দেশ টেলিভিশন লিমিটেড, কর্ণফুলী মিডিয়া পয়েন্ট, ৪২, শহীদ সাংবাদিক সেলিনা পারভীন সড়ক, মালিবাগ, ঢাকা-১২১৭, বাংলাদেশ।
টেলিফোন: +৮৮ (০২) ৮৩৩২৯৫৮, ৮৩৩২৯২২ ফ্যাক্স: +৮৮ (০২) ৮৩৩২৯৮১ মেইল: [email protected]

ঘড়ির কাঁটায় তখন ঠিক সকাল ১০টা ৫৩ মিনিট। সিরাজগঞ্জ শিল্পকলা একাডেমি প্রাঙ্গণে তখন ছোটাছুটি, কৌতূহল আর নানা উদ্ভাবন দেখার ব্যস্ততা। এরই মধ্যে একটি স্টলের ভিতরে দাঁড়িয়ে আগ্রহ নিয়ে কথা বলছিল পাঁচ বছরের শিশু আব্দুল্লাহ।
বয়স মাত্র পাঁচ বছর। তবে কথা বলার ধরন শুনলে মনে হবে, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি নিয়ে বেশ কিছুদিন ধরেই ভাবছে সে। বাবা-মায়ের সহযোগিতায় তৈরি করা নিজের স্টলের দাঁড়িয়ে দর্শনার্থীদের দেখাচ্ছিল ছোট ছোট প্লে-কার্ড। কোনোটিতে সৌরবিদ্যুৎ, কোনোটিতে নিরাপদ পানি ও পুষ্টিকর খাবার, আবার কোনোটিতে নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার প্রতিটি বিষয়ই সহজ করে বোঝানোর চেষ্টা করছিল সে।
আব্দুল্লাহর প্রকল্পের নাম ‘প্রকৃতি ও টেকসই প্রযুক্তিতে আলোকিত ভবিষ্যৎ’।
আব্দুল্লাহ ইবনে হাইসাম বিজ্ঞান মাদরাসার প্লে-শ্রেণির শিক্ষার্থী এবং আব্দুস সাত্তার ও জান্নাতুন নাইমের সন্তান।
বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সংকট মোকাবিলায় বিকল্প ও টেকসই প্রযুক্তির অনুসন্ধান, নিরাপদ পানি ও পুষ্টিকর খাদ্য নিশ্চিত করা, সৌরবিদ্যুৎ, জলবিদ্যুৎ ও বায়োগ্যাসের মতো নবায়নযোগ্য শক্তির ব্যবহার এসব বিষয়ই উঠে এসেছে তার প্রকল্পে। পাশাপাশি প্রকৃতি ও পরিবেশ সংরক্ষণের মাধ্যমে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য একটি টেকসই ও স্বনির্ভর পৃথিবীর ধারণাও তুলে ধরেছে সে।
কখনো কোনো দর্শনার্থী প্রশ্ন করছে, আবার কখনো নিজেই সামনে থাকা কার্ড দেখিয়ে বিষয়টি বুঝিয়ে দিচ্ছে আব্দুল্লাহ। বয়সে ছোট হলেও তার কথায় নিজের ভবিষ্যৎ নিয়ে বড় স্বপ্নের কথা শোনা গেল।
আব্দুল্লাহ বলল, আমি দেশের জন্য কাজ করতে চাই। দেশের মানুষের জন্য কিছু করতে চাই। সত্যিকারের ভালো মানুষ হয়ে বেঁচে থাকতে চাই।
আব্দুল্লাহ একা নয়। তার মতো আরও অনেক খুদে শিক্ষার্থী নিজেদের ভাবনা ও স্বপ্ন নিয়ে হাজির হয়েছিল বিজ্ঞান মেলায়। কারও চিন্তায় অন্ধ মানুষের দৃষ্টিশক্তি ফিরিয়ে দেওয়ার গবেষণা, কেউ ভাবছে কৃষিকে আরও শক্তিশালী করার প্রযুক্তি নিয়ে। আবার কেউ চাইছে আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়িয়ে দেশকে আরও এগিয়ে নিতে। কেউ কেউ সৌর বিদ্যুৎ বা বায়ুবিদ্যুৎ নিয়ে ভাবছেন, আবার কেউ ভাবছেন কীভাবে বিদ্যুৎ সাশ্রয় করা যায়।
সিরাজগঞ্জ শিল্পকলা একাডেমি প্রাঙ্গণে ইবনে হাইসাম বিজ্ঞান মাদরাসার আয়োজনে অনুষ্ঠিত ‘ইবনে হাইসাম বিজ্ঞান উৎসব ২০২৬’-এ ছিল এমনই নানা ভাবনা ও উদ্ভাবনের প্রদর্শনী। শনিবার দিনব্যাপী এ উৎসবে চারটি গ্রুপে মোট ৬৭টি স্টল বসানো হয়।
আয়োজকেরা জানান, প্লে ও নার্সারি শ্রেণির শিক্ষার্থীদের নিয়ে Nova kids এর একটি গ্রুপ, প্রথম ও দ্বিতীয় শ্রেণির শিক্ষার্থীদের নিয়ে Science Sparks দ্বিতীয়, তৃতীয় ও চতুর্থ শ্রেণির শিক্ষার্থীদের নিয়ে Tech Titans তৃতীয় এবং পঞ্চম থেকে সপ্তম শ্রেণির শিক্ষার্থীদের নিয়ে Cosmic Thinkers চতুর্থ গ্রুপ করা হয়।

খুদে বিজ্ঞানীদের তৈরি প্রকল্প দেখতে সকাল থেকেই শিক্ষার্থী, অভিভাবক ও দর্শনার্থীদের ভিড় ছিল। কেউ প্রকল্প দেখছে, কেউ আবার খুদে উদ্ভাবকদের কাছে জানতে চাইছে কীভাবে কাজ করে তাদের তৈরি প্রযুক্তি, এর ব্যবহার কোথায় এবং মানুষের কী উপকার হতে পারে।
শিক্ষার্থীদের বিজ্ঞানমনস্ক করে তুলতেই এ আয়োজন বলে জানান আয়োজকেরা। তাঁদের ভাষ্য, শুধু বইয়ের পাতায় বিজ্ঞান শেখানো নয়, বাস্তব জীবনের নানা সমস্যা নিয়ে শিশুদের ভাবতে উৎসাহিত করাই মেলার অন্যতম উদ্দেশ্য।
মেলায় অংশ নেওয়া শিক্ষার্থীদের উৎসাহ দিতে ছিল পুরস্কারের ব্যবস্থাও। চারটি গ্রুপের প্রথম, দ্বিতীয় ও তৃতীয় স্থান অধিকারী শিক্ষার্থীদের মোট ৫০ হাজার টাকার শিক্ষাবৃত্তি দেওয়ার পাশাপাশি সম্মাননা ক্রেস্ট দেওয়ার কথা জানানো হয়।
দিনব্যাপী এ আয়োজনের শুরুতে জাতীয় পতাকা উত্তোলন, ফিতা কাটা ও কবুতর উড়িয়ে বিজ্ঞান উৎসবে উদ্বোধন করা হয়। উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন সিরাজগঞ্জ সরকারি কলেজের সাবেক অধ্যক্ষ আমিনুল ইসলাম। পরে তিনি মেলার বিভিন্ন স্টল ঘুরে শিক্ষার্থীদের তৈরি প্রকল্প দেখেন এবং তাদের সঙ্গে কথা বলেন।
দুপুরের পর ছিল সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান। শিক্ষার্থীরা নাটিকা, একক অভিনয়সহ বিভিন্ন পরিবেশনায় অংশ নেয়। অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন এম এ মতিন চক্ষু হাসপাতালের অধ্যাপক ডা. নজমুল হক।
ইবনে হাইসাম বিজ্ঞান মাদরাসার দুটি ক্যাম্পাসে প্লে থেকে সপ্তম শ্রেণি পর্যন্ত প্রায় এক হাজারের বেশি শিক্ষার্থী পড়াশোনা করে। তাঁদের পাঠদানে রয়েছেন ৮০ জন শিক্ষক।

মেলার স্টলগুলো ঘুরে দেখা যায়, বয়সের সঙ্গে সঙ্গে শিক্ষার্থীদের ভাবনার পরিধিও যেন বদলে গেছে। কেউ পরিবেশ নিয়ে ভাবছে, কেউ কৃষি নিয়ে, কেউ প্রযুক্তি নিয়ে। তবে সবার ভাবনার কেন্দ্রে একটি বিষয় কীভাবে নতুন কিছু করা যায়, কীভাবে মানুষের কাজে লাগা যায়। সেই স্বপ্নেরই সবচেয়ে ছোট মুখগুলোর একজন আব্দুল্লাহ। পাঁচ বছর বয়সে সে হয়তো এখনো জানে না বিজ্ঞান কতটা বড় একটি জগৎ। কিন্তু নিজের ছোট্ট স্টলের সামনে দাঁড়িয়ে যে আগ্রহ নিয়ে সে দর্শনার্থীদের বোঝাচ্ছিল, তাতে মনে হচ্ছিল বিজ্ঞান উৎসবের এই ছোট্ট প্রদর্শনীই হয়তো তার বড় স্বপ্নের প্রথম ধাপ।
ইসলাম ও বিজ্ঞান শিক্ষার সমন্বয়ে প্রতিষ্ঠিত ইবনে হাইসাম চেয়ারম্যান ড. এম এ আব্দুস সবুর জানান, আজকের বিজ্ঞান উৎসব বার্ষিক কার্যক্রমের অংশ এই উৎসবের মাধ্যমে শিক্ষার্থীরা বিজ্ঞান গবেষণায় উদ্ধুদ্ধ ও বিজ্ঞান মনস্ক হয়ে কাজ করবে।
কে