দেশ টেলিভিশন লিমিটেড, কর্ণফুলী মিডিয়া পয়েন্ট, ৪২, শহীদ সাংবাদিক সেলিনা পারভীন সড়ক, মালিবাগ, ঢাকা-১২১৭, বাংলাদেশ।
টেলিফোন: +৮৮ (০২) ৮৩৩২৯৫৮, ৮৩৩২৯২২ ফ্যাক্স: +৮৮ (০২) ৮৩৩২৯৮১ মেইল: [email protected]

ফুটবল বিশ্বকাপের ইতিহাসে সবচেয়ে বড়, দীর্ঘ এবং ব্যয়বহুল আসরের অপেক্ষায় বিশ্ব। ২০২৬ সালে যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা ও মেক্সিকোর যৌথ আয়োজনে অনুষ্ঠিত হতে যাওয়া ফিফা বিশ্বকাপ শুধু অংশগ্রহণকারী দলের সংখ্যা বৃদ্ধির কারণেই নয়, বরং পুরো টুর্নামেন্ট কাঠামোতেই নিয়ে আসছে যুগান্তকারী পরিবর্তন।
প্রথমবারের মতো তিনটি স্বাধীন সার্বভৌম দেশ যৌথভাবে বিশ্বকাপ আয়োজন করতে যাচ্ছে। এর আগে ২০০২ সালে জাপান ও দক্ষিণ কোরিয়া যৌথভাবে বিশ্বকাপ আয়োজন করলেও এবার সেই রেকর্ডও ভাঙছে। উত্তর আমেরিকার ১৬টি শহরে ছড়িয়ে থাকা ভেন্যুগুলোতে অনুষ্ঠিত হবে টুর্নামেন্টের ম্যাচগুলো।
১৯৯৮ সাল থেকে বিশ্বকাপে ৩২ দলের অংশগ্রহণ দেখা গেলেও ২০২৬ আসরে সেই সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৪৮-এ। ফলে ফুটবল ইতিহাসে প্রথমবারের মতো এত বেশি দেশের প্রতিনিধিত্ব দেখা যাবে বিশ্বমঞ্চে। নতুন এই সম্প্রসারণের কারণে বেশ কয়েকটি দেশ প্রথমবারের মতো বিশ্বকাপ খেলার সুযোগ পাচ্ছে।
দল সংখ্যা বাড়ার সরাসরি প্রভাব পড়েছে ম্যাচ সংখ্যাতেও। ২০২২ কাতার বিশ্বকাপে যেখানে মোট ৬৪টি ম্যাচ অনুষ্ঠিত হয়েছিল, সেখানে ২০২৬ বিশ্বকাপে ম্যাচ সংখ্যা বেড়ে হচ্ছে ১০৪। ৩৯ দিনব্যাপী এই টুর্নামেন্ট ফুটবল ইতিহাসের দীর্ঘতম ও বৃহত্তম বিশ্বকাপ হিসেবে জায়গা করে নিতে যাচ্ছে।
নতুন কাঠামোয় ৪৮ দলকে ভাগ করা হয়েছে ১২টি গ্রুপে। প্রতিটি গ্রুপে থাকবে চারটি করে দল। গ্রুপপর্ব শেষে প্রত্যেক গ্রুপের শীর্ষ দুই দলের পাশাপাশি সেরা আটটি তৃতীয় স্থান অধিকারী দলও জায়গা পাবে শেষ ৩২-এর নকআউট পর্বে। ফলে গ্রুপপর্বের শেষ ম্যাচ পর্যন্ত অধিকাংশ দলের জন্য টিকে থাকার লড়াই অব্যাহত থাকবে।
বিশ্বকাপ জিততে এবার চ্যাম্পিয়ন দলকে খেলতে হবে রেকর্ড আটটি ম্যাচ। আগে শিরোপা জয়ের জন্য সাতটি ম্যাচ পার হওয়াই যথেষ্ট ছিল।
মুসলিম দেশগুলোর রেকর্ড উপস্থিতি
২০২৬ বিশ্বকাপের অন্যতম আলোচিত দিক হচ্ছে মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশগুলোর নজিরবিহীন অংশগ্রহণ।
২০২২ কাতার বিশ্বকাপে যেখানে মুসলিম দেশের সংখ্যা ছিল ছয়, সেখানে এবার সেই সংখ্যা বেড়ে হয়েছে ১৪। অর্থাৎ, অংশগ্রহণকারী ৪৮ দলের প্রায় ৩০ শতাংশই মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশ।
এশিয়া থেকে সৌদি আরব, কাতার, ইরান, ইরাক, জর্ডান ও উজবেকিস্তান জায়গা করে নিয়েছে। আফ্রিকা থেকে খেলবে মরক্কো, মিশর, আলজেরিয়া, তিউনিসিয়া, সেনেগাল ও নাইজেরিয়া। ইউরোপের প্রতিনিধিত্ব করছে তুরস্ক এবং বসনিয়া ও হার্জেগোভিনা।
বিশেষভাবে আলোচনায় রয়েছে ইরাক ও তুরস্কের প্রত্যাবর্তন। প্রায় চার দশক পর বিশ্বকাপে ফিরছে ইরাক, আর ২৪ বছর পর আবারও দেখা যাবে তুরস্ককে।
তরুণ ইয়ামাল সবচেয়ে দামি ফুটবলার
বিশ্বকাপকে ঘিরে খেলোয়াড়দের বাজারমূল্য নিয়েও শুরু হয়েছে আলোচনা।
বর্তমান হিসাব অনুযায়ী, স্পেনের ১৮ বছর বয়সী উইঙ্গার লামিন ইয়ামালই ২০২৬ বিশ্বকাপের সবচেয়ে মূল্যবান ফুটবলার। তার আনুমানিক বাজারমূল্য ২৫ কোটি ৪০ লাখ ইউরো।
দ্বিতীয় স্থানে রয়েছেন নরওয়ের স্ট্রাইকার আর্লিং হলান্ড, যার মূল্য প্রায় ১৯ কোটি ৯০ লাখ ইউরো। তৃতীয় অবস্থানে আছেন ফ্রান্সের অধিনায়ক কিলিয়ান এমবাপ্পে, যার বাজারমূল্য প্রায় ১৯ কোটি ইউরো।
কোচদের বেতনের তালিকায় শীর্ষে আনচেলত্তি
বিশ্বকাপের ডাগআউটেও রয়েছে তারকাদের সমাবেশ।
ব্রাজিলের কোচ কার্লো আনচেলত্তি বার্ষিক ৮২ লাখ ৮০ হাজার পাউন্ড আয় করে অংশগ্রহণকারী কোচদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি বেতন পাওয়া কোচ হিসেবে তালিকার শীর্ষে রয়েছেন।
তার পরে রয়েছেন ইংল্যান্ডের টমাস টুখেল, যুক্তরাষ্ট্রের মাউরিসিও পচেত্তিনো, জার্মানির জুলিয়ান নাগেলসম্যান এবং উজবেকিস্তানের ফ্যাবিও ক্যানাভারো।
অন্যদিকে ৭৮ বছর বয়সী ডিক অ্যাডভোকেট কুরাসাওয়ের দায়িত্ব নিয়ে বিশ্বকাপ ইতিহাসের সবচেয়ে বয়স্ক কোচ হিসেবে নতুন রেকর্ড গড়তে যাচ্ছেন।
মেসি-রোনালদোর শেষ বিশ্বকাপ?
ফুটবলপ্রেমীদের জন্য বড় আকর্ষণ হয়ে উঠতে পারে দুই মহাতারকা লিওনেল মেসি ও ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদোর সম্ভাব্য অংশগ্রহণ।
ক্যারিয়ারের শেষ প্রান্তে থাকা এই দুই কিংবদন্তিকে হয়তো শেষবারের মতো বিশ্বকাপের মঞ্চে দেখা যেতে পারে। ফলে ২০২৬ বিশ্বকাপকে ঘিরে আবেগ ও প্রত্যাশা আরও বেড়েছে সমর্থকদের মধ্যে।
‘চার্জ’ দিয়ে মাঠে নামবে বিশ্বকাপের বল
প্রযুক্তিগত দিক থেকেও নতুনত্ব নিয়ে আসছে ফিফা।
অ্যাডিডাসের তৈরি ২০২৬ বিশ্বকাপের অফিসিয়াল বল ‘ট্রিওন্ডা’-তে ব্যবহার করা হয়েছে উন্নত ‘কানেক্টেড বল’ প্রযুক্তি। বলটির ভেতরে স্থাপন করা হয়েছে ৫০০ হার্জের ইনর্শিয়াল মেজারমেন্ট ইউনিট (আইএমইউ) সেন্সর, যা রেফারিদের সিদ্ধান্ত গ্রহণে সহায়তা করবে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, অফসাইড, বল স্পর্শ এবং অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্ত শনাক্ত করতে এই প্রযুক্তি আরও নির্ভুলতা এনে দেবে। বলটির সেন্সর ব্যবস্থায়ও আনা হয়েছে নতুন পরিবর্তন, যা আগের বিশ্বকাপের প্রযুক্তি থেকে আলাদা।
ফুটবল ইতিহাসের নতুন অধ্যায়ের অপেক্ষা
৪৮ দল, ১০৪ ম্যাচ, ৩৯ দিনের প্রতিযোগিতা এবং তিন দেশের যৌথ আয়োজন সব মিলিয়ে ২০২৬ ফিফা বিশ্বকাপ হতে যাচ্ছে ফুটবল ইতিহাসের সবচেয়ে বড় আয়োজন।
বিশ্বের নানা প্রান্ত থেকে আসা ফুটবলারদের সামনে থাকবে একটাই লক্ষ্য সিলভিও গাজ্জানিগার নকশা করা সোনালি ট্রফি উঁচিয়ে ধরা। আর ফুটবলপ্রেমীদের জন্য অপেক্ষা করছে রেকর্ড, নাটকীয়তা, নতুন তারকা ও নতুন ইতিহাসে ভরপুর এক বিশ্বকাপ।
জে আই