশের বিভিন্ন জেলায় আধুনিক বাস টার্মিনাল গড়ে উঠলেও এখনো পিছিয়ে রয়েছে ঝালকাঠি। তিন দশকেরও বেশি সময় ধরে কাদাপানি, খানাখন্দ, ধুলাবালি আর নাগরিক সুবিধার সংকট নিয়েই চলছে গুরুত্বপূর্ণ এই যোগাযোগকেন্দ্রটি।
বরিশালগামী যাত্রী শিউলি বেগম বলেন, ঝালকাঠি বাস টার্মিনালের অবস্থা খুবই খারাপ। বাসে ওঠা-নামার সময় অসংখ্য খানাখন্দের কারণে চরম দুর্ভোগ পোহাতে হয়। বিশেষ করে বৃষ্টি হলে পুরো টার্মিনাল কাদায় ভরে যায়। এত বছরেও একটি আধুনিক বাস টার্মিনাল না হওয়ায় আমরা হতাশ।
টিকিট কাউন্টার কর্মী হিরু বলেন, প্রতিদিন শত শত যাত্রী এই টার্মিনাল ব্যবহার করেন। কিন্তু অবকাঠামোগত দুরবস্থার কারণে যাত্রীদের যেমন ভোগান্তি পোহাতে হয়, তেমনি আমাদেরও কাজ করতে নানা সমস্যার মুখোমুখি হতে হয়। দ্রুত একটি আধুনিক বাস টার্মিনাল নির্মাণ করা হলে যাত্রীসেবা যেমন উন্নত হবে, তেমনি পরিবহন ব্যবস্থাপনাও সহজ হবে।
টার্মিনালের বেহাল অবস্থায় শুধু যাত্রীরাই নন, পরিবহন শ্রমিক ও বাসচালকরাও ভোগান্তিতে রয়েছেন। বাসের নিচে দাঁড়িয়ে প্রয়োজনীয় যান্ত্রিক পরীক্ষা-নিরীক্ষা কিংবা ইঞ্জিনের কাজ করার মতো পরিবেশও নেই।
বাসচালক মো. রিপন বলেন, বাস টার্মিনালের বেহাল অবস্থার কারণে বাসস্ট্যান্ডে বসে প্রয়োজনীয় যান্ত্রিক পরীক্ষা-নিরীক্ষা বা ইঞ্জিন পরীক্ষা করা সম্ভব হয় না। টার্মিনালের সর্বত্র খানাখন্দ ও কাদাপানির কারণে গাড়ির নিচে কাজ করা ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়ে। এতে সামান্য ত্রুটি থাকলেও তাৎক্ষণিকভাবে মেরামত করা যায় না। ফলে যাত্রীদের নিরাপত্তা ও সময়মতো বাস চলাচল উভয়ই বিঘ্নিত হয়।
ঝালকাঠি জেলা বাস মালিক সমিতির সভাপতি আনিচুর রহমান তাপু বলেন, পৌরসভা প্রতি বছর বাস টার্মিনাল থেকে বিপুল পরিমাণ রাজস্ব আদায় করলেও এর ন্যূনতম সংস্কার করা হয় না। দীর্ঘদিন ধরে টার্মিনালটি চরম অবহেলায় পড়ে আছে। এতে সাধারণ যাত্রীদের পাশাপাশি পরিবহন মালিক ও শ্রমিকরাও নানাভাবে ভোগান্তির শিকার হচ্ছেন।
তিনি বলেন, ভিমরুলি পেয়ারা বাগানসহ জেলার বিভিন্ন পর্যটনকেন্দ্রে দেশের নানা প্রান্ত থেকে পর্যটক আসেন। একটি আধুনিক বাস টার্মিনাল থাকলে আরও বেশি পর্যটক বাসযোগে আসতে আগ্রহী হতেন।
আনিচুর রহমান তাপু আরও বলেন, আমরা বহুবার সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে আধুনিক বাস টার্মিনাল নির্মাণ ও সংস্কারের দাবি জানিয়েছি। ঝালকাঠির মতো গুরুত্বপূর্ণ জেলা শহরের জন্য একটি পরিকল্পিত ও আধুনিক বাস টার্মিনাল এখন সময়ের দাবি। দ্রুত উন্নয়নকাজ বাস্তবায়ন করা হলে যাত্রীসেবার মান বাড়বে, দুর্ঘটনার ঝুঁকি কমবে এবং জেলার সামগ্রিক যোগাযোগ ব্যবস্থারও উন্নয়ন হবে।
দীর্ঘদিনের দুর্ভোগের অবসানে এবার আধুনিক বাস টার্মিনাল নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছে পৌর কর্তৃপক্ষ। উপকূলীয় শহর জলবায়ু সহিষ্ণু প্রকল্পের আওতায় প্রায় ২০ কোটি টাকা ব্যয়ে আধুনিক বাস টার্মিনাল নির্মাণের প্রস্তাব পাঠানো হয়েছে। প্রকল্পের জরিপ ও নকশা প্রণয়নের কাজও সম্পন্ন হয়েছে বলে জানিয়েছে পৌরসভা।
ঝালকাঠি পৌর নির্বাহী কর্মকর্তা মোসা. সাহিন সুলতানা বলেন, ঝালকাঠি পৌরসভার বাসস্ট্যান্ডকে আধুনিক বাস টার্মিনালে রূপান্তরের লক্ষ্যে উপকূলীয় শহর জলবায়ু সহিষ্ণু প্রকল্পের আওতায় প্রায় ২০ কোটি টাকার একটি প্রকল্পের প্রস্তাব পাঠানো হয়েছে। ইতোমধ্যে প্রকল্পের জরিপ ও নকশা প্রণয়নের কাজ সম্পন্ন হয়েছে। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের অনুমোদন পাওয়ামাত্রই দরপত্র প্রক্রিয়া শেষে নির্মাণকাজ শুরু করার উদ্যোগ নেওয়া হবে।
পৌর কর্তৃপক্ষের এমন আশ্বাসে নতুন করে আশায় বুক বাঁধছেন যাত্রী, পরিবহন শ্রমিক ও স্থানীয়রা। তবে দীর্ঘদিন ধরে একের পর এক আশ্বাসের পরও বাস্তবে টার্মিনালের চিত্র বদলায়নি এমন অভিযোগও রয়েছে স্থানীয়দের।
প্রতিদিন হাজারো যাত্রীর চলাচল এবং জেলার পর্যটন সম্ভাবনা বিবেচনায় একটি আধুনিক ও পরিকল্পিত বাস টার্মিনালের প্রয়োজনীয়তা এখন সময়ের দাবি। ২০ কোটি টাকার প্রস্তাবিত প্রকল্পটি কবে চূড়ান্ত অনুমোদন পাবে, কবে দরপত্র হবে এবং কবে নির্মাণকাজ শুরু হবে সেদিকেই তাকিয়ে ঝালকাঠিবাসী।
তিন যুগের অবহেলার অবসান ঘটিয়ে আধুনিক বাস টার্মিনাল নির্মাণের স্বপ্ন কবে বাস্তবে রূপ নেবে, এখন সেটিই বড় প্রশ্ন।
যে আই